রামায়ণ থেকে তেঁতুলপাতা : প্রবাদের অন্তরমহল

প্রবাদবাক্যের পরম্পরা : শেষ পর্ব

আগের পর্বের পর…

ই যে প্রবাদ, তা যেমন জনশ্রুতি, মৌখিক ধারা, সাহিত্য রচনার আদিম রূপ বা উপাদান, তেমনই এটি আবার বহু ক্ষেত্রেই প্রভাবিত হয়েছে, ধারণ করেছে এবং তার সঙ্গে উদ্ভবই ঘটেছে লিখিত সাহিত্য, তার কাহিনি থেকে। উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

‘সে রামও নেই, আর সে অযোধ্যাও নেই’ প্রবাদটি দিয়ে – কথাটি কোথায়, কখন ব্যবহার করা হয়, আমরা সবাই জানি। কথাটির মধ্য দিয়ে যে হতাশা, নিরাশা বা সুন্দর, স্বর্ণালী সময় ও স্মৃতির রোমন্থন প্রকাশ পায়, তা কারোর অজানা নয়। এবার রাম-ই কেন? বা রামায়ণ মহাকাব্যটিই বা কেন?

যদি আমরা ভারতীয় মহাকাব্যের দিকে, মূলত রামায়ণ-এর দিকে তাকাই এবং পরবর্তীতে তার কাহিনি, তার মধ্যে থাকা moral message বা নীতিপূর্ণ বার্তার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে এর গুরুত্ব বা প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। আর এটা বোধহয় কোনওভাবে এড়ানো যাবে না যে, রামায়ণ থেকেই প্রচুর প্রবাদ তার নিজগুণে বাংলা ভাষায় এসে নিজের জায়গা করেছে। একে একে সেগুলোর দিকেই বরং তাকিয়ে দেখা যাক ও সেই সংক্রান্ত কথা বলা যাক – 

শুরু করা যাক ‘সে রামও নেই, আর সে অযোধ্যাও নেই’ প্রবাদটি দিয়ে – কথাটি কোথায়, কখন ব্যবহার করা হয়, আমরা সবাই জানি। কথাটির মধ্য দিয়ে যে হতাশা, নিরাশা বা সুন্দর, স্বর্ণালী সময় ও স্মৃতির রোমন্থন প্রকাশ পায়, তা কারোর অজানা নয়। এবার রাম-ই কেন? বা রামায়ণ মহাকাব্যটিই বা কেন? এর উত্তরে দিতে গেলে বলতে হয়, রঘুকুলতিলক নবদূর্বাদলশ্যাম জানকীপ্রাণবল্লভ নয়নাভিরাম শ্রীরামচন্দ্র তাঁর বনবাসপর্ব ও রাবণবধের পর নিজভূমি অযোধ্যায় ফিরে এসে রাজপদে অভিষিক্ত হওয়ার পর তিনি যেভাবে রাজ্যশাসন বা বলা ভালো রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন, তা একপ্রকার স্বর্গীয়। সদাসর্বদা ও সর্বত্র সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি যেভাবে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল, তেমনই সমানাধিকার, ন্যায়, বিচার একপ্রকার অকল্পনীয় স্বর্গসুখ এনে দিয়েছিল প্রজাদের কাছে কোনও অভিযোগ ছাড়াই; এমনকি মানুষ শুধু নয়, ধরিত্রী ও অন্যান্য প্রাণীকুলও যে চূড়ান্ত সুখের এবং দাবি, নিজস্ব অভাব-অভিযোগ জানানোর স্বাধীনতা ও অধিকার পেয়েছিল, তা স্বয়ং মহাকাব্য থেকেই জানতে পারা যায়। অর্থাৎ, এই যে কল্পনার স্বর্গরাজ্যকে বাস্তবে পরিণত করা (utopia তৈরি করা বা বলা যেতে পারে organisation of utopian state), তা-ই ফুটে উঠেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তো সবই যায়, কেননা, সময় এমন এক রাক্ষস যা সবকিছুকেই গিলে নেয়, ফলে, যখন তার পরের পরিস্থিতির অবনমন হয়, একেবারেই উলটো বা আশানুরূপ হয় না, তখন মানুষ আক্ষেপ করে এই প্রবাদটি কথার মধ্যে ব্যবহার করে থাকে। ফলে, এই প্রবাদটি মানুষ যখন ব্যবহার করে, তখন তার উদ্দেশ্যটা কিন্তু একই থাকে। আগের একটি সুন্দর পরিবেশ বা পরিস্থিতি থেকে পরের অন্য একটি মন্দ পরিস্থিতি। এ যেন অবিকল সেই গানের লাইন মনে করিয়ে দেয় – ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…’।

ইংরেজি ভাষাতেও এরকম পরিস্থিতিতে প্রায় একইরকম কথাই ব্যবহার করা হয়। এর ইংরেজি হচ্ছে – ‘Oh the times! Oh the manners’ – অর্থাৎ, এখানেও কিন্তু সেই পুরনো সময় এবং তাকে কেন্দ্র করে আক্ষেপ প্রকাশ পাচ্ছে ‘times’ বা ‘manners’ কথাটার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় শব্দটি ধরণধারণ বা prevalent practices বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্যে ব্যবহৃত exclamation mark-এর একটি গুরুত্ব রয়েছে। এটি sudden expression of emotions-কে চিহ্নিত করতে বাক্যে বসে। যেটি অবশ্যই এই বাক্য অনুসারে sorrow বা a sense of loss of old and good times-কে বোঝাচ্ছে।

এবার আসা যাক ‘একা রামে রক্ষে নেই, তায় সুগ্রীব দোসর’-এ। এই প্রবাদটি ভিত্তি পায় যখন একটি দুর্ধর্ষ, অনপনেয়, প্রতিকূলসাধ্য কোনও কিছুর সঙ্গেই প্রায় তেমন মাত্রার আরেকটি কিছুর যোগ হয়। এটি মূলত রামায়ণের যুদ্ধ-বীরত্ব-যোগদান ইত্যাদি সংক্রান্ত। এবার এই প্রবাদটি বলতে গিয়ে এমন কিছু প্রবাদ মনে পড়ে যায়, যেগুলির ভাষা এক না হলেও, বয়ান ও বক্তব্য ও ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রায় একইরকম। তেমনই দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক – এক: মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। দুই: গোদের ওপর বিষফোঁড়া (গ্রামাঞ্চলে অনেককেই ‘বিষফোঁড়া’ কথাটিকে ‘বিষফট্কা’ বলতে শোনা যায়।)। ইংরেজি ভাষায় সমমাত্রার এমনই বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যায় of almost equal trouble or danger বোঝাতে। যেমন, A man already stuck by lightning, bitten by a snake বা A man already stuck by lightning, bitten by a snake বা To add fuel to the fire বা To add insult to injury বা To rub salt in the wound…

এছাড়াও, রামায়ণ সংক্রান্ত একাধিক প্রবাদ রয়েছে; তার দুটো বলে আপাতত উক্ত বিষয়ে ক্ষান্ত হচ্ছি। এক – লঙ্কায় যে যায় সে-ই রাবণ হয়/ হয়ে যায়/ হয়ে ওঠে। দুই – সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা হল রামের মা।

এই দুটোর মধ্যে প্রথমটি পরিবর্তনের আশা ও শাসকের ধর্ম, যা কিনা বাস্তবতার কথা বলছে, তাকে নির্দেশ করে। মানে, আমরা এটা জানি যে, আঞ্জনেয়, মহাবলী হনুমান শ্রীরামের আজ্ঞানুসারে লঙ্কায় যান উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে এবং ফিরেও আসেন (মাঝের কাহিনি সবার জানা, ফলে সে-নিয়ে এখানে স্বভাবত কথা বলা হচ্ছে না); কিন্তু, এই প্রবাদে তার মূল ভাবটিকে overturn করে, অন্য একটি বাস্তবতা দেখানো হচ্ছে এই বলে যে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে ও সেই ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ করতে গিয়ে অন্য যে-জন ক্ষমতার নিকটে গিয়ে পৌঁছায় ও ক্ষমতা তার হস্তগত বা অধীনস্থ হয়, সে-ও পূর্বের শাসকের মতনই দাম্ভিক ও দাঁতনখযুক্ত অচেনা ও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই, রাবণ, লঙ্কা ইত্যাদির প্রতীকী ব্যবহার ঘটেছে, যাকে mythical allusion ভাবা যেতে পারে।

দ্বিতীয়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সবারই জানা যে, মাতা কৌশল্যার কোল আলো করে আসা রঘুবীর শ্রীরামের অর্ধাঙ্গিনী ধর্মপত্নী মিথিলের রাজা জনকনন্দিনী সীতার রাবণকৃত হরণ ও তাঁকে পুনরায় মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে আনা ও সেই হেতু ধর্মযুদ্ধের দ্বারা অন্যায় ও অধর্মের বিনাশ ও সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই মূল গল্প। তাহলে এমন উক্তি জন্মাবার কারণ? এর কারণ জানতে গেলে আমাদের আদিকবি বাল্মিকীরামায়ণ ছেড়ে অদ্ভুত রামায়ণের দিকে তাকাতে হবে, কেননা, এর কাহিনি পূর্বের রামায়ণে নেই। গল্পটা এরকম – 

শ্রীরামচন্দ্র দশস্কন্ধ রাবণকে (লঙ্কেশ যিনি) বধ করার পর যখন মা সীতার পুনরুদ্ধার হল, অন্যদিকে শ্রীরামচন্দ্র ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, তখন সহস্রস্কন্ধ রাবণের আবির্ভাব ঘটে; সেইসময় শ্রীরামের কোনও অস্ত্র, কোনও বাণ তাঁকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হলে এবং নিজেও শ্রান্ত হয়ে গেলে, তার বধার্থে মাতা সীতা স্বয়ং উগ্র রূপ ধারণ করেন (যা কিনা আদিশক্তি মা মহামায়ার পরাশক্তিস্বরূপ) ও বধ করেন। আর সেই সময় নিজের অর্ধাঙ্গিনীর এমন অভূতপূর্ব দিব্য রূপ দেখে তিনি বোধ, বিস্ময় ও আকুলতা বলে ‘মা’ বলে ডেকেছিলেন। ফলে, সেই বিরল ঘটনা থেকেই এই প্রবাদের উৎপত্তি।

ল্যাটিন একটি ফ্রেজ় রয়েছে — ‘Omnia causa fiunt’, যার ইংরেজি এরকম — Everything happens for a reason; এবার এর বাংলাটি খুব মজার: ‘ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্য’ বা ‘ভগবান যখন যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন’।

লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, এই প্রবাদ বা এই ঘটনাটি আসলে স্ত্রী-কন্যা-মাতা ইত্যাদি স্বরূপের ঊর্ধ্বে গিয়ে সম্পূর্ণ মাতৃসত্ত্বার রূপটিকে পূজিত করেছে। ঠিক যেভাবে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ফলহারিণী অমাবস্যা তিথিতে সারদা দেবীকে ষোড়শী দেবী (আদিশক্তির অন্যতম প্রকাশ) হিসেবে পুজো করেছিলেন।

শেষে সংক্ষেপে আর কয়েকটি প্রবাদ বলে যাওয়া — 

যস্মিন্ দেশে যদাচার — এটি কোথাও যেন adaptability এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’-কে নির্দেশ করে যায়। মানে, যেখানে যেমন, সেখানে তেমনভাবে অভ্যাস করে থাকতে হবে, নাহলে সেখান থেকে বাদ পড়ে যেতে হবে। এর ইংরেজিটি এমন — 
When in Rome, do as the Romans do
এটি মূলত রোমের কঠোর নিয়ম ও একইসঙ্গে প্রাচীনতা বুঝিয়ে থাকে। 

ল্যাটিন একটি ফ্রেজ় রয়েছে — ‘Omnia causa fiunt’, যার ইংরেজি এরকম — Everything happens for a reason; এবার এর বাংলাটি খুব মজার: ‘ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্য’ বা ‘ভগবান যখন যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন’। 

এবার এই যে ল্যাটিন ভাষায় বা ইংরেজি ভাষায় cause বা কারণ উঠে এল, সেটি বাংলায় এসে ভগবান বা ঈশ্বর-এর ‘যখন যা করেন’ কথাগুলি এল, তাতে কী মুগ্ধকরভাবে আস্তিক্য এবং বিশ্বাস ও আত্মার সমর্পণটি মিশে গেল।

এমন শত শত উদাহরণ রয়েছে। সব বলার অবকাশ বা সাধ্য কোনওটাই নেই। তবু এই যে সবার সঙ্গে সামান্য হলেও বলতে পারা, এ-ও আর কম তো কিছু নয়। সামান্য হলেও, সুখসঙ্গ যে অসামান্য হয়ে ওঠে, স্মরণীয় হয়ে ওঠে এবং তাকে মর্যাদা দিয়ে টিকে থাকা যায়, সে তো অন্ত্যমিলযুক্ত বাংলা প্রবাদ ‘যদি হয় সুজন, তেঁতুলপাতায় ন’জন’ বলে গেছে। নয় কি? 

এ-লেখার সার্থকতা বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা পাঠকদের পাঠেই। শুধু সামান্য অনুসন্ধিৎসা থেকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, মাতৃদুগ্ধসম প্রাণের এই বাংলা ভাষার প্রবাদে কত কত দিক, চিহ্ন, বিস্তৃতির পরিসর ও নানান উপাদান থাকা সত্ত্বেও, আমাদের সাধারণ ব্যবহার সেসব ছুঁতে পারে না হয়তো আমাদেরই নিজস্ব ত্রুটি, অর্থাৎ, আগ্রহ ও মনোযোগের কারণে…
 

Developed by DXDasia