‘বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’ রেডিওর আরেক নাম

আজ তাঁর জন্মবার্ষিকী

১৯৩১ সাল। সেই শুরু। অল ইন্ডিয়া রেডিওর স্টুডিও সাজানো হয়েছে ঘট, বেলপাতা, চন্দন দিয়ে। অনুষ্ঠিত হবে মহালয়া। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আসবেন চণ্ডীপাঠ করতে। সেই পাঠ রেডিও মারফত শুনবে সমস্ত বাঙালি। দেবীপক্ষের সূচনার শুভ লগ্ন। ১৯৩০-এর দশকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ যোগ দেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে (আকাশবাণী)। তার এক বছর পর দেবী দুর্গার পুরাণকাহিনি অবলম্বনে দুই ঘণ্টা ব্যাপী সংগীতালেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সঙ্গে যুক্ত হন। গম্ভীর এক কণ্ঠস্বরে সেই প্রথম বাঙালি শ্রোতা শুনল, “আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর…”। গ্রন্থনার দায়িত্বে ছিলেন বাণীকুমার ভট্টাচার্য এবং পরিচালক পঙ্কজকুমার মল্লিক। প্রতি বছর মহালয়ার দিন শোনা যেত বীরেন্দ্রবাবুর চণ্ডীপাঠ। 

১৯৭৬ সাল। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আকাশবাণীর কর্তৃপক্ষ ঠিক করলেন চিরাচরিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বীরেন্দ্রকৃষ্ণর বদলে উত্তমকুমারকে দিয়ে করাবেন। একটি গোপন বৈঠকও হল। সেই বৈঠক থেকে বাদ পড়লেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এই নতুন উদ্যোগ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বীরেনবাবু। পরিবর্তিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র স্ক্রিপ্ট লিখলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের বিভাগীয় প্রধান ডঃ গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই রেডিয়োয় বাজল নতুন অনুষ্ঠান ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’। চণ্ডীপাঠে মহানায়ক উত্তমকুমার। এবং অবধারিতভাবে চূড়ান্ত ফ্লপ।

সমালোচনার ঝড় উঠল সমাজের সর্বত্র। এমনকি বেতার অফিস ভাঙচুর হল। অফিসের সামনে লোকে জমায়েত করে গালিগালাজ করতে লাগল। অনেকের এমনও মনে হয়েছিল মহালয়ার পুণ্য প্রভাত কলুষিত হল। এ বার বুঝি অমঙ্গল কিছু ঘটবে! উত্তমকুমারকে দর্শক সিনেপর্দাতেই দেখতে চান, কিন্তু মহালয়ার ভোর মানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। ছিঃ ছিঃ, এ অনাচার! অন্যায়!

সম্প্রচারের দিন নিজের খাটে বসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মন দিয়ে শুনেছিলেন উত্তমকুমারের মহালয়া। সবটা শোনার পর নাকি ছেলেকে শুধু এটুকুই বলেছিলেন, “এই মহালয়া লোকে যদি নেয়, নিক।” বলেছিলেন, “ওরা একবার আমায় জানালোও না। আমি কি নতুন কিছুকে কোনো দিন বাধা দিয়েছি?” আশ্চর্যের কথা হল, এতকিছুর পরেও মানুষটা সেদিন সমস্ত ক্ষোভ-অভিমান ভুলে নিজের কাজে নেমে পড়েছিলেন।আকাশবাণী কলকাতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে ছিল ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকা। এখানে অনুষ্ঠানলিপি ছাড়াও থাকত গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস। ‘বেতার জগৎ’কে জনপ্রিয় করতে সম্পাদক নলিনীকান্ত সরকারের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণও সেই পত্রিকা ফেরি করতেন ধর্মতলা ও ডালহৌসি এলাকায়। রেডিওর প্রতি ওঁর ভালোবাসা ছিল অন্য পর্যায়ের, যে কারণে একধরণের অহং বোধও ছিল।

পাঁচের দশকের শেষ দিকের কথা। বেতার নাট্য উৎসবে মনোজ মিত্রের ‘মৃত্যুর চোখে জল’ নাটকে বিস্তর কাটছাঁট হয়েছে, এই অভিযোগ নিয়ে মনোজ ও তাঁর বন্ধুরা হাজির হলেন রেডিও স্টেশনে। তাঁদের মুখোমুখি হয়ে নাট্য প্রযোজক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সোজাসাপটা বলে দেন, ‘রেডিওতে আমরা কাটাছেঁড়া করবই। আমরা রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রকেও কাটি।’ লাইভ নাটক যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায় তার জন্য স্টুডিয়োতে বসেই সম্পাদনা করার বিরল ক্ষমতা ছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে সম্প্রচারিত হচ্ছে নাটক ‘সীতারাম’। হাতে মাত্র দশ মিনিট সময় দেখে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ, অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর এক সহশিল্পীর মুখ চেপে ধরে পাঁচটি পাতা ডিঙিয়ে বলে দিলেন কোথা থেকে আবার পড়তে হবে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের নির্ভুল আন্দাজের ফলে নাটক ঠিক সময়েই শেষ হয়েছিল।  

এখন রেডিওর যুগ আর নেই। তবুও বছরের এই একটা দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের হাত ধরে রেডিও বেরিয়ে আসে৷ বাঙালিরা মহালয়া রেডিওতেই শুনতে চায়। টেলিভিশন বা ইউটিউবে নয়৷ আবেগপ্রবণতার আরেক নাম যদি ‘বাঙালি’ হয়, তাহলে রেডিওর আরেক নাম ‘বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’। জীবনের শেষদিন অবধি লড়াই করে গেছেন ‘ভদ্র’বাবু। আজীবন স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবেই থেকে গিয়েছিলেন। পেনশনও জোটেনি। কিন্তু অবসরের পরেও আকাশবাণীতে যেতেন নিয়মিত। এ-ঘর ও-ঘর করে বেড়াতেন। এতটাই মায়া ছিল ওই বাড়িটার প্রতি। তিনি রেডিওর জন্মদাতা। বলতেন, “জন্ম দিয়েছি রেডিয়োকে আমি! জন্ম দিয়েছি! আমিই জন্ম দিয়েছি!”

তথ্যসূত্রঃ যা বীরেন্দ্র সর্বভূতেষু (আনন্দবাজার পত্রিকা ডিজিটাল আর্কাইভ, ২০১৪), বাংলালাইভ ডট কম

 

Developed by DXDasia