অন্তর্জালে আটকে পড়েই কি বদলে গেল বাঙালির ‘বিজয়া’?

বিজয়ার একাল সেকাল, সোশ্যাল মিডিয়া বনাম সাবেকি চিঠি

শ্রীচরণেষু মা,

তুমি এবং বাবা শুভ বিজয়ায় আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নিও। ছোটোদের স্নেহ আর ভালোবাসা দিও। বাড়ির বড়োদের প্রণাম জানিও।

ওপরে শ্রী শ্রী দুর্গা মাতা সহায়, ডান দিকে বিজয়া দশমী লিখে বাঁধা গতে শুরু হতো সে চিঠি। হালকা হলুদ রঙের পোস্টকার্ড বা নীল রঙের ইংল্যান্ড খামের মধ্যে লাল কালিতে লেখা বিজয়ার চিঠি। পাঠকের হয়তো এসব পড়ে মনে হতে পারে এ নিশ্চয়ই কোনো রূপকথার গল্প। আর অমনি মুঠোফোনের টুং টাং শব্দে ঘোর কেটে যায়। একটা সাজানো মিষ্টির হাঁড়ির ছবির নিচে লেখা ‘শুভ বিজয়া’-র মেসেজ আসতো ‘ইনবক্স’-এ। এটাই ঘোর বাস্তব। অতীতের রূপকথার সঙ্গে যার বিস্তর তফাৎ।

ঋণ, কুশল, শোক, সুখ অথবা বিজয়ার বার্তা দিতে চিঠি লেখার রেওয়াজ এখন অস্তাচলে। শুধু পাঠ্যপুস্তকেই বেঁচে রয়েছে চিঠি। প্রয়োজনের তাগিদে কেবল লুপ্তপ্রায় চিঠি লেখার চল। মন মজেছে মুঠোফোনে।

‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম’, গানটা শুনতে শুনতে আজকাল কেবল মনে হয়, এমন দিন আসবে জেনেই কি বনশ্রী সেনগুপ্তের গানে অমন সুর? কোন মন্ত্রবলে বিকেলের ডাক চিঠির ভাঁড়ার শূন্য হয়ে গেল কে জানে! বন্ধ খাম খুলে চিঠি পড়ার মধ্যে যে নিবিড় রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে তার স্বাদ আর চেখে দেখা হল না এ যুগের। ঋণ, কুশল, শোক, সুখ অথবা বিজয়ার বার্তা দিতে চিঠি লেখার রেওয়াজ এখন অস্তাচলে। শুধু পাঠ্যপুস্তকেই বেঁচে রয়েছে চিঠি। প্রয়োজনের তাগিদে কেবল লুপ্তপ্রায় চিঠি লেখার চল। মন মজেছে মুঠোফোনে। হরেক অ্যান্ড্রয়েড ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ই–মেল ইত্যাদির মাধ্যমে চটজলদি পৌঁছে যাচ্ছে যাবতীয় বার্তা। কিন্তু এই এতো আধুনিকতা, এতো তাড়াহুড়ো মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলছি চিঠির ছত্রে ছত্রে লেগে থাকা আপনজনের ছোঁয়াটুকু, ভাঙা ভাঙা হাতের লেখা। চিঠি আসার যে অপেক্ষা, তার মধ্যেও যেন কেমন একটা মাদকতা ছিল। যা আজকের চটজলদি এসএমএস-এর যুগে একেবারেই ব্রাত্য।

অতীত হলেও একটা বাস্তব ভিত্তি আছে চিঠির। সাহিত্য চর্চার মকসোর পিছনে ‘পত্রলেখা’-র ভূমিকা কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শঙ্খ–সুনীল–শক্তির চিঠিগুলিও সাহিত্য রসিককুলের আশ্রয়। চিঠি লেখার আয়োজনের কথা কবুল করেছেন স্বয়ং রবি ঠাকুরও –

‘দিলে তুমি সোনা–মোড়া ফাউন্টেন পেন— / কতমতো লেখার আসবাব। / ছোটো ডেসকোখানি / আখরোট–কাঠ দিয়ে গড়া। / ছাপ–মারা চিঠির কাগজ / নানা বহরের।’ 

(পত্রলেখা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

যদিও কেবল চিঠির ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিলে তা বড়ো অন্যায় হবে। বদল তো ঘটেছে সামগ্রিক জীবনচর্চায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা দিনদিন ট্রেন্ডি হয়ে উঠেছি। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার রেওয়াজ কমে গিয়েছে অনেকাংশেই, করোনা করোনা করে কোলাকুলি করতেও মানুষের এখন ভয় – আমরা শিখেছি শারীরিক দূরত্ব। ছোটোবেলায় দেখতাম বিজয়া উপলক্ষ্যে বাঙালি বাড়িতে ভাজা হতো নিমকি, গজা। ঠাকুমা, দিদিমারা বয়াম ভর্তি করে নাড়ু বানাতেন। দশমী করতে এ বাড়ি, ও বাড়ি যাওয়া – পুজোর রেশ কাটতে চাইত না কিছুতেই। এখন সেখানে এসে ভিড় করেছে হাজার ব্যস্ততা। সময়ের দারুণ অভাব। সম্প্রতি চিঠির সোনালি যুগ ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিল ডাকবিভাগ। যদিও বিশেষ কাজ হয়নি তাতে। মোবাইলের টাচস্ক্রিনের মায়ায় আটকে সময়ের আগুয়ান স্রোতে পিছু হটেছে ‘পত্রলেখা’। ডাকবাক্স আজ শূন্য। লাল ডাকবাক্সের খোলা দরজা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে জল, হাওয়া বইছে। ক্রমেই ধূসর স্মৃতির ভিড়ে জায়গা করে নিচ্ছে সেকেলে চিঠিগুলো।

সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে দশমী পালনের রীতিও। যদিও বদল নিয়ে হা-হুতাশ করার কিছু নেই। এমনকি তার জন্য প্রযুক্তিকে দোষারোপ করাও বেমানান। বিশ্বায়নের যুগে কোনো সমাজ কখনোই পুরোনো ধ্যান-ধারণা, রীতি-নীতিকে ধরে বসে থাকতে পারে না। তাতে জীবন আটকে পড়ে। তবে নতুনকে আপ্যায়ন করা মানে পুরোনোকে কবর দেওয়া, এমন হলে মুশকিল। তাই ইমেল অথবা মেসেজ এসে চিঠিকে একেবারে বলি দিলে তা বড়ো অন্যায় হবে। পুরোনো-নতুনের মিশ্রণ নিয়েই তো জীবন। অন্তর্জালের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে আটকে তাকে নিষ্প্রাণ হতে দিলে চলবে কেন?

মতামত লেখকের নিজস্ব 

Developed by DXDasia