কেন জরুরি মণীন্দ্র গুপ্ত
বাংলা সাহিত্যের অখণ্ড চৈতন্য সত্তা হলেন মণীন্দ্র গুপ্ত (Manindra Gupta)। যিনি নাগরিক হয়েও গ্রামীণ, আধুনিক হয়েও সুপ্রাচীন, বিচ্ছিন্ন হয়েও জুড়ে থাকায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলা কবিতার আদি ও অকৃত্রিম পুরুষ মণীন্দ্র গুপ্ত। কবিতা শুধুমাত্র একটি মাধ্যম নয়, অবচেতনের গহিন থেকে উঠে আসা দিগন্তবিস্তৃত অভিযাত্রার নামই কবিতা। এই বিস্তৃতি আজন্মকাল বুকে ধারণ করেছেন মণীন্দ্র গুপ্ত। তাঁর সেই মহাজাগতিক যাপনে ছিল লোকজ শেকড়, দেশজ চিত্রকল্প এবং এক নির্মোহ দর্শন। কলকাতার তপ্ত শহরের জঠরে বাস করেও তাই তিনি নিজেকে চারিয়েছিলেন সেইসব নিভৃত গ্রামে, যেখানে পুকুরের কালচে জলে ‘চ্যাং বা চ্যাপটামুখ গজাল মাছেরা’ খাবারের খোঁজে মুখ তোলে। চূড়ান্ত নগর সভ্যতার মধ্যে থেকেও যে মাটির পাগলপারা ঘ্রাণ আর নশ্বরতার ব্যাকুলতাকে চিরকাল কাছে পেতে চেয়েছেন তিনি, এটাই মণীন্দ্র গুপ্তের লেখালেখির ব্যাপ্তি। এটাই তাঁর কবিতার ভূগোল, গদ্যের অলংকার।
ছবি সৌজন্যে-সাহিত্য আকাদেমি
পঞ্চাশের দশক থেকে মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা যখন পাঠকসমাজে এল, তখন পৃথিবী জুড়ে চরম আধুনিকতাবাদের প্রভাব। বলা চলে, ইউরোপীয় ঘরানায় আচ্ছন্ন মানুষ। বাংলা কবিতাকে গ্রাস করছিল ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা আর একপ্রকার নাগরিক ক্লান্তি।
মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা যখন পাঠকসমাজে এল, তখন পৃথিবী জুড়ে চরম আধুনিকতাবাদের প্রভাব। বলা চলে, ইউরোপীয় ঘরানায় আচ্ছন্ন মানুষ। বাংলা কবিতাকে গ্রাস করছিল ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা আর একপ্রকার নাগরিক ক্লান্তি। শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুদের বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে বাংলা কবিতায় নতুন স্বর সংযোজন করলেন মণীন্দ্র গুপ্ত। ওঁর নাগরিক চেতনা ভিড়ে মিশল না, খানিক নিভৃতে চলল পুরনোকে আঁকড়ে ধরে আগামীর ইঙ্গিত। বাংলা কবিতায় উত্তর আধুনিকতার বীজ বপণ কি সেই শুরু? মণীন্দ্র গুপ্তের আধুনিকতা আদতে কেমন, তা বোঝাতে গিয়ে উত্তর দ্বাদশ গদ্যে জেনগুরু রিয়োকানের একটি গল্প বলছেন। জেনগুরু রিয়োকান নির্জন পাহাড়তলিতে ছোট একটি কুটিরে সরলতম জীবন যাপন করতেন। একদিন তিনি বাড়ি নেই। সন্ধেবেলায় এক চোর এসে দেখল, চুরি করার মতো কিছুই নেই সেখানে। ইতিমধ্যে রিয়োকান ফিরে এলেন এবং চোরকে ধরলেন। “তুমি হয়তো দীর্ঘ পথ হেঁটে আমাকে দেখতে এসেছ”, সেই নিঃশব্দচরকে বললেন তিনি, “তোমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। অনুগ্রহ করে আমার পোশাকটিই উপহার হিসেবে নাও।” চোর বিমূঢ় হয়ে পোশাকটি নিয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়ল। বিয়োকান উলঙ্গ বসে চাঁদ দেখতে লাগলেন। ‘বেচারা’, অন্যমনে ভাবলেন তিনি, “যদি আমি এই অপূর্ব চাঁদটি ওকে দিতে পারতাম!”
কী আছে এই গল্পে? এই গল্পের মধ্যে দিয়ে আদতে কী বোঝাতে চাইলেন মণীন্দ্রবাবু? জীবন ও জগৎ বিষয়ে একটি দৃষ্টিভঙ্গি আর অনুভব। সদয়, অনাসক্ত, কল্পনা, মায়াভরা আনন্দময় বললেও সব বলা হবে না, মণীন্দ্রবাবু একেই আধুনিক বলেন।
ছবি সৌজন্যে-অরণি বসু
একটি কবিতা সামনে আনা যাক — “বেড়ালটা সকাল থেকে কাঁদছে/ কাল থেকে ওর বাচ্চাটা নিখোঁজ।/ আমি রাতের বেলা রামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ করছিলাম,/ সে শান্তির আশায় এসে দুই থাবা জোড় করে বসল।/ কিন্তু হল না।/ একটু পরেই সে মিউমিউ করে আবার কাঁদতে লাগল… আর পুত্রশোক আগুনের মতো ঘিরে ধরল/ রামকৃষ্ণদেবকে।” — খুব সাধারণ দৃশ্য দিয়ে কবিতাটি শুরু হচ্ছে, সন্তানহারা এক বেড়ালের হাহাকার। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে ব্যক্তিগত শোক পৌঁছে যাচ্ছে মহাজাগতিক ব্যাপ্তিতে। যেন শোকগাথা আর আধ্যাত্মিকতা এক বিন্দুতে এসে মিশছে। যে রামকৃষ্ণ আলোর পথ দেখান, তিনি আসলে নশ্বর জগতের যাবতীয় যন্ত্রণার বাইরে নন। মণীন্দ্র গুপ্ত মনে করিয়ে দেন যে, প্রজ্ঞা মানে শোকের বিনাশ নয়, শোককে প্রজ্ঞার শিখায় চিনে নেওয়া। এই মিনিমালিস্ট লেখনিই মণীন্দ্র গুপ্তের অনন্ত বিন্দু, যাকে আজন্মকাল তিনি লালন করেছেন।
তিনিই আবার ‘বিধবা’ কবিতায় লেখেন, “তুলোর বালিশ অনেকদিন নেই, সোঁদালের ফুল রোদে শুকিয়ে/ খোলে ভরে নিয়েছি।/ সেই বালিশে শুয়ে দুপুরে তন্দ্রা মতো এল…” — জীবনকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের শ্রেষ্ঠ উপায় একজন কবির কাছে অমূল্য। অতি সাধারণ এ কবিতায় সেই পর্যবেক্ষণ সৌন্দর্যের রূপ পেয়েছে যেন। সোঁদাল ফুলের বীজ জ্যান্ত হয়ে শিকড় চারিয়ে দেয় স্বপ্নের ভেতর। জ্যান্ত ও মরার এই যে সহাবস্থান, তা কেবল গ্রামবাংলার লোকায়ত বিশ্বাসের মধ্যেই সম্ভব। মণীন্দ্র গুপ্ত শহরবাসী হয়েও কবিতায় ফিরিয়ে এনেছেন শিউলি ফুলের ছিদ্র দিয়ে দেখা সাদা মেঘের দেশ কিংবা সোনা-হলদে ফুলের স্তবকে ঝরে পড়া বিষাদমাখা দুপুর। তাঁর কাব্যভাষায় মিশে যাচ্ছে বহু যুগের স্থাপত্যের মতো ঢেঁকিশাক আর বেতফলের ঘ্রাণ।
মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা ও গদ্য পড়তে পড়তে আমাদের মনে হতে পারে, তাঁর আধুনিকতা আসলে সমকালীনতাকে কখনোই অস্বীকার করে না, কিন্তু তার ভিতরে একপ্রকার চিরকালীন আবেদন আছে। প্রথাগত আটপৌরের খুব চেনা ইমেজ নির্মাণ করে লেখার সূক্ষ্মতায় তিনি এনেছেন পরিমিতিবোধ।

মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা ও গদ্য পড়তে পড়তে আমাদের মনে হতে পারে, তাঁর আধুনিকতা আসলে সমকালীনতাকে কখনোই অস্বীকার করে না, কিন্তু তার ভিতরে একপ্রকার চিরকালীন আবেদন আছে। প্রথাগত আটপৌরের খুব চেনা ইমেজ নির্মাণ করে লেখার সূক্ষ্মতায় তিনি এনেছেন পরিমিতিবোধ। তাঁকে পাঠ করা মানে স্পর্শ করা কিংবা গন্ধ শুঁকে নেওয়া। তাঁর কবিতায় পরিমিতিবোধ কতখানি তার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, আমার বাবা একদিন বসে ছিলেন সূর্যাস্তবেলায়,/ তাঁর কিছু করার ছিল না।/ সেই দৃশ্য, সেই সন্ধ্যা থেকে/ আমার উপর, উত্তরাধিকারসূত্রে,/ সবচেয়ে নিরাশা চাপিয়ে রেখে গেছে। — লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে ক্রিয়াপদের নির্মেদ ব্যবহার। ‘বসে থাকা’ এবং ‘কিছু করার ছিল না’ — এই অতি সাধারণ দুটি অবস্থার মাধ্যমে জীবনের এক বিশাল শূন্যতাকে তুলে ধরা হল। আর এই সাধারণত্বই বিষাদের গভীরতাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলল। পাশাপাশি ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘নিরাশা’ শব্দ দুটির বৈপরীত্য আমাদের নজর কাড়ে। এই শব্দ দুটিকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন কবি যে, বাবার সেই অলস বসে থাকার দৃশ্যটি বংশগত অভিশাপের মতো পাঠকের মনে গেঁথে যায়। এমন সাধারণ ঘটনার মধ্যে অসামান্য শবসংযমই মণীন্দ্র গুপ্তের মহাপৃথিবী।
আরও পড়ুন: প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার মনোজগৎ

একালের তরুণ কবিদের কাছে মণীন্দ্র গুপ্তকে পাঠ করা শুধুমাত্র জরুরি নয়, একপ্রকার আত্মশুদ্ধি। অতিরিক্ত কথার ফুলঝুরি আর নাগরিক বিচ্ছিন্নতার মেকি প্রদর্শনের যুগে তিনি আমাদের কাছে আশ্রয়। সব হারিয়েও কীভাবে উলঙ্গ বসে চাঁদ দেখতে হয়, এই সংযম একালের উচ্চাকাঙ্খীদের কাছে সমান্তরাল এক পৃথিবীর খোঁজ দেয়, যেখানে জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। এই নিজস্ব পৃথিবী কজনই বা তৈরি করতে পারেন!