ভাগলপুরে নিজস্ব ল্যাবরেটরি খুললেন বনফুল, ডাক্তারি আর সাহিত্যচর্চা চলল সমানতালে

বন-জঙ্গল চিরকালই তাঁর প্রিয়, তাই নামের সঙ্গে জুড়ে দিলেন বনফুল

রোববারের এক সকাল। কলকাতা মেডিকেল কলেজের এক মেধাবী ছাত্র একটু ফুরসত পেয়ে  হাজির হল তৎকালীন এক বিখ্যাত বাড়িতে। গৃহকর্তা অত্যন্ত রাশভারী, বাজখাঁই তাঁর মেজাজ। বাড়িতে আসা এই যুবক অতিথিটির নিজের দেশের প্রতি কতটা শ্রদ্ধা, নিষ্ঠা, তা একটু  পরীক্ষা করতে চাইলেন মোটা গোঁফের ওই মানুষটি। দুম করে তাই প্রশ্ন করলেন, ‘দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ কবে হয়েছিল?’ এমন আচমকা প্রশ্নবাণে, মেডিকেলের ‘শরীর কাটাছেঁড়া’ পড়াশোনায় অভ্যস্ত সে যুবকের তখন যা তা অবস্থা। কারণ সেই গৃহকর্তাটি ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, আর তাঁর সামনে একটুও হাঁটু কাঁপবে না, এমন মানুষ হয়ই না। নিরুত্তর সেই যুবকের অবস্থা বুঝে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাই একটু রঙ্গ করেই বললেন, বিজ্ঞানের ছাত্র বলে দেশের ইতিহাস জানতে নেই! তারপরেই সেই যুবককে তাঁর বাড়ির লাইব্রেরিতে পাঠিয়ে ঈশানচন্দ্র ঘোষের লেখা ইতিহাস বই আনালেন, সংশ্লিষ্ঠ বিষয়ে উপযুক্ত তথ্য ও ইতিহাস জেনে তবেই মিলল তার মুক্তি। বাংলার বাঘ বুঝে গেলেন এই নিষ্ঠা ও জানার আগ্রহই এ ছেলেকে বহুদূর নিয়ে যাবে। হলও তাই। কেবল ডাক্তার হিসেবে নয়, সময় তাঁকে অমর করল আরও নানান ক্ষেত্রে। 

বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারার একটি নাম হয়ে থাকলেন ‘বনফুল’ ওরফে সেদিনের সেই ডাক্তার ছাত্র বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। বনফুল মানে জীবনের সহজতাকে কয়েক প্যারায় ফুটিয়ে তোলা এক অসাধারণ কথাশিল্পী। বনফুল মানে, এক পাতায় উঠে আসা দ্বন্দ্বে বিভোর এক পূর্ণাঙ্গ জীবন প্রণেতা। ডাক্তারিটা মন দিয়ে করতেন বনফুল তাই শরীরের ব্যামোর পাশাপাশি মনস্তত্বের নানা অলিগলিও তাঁর চেনা ছিল খুব। ফলে সেই জীবনগুলো খুব সহজেই তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠত। ডাক্তারির ব্যস্ত জীবনে নাওয়া খাওয়ার ঠিক থাকে না, কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় যেমন খাদ্যরসিক, তেমনই জীবন রসিক। মানুষের সেবা করা তাঁর ব্রত, কিন্তু শুধু ওষুধেই এই সেবা আটকে রাখতে চাননি তিনি, চেয়েছিলেন আরও অন্যভাবে মানুষের মধ্যে মিশে যেতে। 

না লিখে থাকতে পারতেন না, তাই পেশার ব্যস্ততা তাঁকে যে কব্জা করতে পারেনি, কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটকের মতো সাহিত্যের নানা সংরূপে বনফুলের লেখার সংখ্যা দেখলে তা মালুম হয়। হাজারের বেশি কবিতা, ৬০টি উপন্যাস, ৫৮৬টি ছোটোগল্প, ৫টি নাটক, আত্মজীবনী, অগুনতি প্রবন্ধ এইসব নিয়ে বনফুলের ২২খণ্ডে প্রকাশিত রচনাবলীর সামনে তাই বিস্মিত হতে হয় পাঠককে।

কাজের সূত্রে হুগলির শিয়াখালা গ্রামের ‘কাঁটাবন মুখুজ্জ্যে’ বাড়ির বংশধর সত্যচরণ মুখোপাধ্যায় তখন বিহারের মণিহারীতে। ১৮৯৯-এর ১৯ জুলাই প্রবল ঝড়জলের মাঝেই সত্যচরণের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী জন্ম দিলেন এক পুত্র সন্তানের। নাম রাখা হয়  বলাই। নানা সমস্যায় মায়ের দুধ না পেয়ে বাড়িরই এক মুসলমান মজুর চামরুর বউয়ের বুকের দুধে বড়ো হল বলাইচাঁদ। স্বভাবটা তার 'জংলি', বনজঙ্গল ভালোবাসে আর হাতে লাঠি নিয়ে সেই দুধ-মায়ের সঙ্গে টলোমলো পায়ে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াত ছোট্ট বলাই। নামের সঙ্গে 'বন' জুড়ে যাওয়ার সেই যেন শুরু। তারপর বিহারের সাহেবগঞ্জ রেলওয়ে হাইস্কুলের ছাত্র যখন বলাইচাঁদ, সেই সময়ে 'বিকাশ' নামে হাতে লেখা পত্রিকায় কবিতা লেখা চলত মাঝেমধ্যেই। পরে ক্লাস এইটে পড়ার সময় 'মালঞ্চ'-তে বলাইচাঁদের কবিতা ছাপা হলে স্কুলের হেডপণ্ডিত বাদে সবাই বেশ খুশি হয়। সংস্কৃত পণ্ডিত রামচন্দ্র ঝাঁ সটান জানান সংস্কৃতে বলাইয়ের একশো না পাওয়ার কারণ ওই কাব্যচর্চা, তাই ওটি আর চলবে না। মহাফাঁপড়ে পড়া  কিশোর বলাইকে তখন বুদ্ধি দিলেন অগ্রজস্থানীয় সুধাংশুশেখর মজুমদার। সেই থেকে ‘বনফুল’-এর প্রবেশ বলাইচাঁদের জীবনে। নিজেই বলেছেন, ‘বন চিরকালই আমার নিকট রহস্য নিকেতন। এই জন্যই বোধহয় ছদ্মনাম নির্বাচন করিবার সময় 'বনফুল' নামটা আমি ঠিক করিলাম’।

বনফুলের শতবর্ষে প্রকাশিত ডাকটিকিট

কলকাতায় ডাক্তারি পড়া শুরু করলেও একেবারে শেষ বছরে পাটনায় নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ায় সেখানে পড়তে চলে যান বনফুল। খুবই স্বাধীনচেতা মনের এই মানুষটি পাটনা মেডিকেল কলেজে হাউস সার্জেনের চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় যেই টের পেলেন বাবাবাছা করে চলতে হবে সিনিয়রদের, সটান বেরিয়ে এলেন সেখান থেকে। এরপর প্যথলজির ট্রেনিং নিয়ে প্রথমে আজিমগঞ্জ মিউনিসিপালিটি হাসপাতালে অল্প কিছুদিন চাকরি করলেও পরে ভাগলপুরে নিজস্ব ল্যাবরেটরি খুললেন বনফুল। ডাক্তারির ফাঁকে ফাঁকে লেখেননি তিনি,  বরং লেখালিখি ও ডাক্তারি দুটোই সমানতালে করে গেছেন। ভাগলপুরের ল্যাবরেটরিতেই খোঁজ মেলে খেয়ালি ও মেজাজি বনফুলের। জেলার ম্যাজিস্ট্রেট তার স্ত্রীর 'ইউরিন' নিয়ে এসেছেন পরীক্ষা করাবেন বলে। ল্যাবরেটরিতে ঢুকে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর স্বভাবসুলভ চোটপাট শুরু করতেই খেপে আগুন হলেন বলাইচাঁদ। টান মেরে সেই বোতল ভর্তি 'ইউরিন'  নর্দমায় ফেলে ল্যাবরেটরি থেকে বার করে দিলেন ম্যাজিস্ট্রেটকে। এই মেজাজি বনফুল, রসিকও বটে। মন্দিরে বলি বন্ধ করতে চাওয়া ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র শর্মাকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সমর্থন জানালে কলকাতায় নানা কথার ঝড় ওঠে, তাঁকে নিয়ে তখন ব্যঙ্গ কবিতা লেখেন বনফুল। সে কবিতা পড়ে রেগে যাওয়া তো দূরে থাক, তরুণ তুর্কি বনফুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দেখা করতে চাইলে আরেকপ্রস্থ খেয়ালিচালে বনফুল জানান তিনি তো ডাক্তার তাই 'কল' ছাড়া কোথাও যাবেন না। অতএব সপরিবারে বনফুলকে সানন্দে  নিমন্ত্রণ জানান কবিগুরু। 

এই রবীন্দ্র সান্নিধ্য বিশ্বকবির মৃত্যু পর্যন্ত পেয়েছিলেন বনফুল। লেখায় নানা পরামর্শ দেওয়া আবার নানা বিষয়ে মতান্তর হওয়া এসবের মাঝেই এই যোগাযোগ অটুট হয়েছিল। সিস্টার নিবেদিতার স্কুলের ছাত্রী, শ্রীমা সারদার স্নেহধন্যা লীলাবতীর সঙ্গে সুখের দাম্পত্যজীবন ছিল বনফুলের। কিন্তু সেখানেও এই মেজাজি বনফুলের দেখা মেলে। স্বামী-স্ত্রী'র মধ্যে ঝগড়ার কারণই ছিল বনফুলের অতিরিক্ত খাদ্যপ্রিয়তা। দুপুরে দু'রকম মাছ আর রাতে মাংস না খেলে মন ভরত না বনফুলের। অতএব খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে মিতব্যয়ীতা না পসন্দ ছিল তাঁর। সবেতেই দিলখোলা দরাজ এই মানসিকতাই বনফুলের সমস্ত লেখাকে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরানা দিয়েছে। সাহিত্য করবেন বলেই লিখে যাননি, বরং তাঁর সব লেখাতেই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিগত ও পারিপার্শিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছাপ। পাখি দেখার চোখ নিয়ে তাই বনফুল লিখে ফেলেন 'ডানা',  বাবার জীবনচরিত অবলম্বনে লেখেন 'উদয় অস্ত'-এর মত উপন্যাস। নববধূ লীলাবতী'কে পাঠানো চিঠি, কবিতার ছাপ পড়ে ‘কষ্টিপাথর’ উপন্যাসে। পাঠক আবিষ্ট হয় বনফুলের ‘তৃণখণ্ড’, ‘কিছুক্ষণ’, ‘আশাবরী’-তে। বই-এ মুখ গোঁজা বাংলার ছেলেপুলেদের মননে বিদ্যাসাগর, মধুসূদনের ছাপ ফেলতে বনফুল লেখেন নাটক, ‘শ্রী মধুসূদন’, ‘বিদ্যাসাগর’। বনফুলের লেখা অবলম্বনে ‘ভুবন সোম’, ‘অগ্নীশ্বর’-এর মত সিনেমা দাগ কাটে দর্শকের মনে। তবু এতকিছুর পরেও বাংলা ছোটোগল্প বনফুলকে যে অনন্য মাত্রা দেয়, তা বোধহয় এসবকেই ছাপিয়ে গেছে। কত কম কথায় কত সূক্ষ্ম জীবনছবি ধরা যায় তাঁর পাঠ শিখে নিতে হয় ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। জীবনের ডাকে সাড়া দিয়ে সহজতায় বাঁচতে পারা যে জীবন, তার পাঠ আমাদের শেখান বনফুল, রূপকথা না হয়েও যে পাঠের ক্যানভাসে রেখা ফেলে জীবনেরই নানা রং।

তথ্যঋণঃ 
কোরক সাহিত্য পত্রিকা
স্মৃতিচিত্রণ/ পরিমল গোস্বামী

 

Developed by DXDasia