May 19, 2017 | 12:00 PM

ভালোবাসা

ইংরেজি love-এর প্রতিশব্দ এখন যা বাঙলায় জোরের সঙ্গে চ’লছে, সেটা হ’চ্ছে ‘ভালোবাসা’। ইংরেজিতে খুবই বাচংযমতা আছে, ওদের ভাষায় ‘লাভ্’ এই একটি syllable বা অক্ষরের দ্বারা প্রকাশিত ভাবটিকে বাঙালায় জানাতে হ’লে কিন্তু চারিটি অক্ষর ‘ভা-লো-বা-সা’-র দরকার হয়। কিন্তু ‘ভালোবাসা’ শব্দটি (বা মিলিত শব্দ দুইটি), দু-শ বছর আগে বাঙলা ভাষায়, love, এই বিশিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হ’ত না। তখন ভালো-বাসা-র অর্থ, শুদ্ধ বা কেবল প্রেম, প্রণয়, স্নেহ, প্রীতি প্রভৃতি ছিল না;- ‘ভালোবাসা’ এই মিলিত শব্দটি কতকটা যেন বর্ণ-বা রাগ-হীন নিষ্প্রাণ শব্দ ছিল; এর অর্থ ছিল তখন, “ভালো ব’লে অনুভব করা, ভালো মনে করা।”

ভালো-বাসা শব্দের ‘বাসা’ বা ‘বাস্‌’ ধাতু, ‘বোধ করা’ অর্থ প্রযুক্ত হ’ত- এখন এই অর্থে ধাতুটি অপ্রচলিত হ’য়ে যাচ্ছে। ‘ভালোবাসা’র পাশাপাশি ‘মন্দ-বাসা’ শব্দটিও শোনা যায়; কিন্তু প্রাচীন বাঙলাতে ‘বাস্‌’ ধাতু বেশ জীবিত ধাতু। এই ধাতুর সহযোগে ‘ভালো-বাসা’, ‘মন্দ-বাসা’র মতন পুরাতন বাঙলায় ‘ভয়-বাসা’, ঘৃণা-বাসা’, ‘লজ্জা-বাসা’, ‘দুঃখ-বাসা’ প্রভৃতির প্রয়োগ খুবই মেলে; এমন কি, ‘বাসি ভাত ব্যঞ্জনে জিহ্বায় জল বাসে’, এ-ও পাওয়া যায়। বড়ু, চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তন’ কাব্যের মধ্যে দেখি, রাহী বা রাই আর কান বা কানু পরস্পরের প্রতি ‘নেহ’ বা ‘নেহা’ (অর্থাৎ কিনা ‘স্নেহ’) করে। ভালোবাসা’ অর্থে অন্য খাঁটি বাঙলা শব্দ চৈতন্য-পূর্ব যুগের ভাষায়, সম্ভবতঃ খ্রীষ্টীয় ১৫-র শতকে, অজ্ঞাত। এই ‘নেহা, নেহা শব্দ পরবর্তী কালে, ১৬-র আর ১৭-র শতকে ‘লেহ, লেহ’ রূপ ধরে, আর আজকালকার বাঙলায় এর একটি রূপ হ’চ্ছে ‘নেই’- যেমন, “কুকুরকে নেই দিলে মাথায় চ’ড়ে বসে”। ১৬-শতকের শেষ থেকে সম্ভবতঃ, আর ১৭-র শতকে, ‘লেহ, লেহা’ বোধ হয় সেকেলে শব্দ ব’লে পরিগণিত হয়। তখন সংস্কৃত ‘প্রীতি’ শব্দটি এসে বাঙালীর কাছে বড়োই প্রিয় হ’য়ে দাঁড়ায়। প্রায় সকলেই (বিশেষ ক’রে কবিরা) এই শব্দের মোহে প’ড়ে যায়; শব্দটিকে ভেঙে ‘পিরীতি’ আর পরে ‘পিরীতি’ ক’রে নেওয়া হয়। আজকাল যেমন ‘অবদান’, রূপদক্ষ’, ‘সত্যিকার’, ‘আকাশ-বাতাস’, ‘আপ্রাণ’, ‘প্রচেষ্টা’, ‘প্রগতি’, ‘পরিস্থিতি’ প্রভৃতি কতকগুলি শব্দের লোকপ্রিয়তা দেখা যায়, ‘পিরীতি’, পিরীত’ শব্দটিকে নিয়ে ‘ভালোবাসা’ অর্থে লোকে তখন তেমনি মাতামাতি আরম্ভ ক’রে দিয়েছিল। চণ্ডীদাসের নামের সঙ্গে জড়িত সহজিয়া ভাবের কবিতা কতগুলি আছে; সেগুলিতে ‘পিরীতি, পিরীত’ শব্দ নিয়ে অনেক ‘আদিখ্যেতা’ অর্থাৎ বাক্যবিন্যাস করা হ’য়েছে- যেমন, পিরীতি বলিয়া এ তিন আখর ভুবনে আনিল কে?’ ইত্যাদি-শীর্ষক পদ। কিংবা  ‘পিরীতি বলিয়া এ তিন আখর ভুবন’ ইত্যাদি দিয়ে আরম্ভ-করা পদ। ‘পিরীতি’র রাজত্বের অবসান হ’ল, বোধ হয় খ্রীষ্টীয় ১৭০০-র পূর্বেই। এখন ‘প্রেম বা প্রণয় বা ভালোবাসা’ অর্থে ভদ্র-সমাজে ‘পিরীতি’ শব্দের ব্যবহার অশিষ্ট ব’লে পরিগণিত হবে; শদ্বটি এখন জাতিচ্যুত হ’য়েছে। খ্রীষ্টীয় ১৮-র শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার ভাওয়ালে ব’সে পোর্তুগীস পাদ্রি বা সাধু-বাবা মানোএল দা-আস্‌সুস্পসাউ তাঁর যে ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ-ভেদ’ বই লেখেন, আর যে বই রোমান অক্ষরে লিসবনে ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দে ছাপান, তাতে কিন্তু ‘ভালোবাসা’ অর্থে ‘দয়া করা’ প্রযুক্ত হয়েছে, অন্য শব্দ নয়ঃ যীশু মানুষের প্রতি দয়া করেন, ঈশ্বরও দয়া করেন, আর ‘মাউগ’ আর ‘ভাতার’ও পরস্পরের প্রতি দয়া করে। ‘দয়া করা’ এখন কেউ বোধ হয় আর বলে না। সুতরাং ‘প্রীতি, স্নেহ, প্রেম, পিয়ার-করা’, এই ভাবের জন্য, বিভিন্ন যুগের ‘নেহ, নেহা করা’, ‘পিরীতি, পিরীত করা’, ‘দয়া করা’ এবং শেষটায় ‘ভালোবাসা’, এই শব্দগুলোর প্রয়োগ পর-পর এক বাঙলাতেই দেখা দিয়েছে।

(‘সংস্কৃতি শিল্প ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় ‘সংস্কৃতি’ থেকে নির্বাচিত অংশ)