সাবর্ণ সংগ্রহশালায় উপস্থিত থাকবেন মুঘল রাজপরিবারের সদস্যরা
সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় মুঘল দরবারে (Mughal Darbar) এসেছিলেন ইংরেজ কূটনীতিক চার্লস রো। রো জানিয়েছেন, সম্রাটদের জীবনযাত্রা ছিল ঘড়ির সময় অনুসারে নিয়ন্ত্রিত। তবে সব কিছুর পরও সম্রাটরা তাদের দৈনন্দিন রুটিন নিজেরাই ঠিক করতেন এবং নিজেদের খেয়ালখুশি মতো বদলে নিতেন। সম্রাটদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে প্রধান ছিল দর্শন (সাধারণত ভোরবেলায় সম্রাট সাধারণ মানুষদের দেখা দিতেন, যাকে দর্শন বলা হত), গণদরবার, খাশদরবার, মন্ত্রীদের নিয়ে সভা এবং হেরেমে বসে শেষ করতেন গোপনীয় ও প্রাসাদ সম্পর্কিত কাজ। এছাড়া ছিল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন। দর্শনের পর সম্রাটদের পরবর্তী কর্মসূচি থাকত দিওয়ান-ই-আমের দরবার। এ দরবারে সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকতেন। দরবারের সময়সূচিতে বিভিন্ন সম্রাটের সময় ভিন্নতা দেখা যায়।
সম্রাট আকবর সাধারণত সকাল ৯টায় তার গণদরবারে বসতেন। কিন্তু আবুল ফজল জানিয়েছেন মাঝে মাঝে আকবর শেষ বিকালে এমনকি রাতের বেলায়ও দরবারে বসতেন। জাহাঙ্গীর দরবার বসাতেন বিকালে, শাহজাহানের দরবার বসত সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে আর আওরঙ্গজেবের ৯টা ৪০ মিনিটে। আকবর এবং জাহাঙ্গীর তাদের গণদরবার বসাতেন আগ্রার প্রাসাদের দরবার প্রাঙ্গণে। কিন্তু শাহজাহান সে স্থানে দর্শনীয় এক দিওয়ান-ই-আম নির্মাণ করান। ৪০টি স্তম্ভবিশিষ্ট এ স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল লাল বেলে পাথর।
‘দিওয়ান-ই-আম মুঘল দরবার’ শীর্ষক আলাপচারিতার এই আসর বসবে ১৯ জুন রবিবার বিকেল ৩টে থেকে, সাবর্ণ সংগ্রহশালার রুফটপে।
এরকমই বেশ কিছু জানা-অজানা ইতিহাস আলোচনার সুযোগ করে দিচ্ছে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ (Sabarna Roy Chowdhury Paribar Parishad)। সাবর্ণ সংগ্রহশালার (Sabarna Sangrahashala) প্রতিষ্ঠাদিবস উপলক্ষ্যে পরিবারের অন্দরমহলে মুঘল ইতিহাসকে আবার চোখের সামনে হাজির করানোরও উদ্যোগ নিয়েছে তারা। তিন বছর পর আবার বসছে এই দরবার। ‘দিওয়ান-ই-আম মুঘল দরবার’ শীর্ষক আলাপচারিতার এই আসর বসবে ১৯ জুন রবিবার বিকেল ৩টে থেকে, সাবর্ণ সংগ্রহশালার রুফটপে।
তবে, এই দরবারে সিংহাসন নয়, সোফায় বসবেন ‘রাজা’। প্রজা নয়, রাজসভা নয়, সভাঘরে হাজির হবেন ইতিহাসের সুলুকসন্ধানীরা। শুরু হবে আধুনিক মুঘল দরবার।
সেই আলাপচারিতায় যোগ দেবেন মুঘল রাজপরিবারের সদস্যরা। কথায় কথায় উঠে আসবে নানা অজানা ইতিহাসের গল্প, উন্মোচিত হবে ঐতিহ্যশালী মুঘল ইতিহাসের এক টুকরো। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার পর্ষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায় চৌধুরীর কথায়, “২০১৯ সালের পর আবারও আয়োজিত হতে চলেছে সাবর্ণ পরিবারের অন্দরমহলে। ১৯ জুন ৩টে থেকে ৪.৩০টে আর ৫টা থেকে ৬.৩০টা, দুই পর্বে প্রশ্নোত্তর চলবে। সাধারণ মানুষও এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন তবে, সেক্ষেত্রে তাঁদেরকে প্রশ্ন পাঠাতে হবে, সেই প্রশ্নের ভিত্তিতে ডেকে নেওয়া হবে। উপস্থিত থাকবেন মুঘল রাজপরিবারের সম্রাট বাবরের ২৭তম বংশধর এইচ.ই মমতাজ হোসেন চৌধুরী, বেগম মৈত্রেয়ী চৌধুরী ও রাজকন্যা অমৃতা।”
প্রসঙ্গত, সাবর্ণ সংগ্রহশালা সারা বছর খোলা থাকে, যেখানে ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারেন সাধারণ মানুষ। এর পাশাপাশি একবার করে আন্তর্জাতিক মেলা বসে ইতিহাসকে কেন্দ্র করে, যেখানে চমক থাকে নানারকম। এসবের পরেও কেন মুঘলদের রাজ দরবার নিয়ে অভিনব উদ্যোগ? পরিবারের কর্তারা বলছেন, আসলে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সাবর্ণদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সাবর্ণ পরিবারের ১৯তম পুরুষ পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায় হুমায়ুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ছিলেন যুদ্ধের মূল পরামর্শদাতাও। আপন বন্ধুকে ‘শক্তিখান’ উপাধি দেন সম্রাট হুমায়ুন। পাশাপাশি পান তখনকার হাভেলি শহরের জায়গির, যা এখন হালিশহর নামে পরিচিত। মুঘলদের বন্ধুত্বের খাতিরে এলাকায় ‘পাঁচুশক্তিখান’ বলে পরিচিত হন ওই সাবর্ণ-সন্তান। সম্রাট জাহাঙ্গীরের হাত ধরে উপঢৌকন হিসেবে হীরের আংটির পাশাপাশি ১৬০৮ সালে আটখানা পরগনা নিষ্কর জায়গির পায় সাবর্ণরা। আজকের হালিশহর থেকে ডায়মন্ডহারবার পর্যন্ত এলাকায় শুরু হয় নতুন জনজীবন। আধুনিক কলকাতার গোড়াপত্তন হয় তখনই। সুদূর দিল্লির সিংহাসন থেকে এভাবেই গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যায় বঙ্গদেশ। সাবর্ণ পরিবারের কথায়, দিল্লির ওই সুন্নি মুসলিম রাজ পরিবারের সঙ্গে বাংলার ব্রাক্ষ্মণ পরিবারের ৪৮০ বছরের পুরনো সম্পর্ককেই আরও একবার উদযাপন করতে চাইছেন তাঁরা। এই আধুনিক আম দরবারে সিংহাসন নয়, সোফায় বসবেন ‘রাজা’। প্রজা নয়, রাজসভা নয়, সভাঘরে হাজির হবেন ইতিহাসের সুলুকসন্ধানীরা। শুরু হবে আধুনিক মুঘল দরবার।
মুঘল দরবারে আসনসংখ্যা সীমিত, তাই যোগদান আমন্ত্রণমূলক। যাঁরা ওই দরবারে যোগ দিতে চান তাঁদের নাম, ঠিকানা এবং একটি ভালো প্রশ্ন ১২ জুনের মধ্যে এসএমএস করে পাঠাতে হবে এই নম্বরে ৯৮৩০২৮৯৪০০।