সুব্রত মুখোপাধ্যায় : এক ঘর ভিন্ন ঘরানা

সুব্রত মুখোপাধ্যায়, যিনি রাজনীতিতে উদারতার পরিচয়ই দিয়েছেন বারবার

ঞ্চাশ বছরের বেশি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সুব্রত মুখোপাধ্যায় বড়ো অংশটাই কাটিয়েছেন কংগ্রেস দলে। অবিভক্ত কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদেই তিনি রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। সর্বভারতীয় স্তরে দল ভেঙে যাবার পর তিনি ইন্দিরা গান্ধির কংগ্রেসে আসেন। ১৯৭১ সালের নির্বাচনে বালিগঞ্জ কেন্দ্রে বামপ্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা বিশিষ্ট অধ্যাপক জ্যোতি ভট্টাচার্যকে তিনি পরাজিত করেন। যেমন সেবারই দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা আসনে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম সৈনিক গণেশ ঘোষকে হারিয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। তবে তার পেছনে প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধির ভূমিকা। তবুও সেবারই রাজ্য বিধানসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল সিপিআইএম।

সুব্রতবাবু একবছর পরে পুনরায় একই কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন এবং সিদ্ধার্থ রায় মন্ত্রীসভায় মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবন যতটা মসৃণ ছিল, তারপরেই সেই ছক বদলে যায়। ইন্দিরার পরাজয়ের পরে কংগ্রেসে আবার ভাঙন আসে। যখন সিদ্ধার্থ রায়, প্রিয়রঞ্জন, সৌগত রায়েরা কংগ্রেস (এস) দলে যোগ দেন। তরুণ কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে সুব্রত মুখার্জি বা সোমেন মিত্র সেই স্রোতে গা ভাসাননি।

এই সময় থেকেই সুব্রতবাবু বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেস দলে থেকেও একটা ভিন্ন ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ইন্দিরা গান্ধি কংগ্রেসের কর্ত্রী হবার আগে পর্যন্ত কংগ্রেস দলে একটা গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল ছিল। সেখানে অন্ধ আনুগত্যের চেয়েও বড়ো ছিল স্বতন্ত্র কণ্ঠ। সীমিত পরিসরে হলেও সুব্রতবাবু সেই আদলটি অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন বামেদের যে জয়যাত্রা শুরু হয়েছে, তা সহজে বিদায় নেবার নয়। ফলে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন ফ্রন্টের নেতা হিসেবেই বামেদের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেন।

তবে সেটা করতে গিয়েও তিনি কংগ্রেস ঘরানার চিরস্থায়ী লক্ষণগুলি বিসর্জন দেননি৷ সিদ্ধার্থ রায় মন্ত্রীসভার সদস্য থাকার সময়েই তিনি গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন উত্তর কলকাতার কংগ্রেস নেতা শত ঘোষের সঙ্গে। প্রিয়রঞ্জন দল ছাড়ার পরে তাঁর সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। ১৯৮২ সালে কলকাতায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে। সেখানে সদ্য প্রয়াত উত্তমকুমারের নামে কেন তোরণ তৈরি হয়নি, তা নিয়ে তিনি রবীন্দ্র সদনে তুমুল বিক্ষোভ দেখান। সেই সময়ে প্রদেশ কংগ্রেসে প্রণব-গণিখান দ্বন্দ্ব ছিল রোজকার ঘটনা। সুব্রতবাবুর অনুগামীরা বিমানবন্দরে ইন্দিরা গান্ধির সামনেই গণিখানকে লাঞ্ছিত করেন। যদিও সেই সময়ে সুব্রতবাবু, ইন্দিরার যথেষ্ট আস্থাভাজন ছিলেন।

১৯৮৪ সালে ইন্দিরার প্রয়াণের পর একটি ভিন্ন পর্ব শুরু হয়। সেই বছরে তাঁরই উদ্যোগে যাদবপুর কেন্দ্রে নবাগতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন এবং মমতা জয়ী হন। বলতে গেলে সেটাই মমতার রাজনৈতিক জীবনের প্রকৃত যাত্রা শুরু। বলা প্রয়োজন তার পর থেকে মমতার সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ততদিনে প্রিয়রঞ্জন আবার কংগ্রেসে ফিরে এসেছেন। হয়তো সেটাও এই ব্যবধানের একটা কারণ হতে পারে।একটা কথা এখানে বলা প্রয়োজন। সোমনাথবাবুরাও মনে করতেন, তাঁকে হারানোর নাটের গুরু ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু সুব্রতবাবু নিজে কোনোদিন সেই কৃতিত্ব দাবি করেননি৷ বরং তিনি এটাই বলতেন, যে দমদমে নীরেন ঘোষ যেমন হেরেছেন, তেমনি যাদবপুরে সোমনাথবাবুও। এমন যা কিছু ঘটেছে, তার পেছনে কাজ করেছে ইন্দিরার মৃত্যু। সেই কারণে সারা দেশে সেবার হাওয়া কংগ্রেসের পক্ষে ছিল।

সুব্রতবাবু সোজা কথা সোজাভাবেই বলতেন। সেটা তাঁর নিজের দলের নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে যেমন, তেমনি অন্য দল সম্পর্কেও। সেই তালিকায় গণিখান-সিদ্ধার্থ রায়-প্রিয়রঞ্জনরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন বিভিন্ন বামনেতারাও। সেখানে কোনো রাখঢাক ছিল না। নিজে কবে কোথায় ভুল করেছেন, সেই কথাও অকপটে মিডিয়ার সামনে বলে ফেলতেন।

এই মানসিকতা একটা গণতান্ত্রিকতা বা উদারতারই লক্ষণ। হয়তো সেই কারণেই তিনি তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হবার সময় সেই দলে যোগ দেননি। এমনকি কলকাতা পুরসভায় তাঁকে মেয়র করার পরেও তিনি আবার তৃণমূল ছেড়েছেন।

পাশাপাশি এই কথাও বলতে হবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে তাঁর একটা অপত্য স্নেহ ছিল যা পরে সমীহতে পরিণত হয়েছে। নাহলে তিনি কখনোই হাসিমুখে মমতা মন্ত্রীসভায় একজন অধীনস্থ সহকর্মী হিসেবে যোগ দিতে পারতেন না। এখানেও এক ধরনের উদারতাই কাজ করেছে, যা তাঁর সহজাত ছিল।

(বক্তব্য লেখকের নিজস্ব)

Developed by DXDasia