September 19, 2019 | 6:09 PM

’৪৬-এর দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখক ও শিল্পীদের অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুচিত্রা

মুক্তিসংগ্রামে অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসার জন্য রাস্তায় গান গেয়ে টাকা তুলেছিলেন তিনি

“মেঘের ’পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে।/ আমায় কেন বসিয়ে রাখো একা দ্বারের পাশে।/ কাজের দিনে নানা কাজে থাকি নানা লোকের মাঝে,/ আজ আমি যে বসে আছি তোমারি আশ্বাসে।” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি সুচিত্রা মিত্র? এই গান আসলে কার? আসলে রবি ঠাকুরের গান যত ভালোবাসে অন্তর থেকে গাওয়া হয়, সেই গান হয়ে যায় শিল্পীর নিজস্ব। এইভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন আমার প্রাণের ঠাকুর। একসময় এই গান ধারণ করেছিলেন সুচিত্রা মিত্র। রবীন্দ্রনাথের গানের আর্তনাদ, ব্যথা বুঝেছিলেন এই একরোখা মেয়েটি। বুঝেছিলেন গান হতে হবে নিজের, নিজস্ব। যে গানে চিৎকারটাও হবে আমার আর্তনাদ, কিংবা আনন্দ হয়ে উঠবে বেঁচে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি। রবীন্দ্রনাথের ‘একলা চলো রে’র নীতি সেদিনই বুঝেছিলেন অমর সঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র। 

একসময় পঙ্কজকুমার মল্লিকের গান শুনে ভিতর ভিতর ইচ্ছা জেগেছিল গান শেখার। পরে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, শৈলজারঞ্জন মজুমদার এবং শান্তিদেব ঘোষের কাছে পরমযত্নে গান শিখেছিলেন। এমনকি ছেলেবেলায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ সাহচর্যও পেয়েছিলেন। সুচিত্রা মিত্র মনে করতেন, একজন শিল্পীর শুধু গান গাইলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যুক্তিসহ এই বদবেজাজি সমাজব্যবস্থার সমালোচনা করাও শিল্পীর কর্তব্য। শিল্পীকে তাই হতে হবে মুক্তমনা, উদার। মিশতে হবে চারপাশের মানুষদের সঙ্গে। কলেজ জীবনে সুচিত্রা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিলেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অভিযোগে যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকের মুক্তির জন্য পতাকা হাতে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করেছেন তিনি। এমনকি টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজেও হার মানতে চাননি। মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদ করতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশদের হাতে মার খেয়েছেন বারবার। ১৯৬০ সালে দিল্লি থেকে প্রচারিত আকাশবাণীর জাতীয় অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন সুচিত্রা মিত্র। আকাশবাণীতে জওহরলাল নেহেরুকে কটাক্ষ করে ‘বাল্মিকী প্রতিভা’য় গান গাওয়ার অভিযোগে তাঁকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর আকাশবাণীতে গান গাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পরবর্তী জীবনে দলীয় রাজনীতি ছেড়ে দিলেও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর আমৃত্যু অম্লান ও অক্ষুণ্ণ ছিল।

রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনের আশ্রম শূন্য করে চলে গেছেন। ঠিক তার কুড়ি দিন পরেই বিশ্বভারতীতে ভর্তি হয়েছিলেন সুচিত্রা। রোগা ছিপছিপে, সপ্রতিভ, বুদ্ধিমতী, চঞ্চল একটি মেয়ের জীবন শুরু হয়েছিল অন্য গতে। নিজের গানে আবিষ্ট করেছিলেন আশ্রমের প্রতিটি কর্মকর্তাকে। কারণ ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র সরস্বতী তো তিনিই। ১৯৪৬-এর অগাস্ট মাসে যখন ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় কলুষিত হল তিলোত্তমা কলকাতা, তখন শিল্পীদের পক্ষ থেকে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সুচিত্রা। চিন্মোহন সেহানবীশ লিখছেন, “মনে পড়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে লেখক ও শিল্পীদের সেই অপূর্ব অভিযান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে যখন সে মিছিল পৌঁছাচ্ছিল, নিমেষের মধ্যে মিছিলের গাড়িগুলিকে ঘিরে ফেলছিল হাজার হাজার শব্দাতুর মানুষ। তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে ট্রাকের উপরে দাঁড়িয়ে সুচিত্রা মিত্র গান ধরলেন, ‘সার্থক জনম আমার…।’” হ্যাঁ, সুচিত্রাই পারতেন রক্তাক্ত দাঙ্গা থামিয়ে দিতে। মুক্তিসংগ্রামে তাই অসংখ্য অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য গান গেয়ে টাকা তুলে দিয়েছিলেন। সেই গান, “সার্থক জনম আমার/ জন্মেছি এই দেশে”। রবীন্দ্রনাথের গান তিনি ধারণ করেছিলেন এভাবেই। 

সুচিত্রা মিত্রের আবক্ষ মূর্তি গড়েছেন রামকিংকর বেইজ। তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন সুব্রত ঘোষ এবং রাজা সেন। উস্তাদ আমজাদ আলি খান বর্ণনা করেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের এক উজ্জ্বল প্রতীক’ হিসাবে। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন বিষ্ণু দে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এই লেখাটি বরং শেষ হোক নীরেন্দ্রনাথের সেই অমোঘ কবিতা দিয়েই, “আকাশ যখন চক্ষু বোজে অন্ধকারের শোকে/ তখন যেমন সবাই খোঁজে সুচিত্রা মিত্রকে,/ তেমন আবার কাটলে আঁধার সূর্য উঠলে ফের/ আমরা সবাই খোঁজ করি কার? সুচিত্রা মিত্রের।/ তাঁরই গানের জোৎস্নাজলে ভাসাই জীবনখানি/ তাইতো তাঁকে শিল্পী বলে বন্ধু বলে জানি।”

আজ সুচিত্রা মিত্রের ৯৬তম জন্মদিন। সুচিত্রা মিত্র অমর রহে। 

তথ্যঋণ- 
মনে রেখো- সুচিত্রা মিত্রের আত্মজীবনী
এবং
সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গীতজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইন্দিরা সঙ্গীত শিক্ষায়তন ও সাউন্ড উইং রেকর্ড কোম্পানি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রকাশিত স্মারক পুস্তিকা।

Developed by DXDasia