বেহালা আর্ট ফেস্ট ২০২৩ : দক্ষিণ কলকাতার গলিপথে মুক্ত শিল্পচর্চা

এ বছরের থিম ছিল আনবাউন্ড অর্থাৎ মুক্ত

মহাবিশ্বে শিল্পের চাহিদা কতটুকু তা বুঝতে গেলে বিখ্যাত সেই উক্তিটির স্মরণাপন্ন হতে হয়। যেখানে বলা হয়েছে, আপনি যা দেখেন তা শিল্প নয়, আপনি যা অন্যকে দেখান তার নামই শিল্প। এই শিল্প যখন জুড়ে যায় অতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কড়চার সঙ্গে, তখন তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার হয়। মেহনতি মানুষের অধিকার ও দাবিদাওয়া নিয়ে শিল্প প্রতি দশকে তার সংজ্ঞা বদলেছে। হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন। শিল্পকে বরাবর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা। প্রতিবছর বেহালা চৌদ্দ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পরিত্যক্ত জায়গা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অঙ্গনবিশেষ। এই শিল্প উৎসবের একটা পোশাকি নাম আছে — বেহালা আর্ট ফেস্ট। সম্প্রতি শেষ হল এই উদযাপনের তৃতীয় বছর।

বেহালা আর্ট ফেস্টের আহ্বায়ক-শিল্পী সনাতন দিন্দা বলছিলেন, “বিগত দুই বছর কোভিড অতিমারির পরেও সারা বিশ্বকে চূড়ান্ত অবক্ষয়ের পথে ঠেলে দিল রাশিয়ার ইউক্রেনের উপর অবাধ দাদাগিরি। অতি দক্ষিণপন্থীদের উত্থান রুদ্ধ করতে পারেনি শিল্পী-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদদের চেতনাকে। আমরা রাস্তা খুঁজছি শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে নয়, মুক্ত করতে চাইছি নিজের চেতনাকে, অনবরত।” চেতনাকে আমৃত্যু মুক্ত করতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, ফ্রিদা কাহলোরা। সেই মায়েস্ত্রোদের শ্রদ্ধা জানালেন দুই বাংলার শিল্পীদল। ইট-পাথরের সুউচ্চ ফ্ল্যাটবাড়ির দেওয়াল উজ্জ্বল হয়ে উঠল ঋত্বিক ঘটকের পোর্ট্রেটে, কখনও জয়নুল আবেদিনের রেখাচিত্রে। কোনো দেওয়াল হয়ে উঠল মনের আয়না, আবার গলিপথের সাথী হলেন মৃণাল সেনের নায়িকারা। এভাবেই বাংলার শিল্পীরা তিনদিন শিল্পমুখর করে তুললেন দক্ষিণ কলকাতার এই ব্যস্ততম এলাকাটিকে।

ইট-পাথরের সুউচ্চ ফ্ল্যাটবাড়ির দেওয়াল উজ্জ্বল হয়ে উঠল ঋত্বিক ঘটকের পোর্ট্রেটে, কখনও জয়নুল আবেদিনের রেখাচিত্রে। কোনো দেওয়াল হয়ে উঠল মনের আয়না, আবার গলিপথের সাথী হলেন মৃণাল সেনের নায়িকারা।

মাটির ভাস্কর্য ইন্সটলেশন

মৃণাল সেনের নায়িকা

উৎসবের মডারেটার শমীন্দ্রনাথ মজুমদার তাঁর বয়ানে বলেছেন, “আজ আমরা আমজনগণের সামনে আমাদের শিল্পচর্চাকে মুক্ত করতে চাইছি। জনগণের শুভার্থে যে কাজ, সেই কাজে মানুষের প্রেম তাঁকে বৃহৎ করে। তাঁর কাছে দূর নিকট পরিচিত অপরিচিতের কোনো পার্থক্য থাকে না। সমসাময়িকতা ও স্থানিকতার তুচ্ছতা থেকে সে মুক্ত হয়।” তাই সনাতন দিন্দার কাজ মিশে গেল আমজনতার সঙ্গে। সরাসরি সেই কাজ হাতে ছুঁয়ে দেখতে পারলেন দর্শক। কী সেই কাজ? দামে সস্তা কিস্তিতে সহজ, টেকে অনেক দিন — এই মর্মে হাজির হয়েছে চোখ, নাক, কান, ঠোঁট। দেওয়ালে সাঁটানো আয়নায় নিজেকে আরও সুন্দর করে তোলার বয়ান সনাতন দিন্দার কাজে শোভা পাচ্ছে। দর্শক আসল নাকে নকল নাক গলাচ্ছেন আর আয়নায় দেখে নিচ্ছেন নিজের টিকালোপানা নাকের গড়ন, তৎক্ষনাৎ চিত্রগ্রাহক তাঁর ছবিও তুলে দিচ্ছেন৷ শিল্প আর দূরের ‘খায় না মাথায় দেয়’ নয়, শরীরের অংশ। সনাতন দিন্দার এই কাজটির নাম ‘আরশিনগর’। তিনি বলেন, “অন্যের চোখে নিজেদের দেখতে অভ্যস্ত আমরা বহিরাঙ্গের ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে ক্রমশই শরীরকে আরও চর্চিত করতে থাকি। এইভাবেই পৌঁছে যাই সেই ভূমিখণ্ডে, যেখানে খণ্ড খণ্ড সুসজ্জিত দেহাংশ আমাদের বহুদূরে নিয়ে যায় প্রকৃত ব্যক্তিত্ব থেকে।” মানুষের এই নিরাপত্তাহীনতাই তাঁর কাজে প্রকাশিত হয়েছে।

সনাতন দিন্দার কাজ ‘আরশিনগর’

গলিপথ ধরে হেঁটে চোখে পড়ল আরও শিল্পীর কাজ৷ নজর কাড়লেন ঈশিতা অধিকারী। তাঁর কাজটির নাম ‘মুক্তবন্ধ’। যেখানে তিনি দেখাচ্ছেন নারী-চুলের গরিমা। এলোচুল, বিনুনি চুল, খোঁপা চুল — চুলের বাহারের আড়ালে মনে পড়ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চুলের মুটি ধরা অত্যাচার, মনে পড়ছে উনিশ শতকীয় বিধবা নারীর চুল ছেঁটে ফেলার রেওয়াজ৷ আরেকদিক থেকে চুল হয়ে উঠছে জীবনের অংশ, চুল বাঁধা যেন জীবনকে বেঁধে ফেলার সমান। ঈশিতার কাজে এলোচুল হয়ে উঠল শিল্প। বাংলাদেশের শিল্পী শেখ তানজিলুর রহমান হিমেলের ‘প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ যোগ করল ভিন্ন মাত্রা। বাউলতন্ত্রের সঙ্গে মনের মানুষের মিলন উঠে এল গাছের শিকড়ে বাকরে, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পৌঁছে গেল উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িটার ছাদে। আবহে একতারার ঝংকার।

ঈশিতা অধিকারীর কাজ ‘মুক্তবন্ধ’

দীপ দাসের কাজ ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া’

শক্তি শর্মার কাজ ‘ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর’

বাংলাদেশের আরও এক শিল্পী প্রমিতি হোসেন তুলে এনেছেন ঢাকাইয়া রিকশা — সে দেশের ঐতিহ্য যান। দীপ দাসের ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া’ শীর্ষক কাজে উঠে এক মনুষ্য শরীরের উলঙ্গ আবরণ। শক্তি শর্মার ‘ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর’-এ দেওয়াল জুড়ে পাখির বৃহৎ পালক, তা থেকে খসে খসে পড়ছে রাস্তায়, পাশে নির্জন কবি জীবনানন্দ দাশের দু-লাইন কবিতা – “সাধ নয়- স্বপ্ন নয়- একবার দুই ডানা ঝেড়ে/ বেদনারে মুছে ফেলে দিতে চায় ; – রুপালি বৃষ্টির গান, রৌদ্রের আস্বাদ/ মুছে যায় শুধু তার,- মুছে যায় বেদনারে মুছিবার সাধ।” (মৃত মাংস)

বেহালা আর্ট ফেস্টে এ বছরের থিম ছিল আনবাউন্ড অর্থাৎ মুক্ত। শিল্পচেতনাকে উন্মুক্ত করতে এগিয়ে এসেছেন বরোদা এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবরাজ গোস্বামী, ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের অধ্যাপক শমীন্দ্রনাথ মজুমদার, কলাভবনের শিল্প ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৌমিক নন্দী মজুমদারের মতো বিশিষ্টজনেরা।

গ্যালারির পরিসর কমে আসছে, সাধারণ মানুষও কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন গ্যালারির ঘেরাটোপ থেকে। তাই বেহালার সরু অলিগলি, দোকানপাট, বাড়ির দালানকে বেছে নেওয়া হয়েছে শিল্পচর্চার বিকল্প স্থান হিসেবে।

শিল্প-স্বাধীনতা

প্রমিতি হোসেনের কাজে ঢাকাইয়া রিকশা

গ্যালারির পরিসর কমে আসছে, সাধারণ মানুষও কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন গ্যালারির ঘেরাটোপ থেকে। তাই বেহালার সরু অলিগলি, দোকানপাট, বাড়ির দালানকে বেছে নেওয়া হয়েছে শিল্পচর্চার বিকল্প স্থান হিসেবে। শিল্পের কাজই হল পরিচিত গণ্ডিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শেখানো। রোজকার জীবনের বাইরে নতুন কিছু ভাবতে শেখানো। বেহালা আর্ট ফেস্ট কলকাতার বুকে যেন সাময়িক অক্সিজেন৷

____

ছবি – নিজস্ব

Developed by DXDasia