বিভিন্ন পুঁথি ও পাটা থেকে সমর্থন মেলে এ-কথার
দেবদত্ত গুপ্ত ও পার্থ দাশগুপ্ত
বাঙালির নিজস্ব রূপ বোধের যে পরিচয় আমরা পাই তার মূল উপাদান হল বিষ্ণুপুরের মন্দির স্থাপত্য আর পোড়ামাটির ভাস্কর্যে। পাশাপাশি আমাদের মনে রাখা দরকার যে চিত্রকলাতেও বাঙালির নিজস্বতার পরিচয় ধরা রয়েছে বিষ্ণুপুর এবং বাঁকুড়া থেকে প্রাপ্ত পাটা চিত্রকলার নমুনাগুলির মধ্যে। অধ্যাপক অশোক ভট্টাচার্যর মতে, ‘পাল আমলের মতোই এ পাটাগুলিও চিত্রিত হয়েছে সমকালীন ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিষয় অবলম্বনে।’
বিষ্ণুপুর তথা বাঁকুড়ার বেশ কয়েকটি উৎকৃষ্ট চিত্রিত পাটা সংগৃহীত আছে কলকাতার আশুতোষ সংগ্রহশালায়, তবে পুঁথিগুলি থেকে পাটাগুলি আলাদা করে সংরক্ষণের ফলে অনেকক্ষেত্রে তাদের স্থানকাল সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে রচনাশৈলীর তুলনামূলক বিচারের সাহায্যেই যতদূর সম্ভব এখন এই পাটাগুলির কালক্রম নির্ধারণ করতে হবে। কেবল বিষ্ণুপুরের নয়, রাঢ়- বাংলার অপর কয়েকটি জেলার চিত্রিত পাটাও আশুতোষ সংগ্রহশালায় সংগৃহীত আছে। এই পাটাগুলি পরীক্ষা করলে সহজেই বোঝা যায় যে বিষ্ণুপুর-বাঁকুড়া শৈলীই নিকটবর্তী জেলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রাঢ় বাংলার চিত্রশৈলীতে পরিণত হয়েছিল। তবে সেই সঙ্গে এ-ও দেখা যায় যে পাটাগুলির বিষয় প্রধাণত বৈষ্ণবধর্মাশ্রয়ী হলেও অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের রূপভাবনাও তাতে প্রতিফলিত।
বিষ্ণুপুরের অঙ্কিত পাটাগুলির মধ্যে প্রাচীনতম যেটি তার তারিখ ১৪২১ শকাব্দ বা ১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দ। এই পাটাটি একটি বিষ্ণুপুরাণ পাণ্ডুলিপির। এর ভিতরের দিকে বামন থেকে কল্কি পর্যন্ত বিষ্ণুর ছয় অবতারকে চিত্রিত করা হয়েছে পরপর সারিবদ্ধভাবে। দ্বিমাত্রিক রীতিতে তির্যক রেখায় আঁকা বামন ও তিন রামের ত্রিভঙ্গ রূপ, তাঁদের পোশাক, রেখার কৌণিকতা, ও চিবুকের জোড় থেকে দেবপ্রসাদ ঘোষ স্পষ্টতই ‘মধ্যযুগীয়’ চিত্ররীতির চরিত্র লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তিনি এই চিত্রের সঙ্গে বিহারের আরায় লিখিত ১৪৪৬ খ্রিস্টাব্দের কালচক্রতন্ত্র এবং ১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে লিখিত কারন্ডব্যুহ নামক পুঁথিদুটির ছবির সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন। সর্বদিক থেকে না হোক, রেখা ও বর্ণের মণ্ডনগুণহীনতার বিচারে পঞ্চদশ শতকের পুঁথিচিত্রের এই তিনটি স্বতন্ত্র উদাহরণ অবশ্যই পাল যুগের চিত্রকলার অবক্ষয়িত রূপের বিক্ষিপ্ত পরিচয় বহন করে।
বিষ্ণুপুরের রাজ পরিবার নব বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পরই তার চিত্রকলার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। এখন প্রশ্ন হল, প্রবল পরাক্রমশালী মল্ল রাজারা শাক্তভূমে থেকেও কীভাবে বৈষ্ণব হয়ে গেলেন, তাও আমাদের জানা দরকার। আসলে এই বৈষ্ণব ধর্মই কিন্তু ছবির বিষয়কে যেমন কোমলতা দান করছে আবার একই সাথে এই বৈষ্ণব ধর্মের আশ্রয়েই কিন্তু ঘরানার মধ্যে এসেছে নিবেদনের আর্তি। এখন প্রশ্ন হল কি ভাবে মল্লভূমে বৈষ্ণব ধর্ম ছড়িয়ে গেল?

সময়কাল ষোড়শ শতকের শেষভাগ। বৃন্দাবনে শ্রীজীব গোস্বামীর কাছে শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ নানা পাঠ নিয়ে এবং গোপাল ভট্টের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করার পর বৃন্দাবনের গোস্বামীদের রচিত এক গাড়ি বোঝাই শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে বাংলায় ফিরছিলেন শ্রীনিবাস আচার্য। সেই দীর্ঘ যাত্রায় শ্রীনিবাস আচার্যের সঙ্গে ছিলেন পরম বৈষ্ণব নরোত্তম দাস এবং শ্যামানন্দ। দুর্গম জঙ্গল পথ পেরিয়ে ওঁদের গাড়ি যখন বনবিষ্ণুপুর পৌঁছোলে তখন গোপালপুর গ্রামে একদল দস্যু ধন দৌলত মনে করে বৈষ্ণবগ্রন্থাদি সব লুঠ করে নিল। এরপর লুণ্ঠিত গ্রন্থ উদ্ধারের আশা নিয়ে শ্রীনিবাস আচার্য হাজির হলেন মল্ল রাজা বীর হাম্বীরের রাজ সভায়। হাম্বীর শ্রীনিবাসের কাছে জানতে চান কি আছে সেই সব লুণ্ঠিত পুঁথিতে।
তখন একের পর এক শ্রীনিবাস সেইসব পুঁথির মধ্যে লিখিত শাস্ত্রের মহিমা ব্যাখ্যা করতে থাকেন। সেই সময় বীর হাম্বীর শ্রীনিবাস আচার্যের সাত্ত্বিক রূপদর্শনে ভাবান্তরিত হয়ে সপরিবারে তাঁর কাছে দীক্ষা নেন। এই হল সেই ঘটনা যার প্রভাবে কেবল মল্লভূমি নয় গোটা বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে এক বিরাট রূপান্তর দেখা দিল। হাম্বীর এবং তাঁর পুত্র ও পৌত্র রঘুনাথ সিংহ ও বীর সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় সমস্ত সপ্তদশ শতক জুড়ে বৈষ্ণবধর্মাশ্রিত সাহিত্য, সঙ্গীত, মন্দির স্থাপত্য, এবং চিত্রকলা এক অসাধারণ সৃজনশীলতা নিয়ে বিকাশলাভ করল। এই সাংস্কৃতিক বিকাশ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে ইংরেজ শাসনের সূচনাকালে বিষ্ণুপুর রাজাদের বিপর্যয় ঘটার আগে পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থেকে বাংলার পরম্পরাগত কলাশিল্পকে আধুনিক কালের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিল। এই ঘটনাকে সামনে রেখেই আমাদের মনে হয়েছে বিষ্ণুপুর ঘর তার নিজের পথেই নিজের ঘরানাকে তৈরি করে নিয়েছিল।