আসমা, লাইলিদের বুননে দুর্গার নানা রূপ – গ্রামবাংলার কারুকথা

বাংলার নকশিকাঁথা প্রদর্শনী ২০২৩

ত কয়েক বছরের মতো দুর্গাপুজোর আগে, এবছরও ৫ থেকে ৮ অক্টোবর গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় আয়োজিত হয়েছিল প্রদর্শনী–বাংলার নকশিকাঁথা। সারা বাংলা থেকে কাঁথা-সূচীশিল্পের কারিগররা নিজেদের পসরা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন এই প্রদর্শনীতে। এবারও তার অন্যথা হয়নি। লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছে বীরভূম, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, সোনারপুর, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার বিভিন্ন জেলার শিল্পীরা।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার আসমা সুলতানা, পূর্ব বর্ধমানের শেখ নূরজাহান, পশ্চিম বর্ধমানের লাইলি বিবি, বীরভূমের রাফেয়া বিবি, সাহিদা বেগম, নদিয়ার হাবিবা মণ্ডল, বহরমপুর কাঁথা সেলাইয়ের আশ্চর্য ভান্ডার নিয়ে লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালার এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন।

কাঁথাসেলাই মূলত ভারত ও বাংলাদেশের লোকশিল্প,  বাংলার মহিলারাই যার প্রণেতা। আজও গ্রামবাংলার মহিলা, মূলত সংখ্যালঘু মহিলাদের হাতেই এই সূচিশিল্প লালিত হচ্ছে। ৯০ দশক পর্যন্ত বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে কাঁথাসেলাইয়ের কিছু না কিছু নমুনা থাকত। কাপড় পুরোনো হলে, সেই কাপড়ের কাঁথা বানাতেন বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা। সেই কাঁথা ঘরের মেঝেতে ফেলে, তার ওপর রঙিন সুতোয় নানান নকশা তুলতেন। সুতো জোগাড় করতেন কাপড়ের শক্তপক্ত পাড় থেকে, তাঁতিদের থেকে নয়তো দোকান থেকে। ধাপে ধাপে, ধৈর্য্য আর সূক্ষ বুননে তৈরি হত নকশাদার কাঁথা। পরে কবি জসিমুদ্দিনের রুপাই আর সাজু'র জন্য 'নকশিকাঁথা' জনপ্রিয় হয়। 

গাছের নীচে দু’টি হরিণ আর নীচে লেখা “সোনার হরিণ কোন বনেতে থাকো?” বা কয়েকটি ফুলের ছবির সঙ্গে “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে”— এমন সব ছবি ও কথা লেখা হত কাপড়ের উপর রঙিন সুতো বুনে। কোনও কোনও বাড়িতে আবার এই ধরনের শিল্পকর্ম ফটোর আকারে কাচের ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখাও হত।

দুহাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই বিশিষ্ট শিল্পশৈলীটি ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে দেখা গেলেও, বাঙালির সংস্কৃতিবলয়ে এর প্রকাশ ঘটেছে এক অনন্য নিজস্বতায়। দুর্জনি থেকে জায়নামাজ, আর্শিলতা থেকে বাতায়ন, খিচা থেকে সুজনি—বহু বিচিত্র আকারে এবং নামে তার পরিচিতি। রানফোঁড়, ডালফোঁড়, ক্রশফোঁড়, বেঁকিফোঁড়, জালিফোঁড়—সুচসুতোর নানান কারুকৃতিতে তার উদ্ভাস। বাংলার মেয়েরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, প্রীতি-অনুরাগ দিয়ে এই শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। 

শুধু কাঁথা নয়, বিছানার চাদর, ব্যাগ, ডাইরি, টেবিল ক্লথ, উত্তরীয়, অন্যান্য পোশাক পরিচ্ছেদও কাঁথা সেলাইয়ের ছোঁয়ায় অনন্য করে তুলেছেন তাঁরা। তবে নকশি কাঁথার কথা আলাদা। সময় ও পরিশ্রম অনুযায়ী দামও বেশি। কোনোটির দাম ১৫০০, কোনওটি ২৫০০, কোনোটি আবার ২৫০০০। লাখ টাকার নকশাও আছে। কারো কারো জন্য এই শিল্পসামগ্রীগুলি কেনা সাধ্যাতীত হলেও এহেন শিল্পকর্ম তো আসলেই ‘অমূল্য’।   

 

গ্রামীণ মহিলাদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কাঁথাশিল্প কতখানি ভূমিকা রাখতে পারে, এরকম একটি প্রদর্শনী সেই কথাই বোঝাতে চাইছে। নদিয়ার হাবিবা মণ্ডল বলছিলেন, “বাজারে যন্ত্রের তৈরি কাঁথার দাম অনেক কম। তা কিনতেই ক্রেতার আগ্রহ বেশি। তাই এখন বরাত মেলে না। ফলে কাঁথা তৈরি করে উপার্জন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সরকারি সাহায্য ছাড়া এই শিল্পকে বাঁচানো যাবে না। তবে, সেই সাহায্য ধীরে ধীরে পাচ্ছি আমরা। রাজ্য সরকারের তরফে এই ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন হওয়াতে নকশি কাঁথা নিয়ে আবার নতুন করে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।”   

দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে প্রদর্শনী থেকে কেমন বিক্রিবাট্টা হল? পশ্চিম বর্ধমানের শম্পা মজুমদারের কথায়, “অন্যান্য শিল্পসামগ্রীর তুলনায় কাঁথাশিল্পের দাম অনেকটাই বেশি, তাই প্রচুর বিক্রি হবে এ আশা করি না। তবে, দুর্গাপুজোর আবহে ভালোই হল প্রদর্শনী। প্রচুর মানুষ এলেন, আমার কাজ দেখলেন, কেউ কেউ কেনেননি এমনটাও নয়। এটুকুই পাওয়া।”

কিন্তু বর্তমানে কাঁথাশিল্প মৃতপ্রায়। শহুরে জীবনে কাঁথার কদর নেই। একটি নকশি কাঁথা তৈরি করতে এক জন কাঁথাশিল্পীর যে পরিমাণ পরিশ্রম হয়, সেই পরিমাণ মজুরি তাঁরা পান না। একটি ঝাড়ফুল বা আঙুরখোপা কাঁথার মূল্য এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। কাঁথার জন্য এত খরচ করতে অনেকেই বিমুখ। এ ছাড়া সস্তা, অত্যাধুনিক কম্বলে বাজার এতটাই ছেয়ে গিয়েছে যে প্রতিযোগিতায় কাঁথার টিকে থাকা মুশকিল।

Post Tags
Developed by DXDasia