উঠতে বসতে শুভেন্দু এখন আওড়াচ্ছেন “ভারত মাতা কি জয়”
একাধিক কারণেই এই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে নজরকাড়া কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে নন্দীগ্রাম। যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই কেন্দ্রটি বেছে নিয়েছেন এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন সদ্য দলত্যাগী বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ভারতীয় নাগরিকদের সংবিধানে এমন অধিকার দেওয়া আছে যে, তাঁরা দেশের যে-কোনো কেন্দ্র থেকেই ভোট প্রার্থী হতে পারেন। তবে সেই রাজ্যে তাঁদের একটি স্থায়ী ঠিকানা থাকা দরকার।
সেই হিসেবেই জন্মসূত্রে কাশ্মীরি পণ্ডিত নেহেরু উত্তরপ্রদেশের ফুলপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হতেন। ভিনরাজ্যের মানুষ হয়েও বাজপেয়ী জিততেন লখনৌ থেকে। মনমোহন সিং রাজ্যসভার সদস্য হয়েছেন আসাম থেকে এবং গুজরাটি নরেন্দ্র মোদি জিতেছেন বেনারস থেকে। এঁরা সকলেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছেন।
সেই অর্থে মমতা-শুভেন্দুর নন্দীগ্রামে দাঁড়ানোয় কোনো আইনি বাঁধা নেই। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দিচ্ছে নির্বাচনী প্রচার নিয়ে। মমতা কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে জিততেন। সুতরাং তিনি নন্দীগ্রাম বেছে নিয়েছেন একজন ‘বহিরাগত’ হিসেবে, এমন প্রচারই এখন শুভেন্দু অনুগামীদের তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একজন বিজেপি প্রার্থী হিসেবে শুভেন্দুর এমন প্রচার মেনে নেওয়া কঠিন। কারণ নতুন দলে যোগ দেবার পর তিনি বিজেপির শিখিয়ে দেওয়া একটি শ্লোগান এখন উঠতে বসতে আওড়াচ্ছেন — সেটি হল “ভারত মাতা কি জয়”।
তার অর্থ এই রাষ্ট্র বা ভূ-খণ্ড সমস্ত ভারতবাসীর। যদি তাই হয়, তাহলে নন্দীগ্রামের কোলে ঠাঁই পেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কোনও অসুবিধা হবার কথা নয়। উড়ে এসে জুড়ে বসার প্রশ্ন তো নয়ই৷ কারণ ভারতীয় সংবিধান এই কথা কখনও বলেনি যে কোনো একটি এলাকা কোনও পরিবারের খাসতালুক হতে পারে৷ কিন্তু শুভেন্দুবাবু এবং তাঁর বাবা নিজেদের জেলায় তেমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছেন। তাঁরা কেবল লোকসভা-বিধানসভায় আসন জেতা নয়, এমনকি রাজ্যমন্ত্রী সভাতেও স্থান করে নিয়েছিলেন। পরিবারের মোট চারজন সেইসব সুখের ভাগিদার। সেই অর্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার থেকে একমাত্র “ভাইপো” ছাড়া আর কেউ কোনো জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনিক আধিকারিক হননি৷ কিন্তু তারপরেও শুভেন্দু কেন নিজদলের উপর এতটা বিতরাগ হলেন, তার ব্যাখ্যা কেবল তিনিই দিতে পারবেন।
এবারের নির্বাচনী প্রচারে তিনি সেইসব অলংকারের কোনো প্রাপ্তি স্বীকার করছেন না। উল্টে ফিসফাস করে এই কথাই রটনা করছেন যে, মমতা বহিরাগত এবং তিনি ভূমিপুত্র। আবার তারপরেই বলছেন “ভারত মাতা কি জয়”।
কিন্তু ভূমিপুত্র বা ভূমিকন্যা হলেই যে ভোটে জেতা যায়, তেমন কোনও কথা কিন্তু নেই। অন্তত এই রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে সেরকম নজির খুব কম নয়। দেশ স্বাধীন হবার একবছর আগে ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলায় সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল। সেবার চট্টগ্রাম আসনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন অস্ত্রাগার বিদ্রোহ খ্যাত অগ্নিকন্যা কল্পনা দত্ত (যোশি)। নির্বাচনে তাঁর জয় নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন। অথচ সেই সময়ে তাঁর তুলনায় অনেক অপরিচিত জ্যোতি বসু, রূপনারায়ণ রায় বা রতনলাল ব্রাহ্মণরা কমিউনিস্ট প্রার্থী হিসেবে ভোটে জিতে বিধানসভার সদস্য হয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালের নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেন। তিনি ভূমিপুত্র হিসেবে আরামবাগ কেন্দ্রে প্রার্থী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মেদিনীপুর থেকে আসা ‘বহিরাগত’ বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখোপাধ্যায়। শেষ পর্যন্ত ভোটে জিতে যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী হন অজয়বাবু।
শুভেন্দু না জানলেও তাঁর বাবা শিশিরবাবুর নিশ্চয় মনে আছে যে, ১৯৬৯ সালে তাঁদের জেলার একটি লোকসভা আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থী হয়েছিলেন ভিকে কৃষ্ণমেনন। তার আগে তিনি মুম্বাই থেকে ভোটে জিততেন। ভূমিপুত্র এক কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাজিত করে ‘বহিরাগত’ কৃষ্ণমেননই জয়ী হন।
অর্থাৎ শুভেন্দুবাবুর মেদিনীপুর জেলার মানুষ অজয় মুখার্জি যেমন আরামবাগে গিয়ে প্রফুল্ল সেনকে হারিয়েছেন, তেমনি কৃষ্ণমেনন মেদিনীপুরে এসে জেলার এক ভূমিপুত্রকে পরাজিত করেছেন। এটা কেবল মেদিনীপুরের ঐতিহ্য নয়— এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমা। ভূমিপুত্র হলেই যে জনগণ চোখে ঠুলি পরে ছাপ্পা মারতে থাকবেন, তেমন কোনো কথা নেই।