গীতা চন্দ্র : বাংলা তথা ভারতের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার

পেশায় তিনি ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর চিকিৎসক

৯৫৭ সালের ১৭ জুলাই উত্তর ভারতের মাঝ আকাশে উড়েছিল একটি ডাকোটা বিমান (Dakota aircraft)। বিমানের দরজা খোলা। সেই দরজার পাশেই চারজন প্যারাট্রুপার (Paratroopers) পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন ছিলেন প্রশিক্ষক এবং চতুর্থজন তখনও নিতান্তই শিক্ষানবিশ। সকলেই প্রস্তুত বিমান থেকে লাফ দেওয়ার জন্য। এহেন অবাক করা ঘটনাটি দেখতে স্বাভাবিকভাবেই লোকে লোকারণ্য। প্রকৃতপক্ষেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত (Historic Moment)। সকলেই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রয়েছে এক দুঃসাহসী দৃশ্যের দিকে।

কোনো পুরুষ ডাক্তার স্বেচ্ছায় প্রশিক্ষণের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি সেদিন এবং বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করে আপত্তির কথাও জানিয়েছিলেন। অথচ গীতা চন্দ্র ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রস্তাব শোনা মাত্রই তা লুফে নেন তিনি।

অবশেষে এলো সেই নির্ধারিত মুহূর্তটি। প্রাথমিক সংকেত শুনে প্রথমেই তিনজন প্রশিক্ষক লাফ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো বিমান থেকে। তাদের ঠিক পিছন থেকে বিমানের দরজার একেবারে সামনে এগিয়ে এলো চতুর্থ প্রশিক্ষণার্থী প্যারাট্রুপার। অপেক্ষা করতে লাগলো পরবর্তী সংকেতের। পরবর্তী সংকেত শোনা মাত্র একইভাবে নিমগ্ন হলেন তিনিও। ভারতের ইতিহাসে বাংলার নাম উঠে এলো শীর্ষে। প্রথম ভারতীয় মহিলা প্যারাট্রুপার হিসাবে নাম লেখা হল তাঁর। লাফ দেওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই তিনি পিছনের দিকে একটি টান অনুভব করলেন। উপরে তাকাতেই দেখলেন তাঁর প্যারাসুটটি ততক্ষণে একটি বিশাল রঙিন ছাতার মতো স্ফীত হয়ে গিয়েছে। নিমেষে গতি কমে গেল অবতরণের, ধীরে ধীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিচের দিকে তাকালেন তিনি। কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান হল নিচের জমিটি। এবং মাত্র চল্লিশ সেকেন্ডের মাথায় নিরাপদে অবতরণ করলেন ভূমিতে। মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই জয়োল্লাসে ফেটে পড়লো জনতামহল।

কিন্তু কে এই সাহসী মেয়েটি? প্রশ্নটা উঁকি দেওয়া যথার্থ। তাঁর নাম গীতা চন্দ্র (Gita Chandra)। সাধারণ বাঙালি ঘরের এক অসাধারণ মেয়ে৩। তাঁর শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে রংপুরে। বাবা, হরেন্দ্র চন্দ্র ছিলেন কারমাইকেল কলেজের প্রভাষক। ছোটোবেলা থেকেই একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন গীতা। পড়াশোনার পাশাপাশি বাইরের জগতের প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম টান। খেলাধুলা করতেও ভালোবাসতেন সেই সময় থেকেই। বড়ো হয়ে মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন গীতা চন্দ্র। পড়াশুনা শেষ করে, ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে মেডিকেল অফিসার হিসাবে যোগ দেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গেই পোস্টিং হয় তাঁর। এর ঠিক দুই বছর পর, ১৯৫৯ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সমস্ত চিকিৎসকদের প্যারা-ট্রুপিং-এ প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সেইমতো সার্কুলার পাঠানো হয় সমস্ত বন্দরগুলিতে। কোনো পুরুষ ডাক্তার স্বেচ্ছায় প্রশিক্ষণের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি সেদিন এবং বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করে আপত্তির কথাও জানিয়েছিলেন। অথচ গীতা চন্দ্র ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রস্তাব শোনা মাত্রই তা লুফে নেন তিনি। সহকর্মীরা তাঁকে সার্কুলারটিতে “প্রযোজ্য নয়” লিখতে অনুরোধ করলে সেই পরামর্শে রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়ে যান গীতা। বরং অবিলম্বে এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেন। তাঁর সেদিনের সিদ্ধান্ত হতবাক করে দেয় সকলকে। কারণ সকলেরই বিশ্বাস ছিল প্যারা-ট্রুপিং একটি বিপজ্জনক কাজ যেটি শুধুমাত্র সৈন্যদের জন্যই প্রযোজ্য। ফলে, যাঁরা তাঁর বিরোধিতা করেছিল তাঁরা সকলেই গীতা চন্দ্রের দ্রুত পশ্চাদপসরণের জন্য দিন গুণতে থাকলেন।

কিন্তু গীতা চন্দ্র সফল হওয়ার লক্ষ্যে ছিলেন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখার্জির (Air Marshal Subroto Mukherjee)  তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে প্রশিক্ষণ। সুব্রতবাবুর একনিষ্ঠ সমর্থন এবং উৎসাহ না থাকলে হয়তো মাঝপথেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো গীতার ইচ্ছে। সুব্রত মুখার্জি তখন ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রথম ভারতীয় কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। নির্ধারিত কোর্সের জন্য নির্বাচিত হলে ১৯৫৯ সালের মে মাসে প্যারা-ট্রুপার স্কুলে যোগদান করেন গীতা। উত্তর ভারতে শুরু হয় তাঁর প্রশিক্ষণ। তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষানবিশ যিনি উত্তরের সমভূমির প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যেও স্কুলে প্রশিক্ষণ নিতে পিছ-পা হননি। প্রায় দেড় মাস ধরে পাঁচ মাইল স্প্রিন্ট করতে হয় তাঁকে। পাশাপাশি চলতে থাকে শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম। এরপর শুরু হয় তাঁর প্যারা-ট্রুপিং -এর মাঠে নেমে শেখার কাজ। একসময় শেষ হল প্রশিক্ষণ, এবং এগিয়ে এলো চূড়ান্ত পরীক্ষা দেওয়ার সময়।

অবশেষে সেই দিন। ঠিক যেখান থেকে এ লেখাটা শুরু হয়েছিল। ১৯৫৯ সালের ১৭ জুলাই, একটি উড়ন্ত ডাকোটা বিমান থেকে লাফ দিলেন গীতা চন্দ্র। এবং অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করলেন তাঁর সফর। তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভি.কে. কৃষ্ণ মেনন (V.K. Krishna Menon) সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। অজস্র সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনিও সাক্ষী ছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের। চারিদিকে উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড় সেদিন আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল গীতার আত্মবিশ্বাসকে। এই অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় জীবনের দ্বিতীয় প্যারা-ট্রুপিং ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেন গীতা চন্দ্র। যদিও দুর্ভাগ্যবশত সেবার, প্রথমবারের মতো ততটা মসৃণ হয়নি সফরটি। বিমান থেকে লাফ দেওয়ার পরেই পেঁচিয়ে যায় প্যারাসুটটি। গিঁটের মধ্যে জট লেগে যায়, ফলে ঠিক যেভাবে খোলা বা স্ফীত হয় প্যারাসুটটি সেভাবে হতে পারে না। গীতা অবশ্য জানতেন এই মুহূর্তে তাঁকে ঠান্ডা মাথায় এবং খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর কাছে প্রতিটি সেকেন্ড তখন মূল্যবান। তবুও লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি তিনি। প্রতিমুহূর্তে প্রশিক্ষকদের বলা কথা গুলি স্মরণ করেছিলেন। লক্ষ্যে অবিচল থেকে নিপুণ দক্ষতায় চালিয়ে গিয়েছিলেন প্যারাসুটটি। অবশেষে একসময় নিরাপদে পা রাখলেন মাটিতে।

প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গীতা চন্দ্র সাতবার প্যারা-ট্রুপড হয়েছিলেন, যার মধ্যে একবার ছিল রাতের সফর। সফলভাবে সম্পূর্ন প্রশিক্ষণটি সম্পন্ন করার পর, এয়ার মার্শাল মুখার্জি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে প্যারা-ট্রুপারের ব্যাজ দিয়ে সম্মানিত করেন।

ভারতের প্রথম মহিলা প্যারাট্রুপার ছিলেন একজন বাঙালি মেয়ে, গীতা চন্দ্র। ভাবতে অবাক লাগে আজ আর সেদিনের সেই সাহসী বাঙালি মেয়েটিকে মনে রাখেনি বাঙালি। ইতিহাসের পাতা থেকে অচিরেই মুছে গিয়েছে তাঁর নাম।

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।

Post Tags
Written by
Developed by DXDasia