June 21, 2017 | 12:00 PM

বাংলার অন্ন-কথা ৬

চাল দেখতে যত সুন্দরী আর খেতে যত স্বাদের, তার ওপর বিচার করেই কৃষক ধানের নাম রাখতেন। কৃষক বহু চালের রূপ আর গন্ধে আকৃষ্ট হয়েছেন, নারীর রূপের সঙ্গে তুলনা টেনে তাই নাম দিয়েছেন সুমিত্রা, শিউলি, রাজলক্ষ্মী, রাধাশ্রী, মল্লিকা, মালাবতী, পারমিতা, কাজলসুন্দরী রানিকাজল, শ্রাবন্তী, রত্নমুখী, বৌভোগ, বৌদুলালি, মধুমিতা, লীলাবতী, শ্রাবণী, রাধুনিপাগল। রাধুনিপাগল এরমধ্যে সেরা। চালের রং ঘি –এর মতো,মাঝারি লম্বা আর ম-ম করা গন্ধ। নির্মল শেখ বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের কৃষক। ৫ কাঠা জমিতে রাধুনিপাগলের চাষ করেন। বলছিলেন, চিকন চালের রাধুনিপাগল হাঁড়িতে ফুটতে শুরু করলে দেড়শ – দুশো মিটার দূর থেকেও গন্ধ পাওয়া যায়। আর যদি তখন হয় শীতকাল, গোটা পাড়া তাহলে গন্ধে ভরে উঠবে। ভাত খাওয়ার পর হাতে গন্ধ থাকে দু -তিন ঘণ্টা। কেবল বাড়িতে আনন্দের অনুষ্ঠান হলে নির্মল শেখদের পাড়ায় এ চালের ভাত রান্না হয়।

সারাবছর এই চাল রান্না হয় না কেন? নির্মল বলছিলেন,” ভাত এত মোলায়েম যে, মাঠে খেটে খাওয়া মানুষের পেটে বেশিক্ষণ থাকে না।” রাধুনিপাগল মূলত বীরভূমের ধান, তবে এখন বাঁকুড়াতেও চাষ হচ্ছে। এইসব চালের ১৩ টা রং এখনও পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কোনোটা দেখতে দুধেআলতা, কোনোটা রূপালি, কোনো চাল হালকা বাদামী, কোনোটার রং হালকা সোনার মতো, চোখ ফেরানো দায়।

উত্তরবঙ্গের তুলাইপাঞ্জি, কালোনুনিয়ার নাম যত শোনা যায় বৌদুলালির নাম ততটা চাপা পড়েছে, চাল সুগন্ধী, লম্বা, হালকা সোনার মতো দেখতে। উত্তরবঙ্গের সেরা চাল। কিন্তু প্রচারের অভাবে বৌদুলালি শুধু কৃষকের রান্না ঘরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। উদ্যোগ নিলে বাংলার সেরা চালের একটা হতে পারত। পূর্বমেদিনীপুরেও বৌদুলালি চাষ করেন কৃষক। তবে এ চালে উত্তরবঙ্গের মতো এত স্বাদ নেই। বৌদুলালির মতো রয়েছে বৌভোগ ধান। বৌভোগ আবার চাষ হয় দুই মেদিনীপুরে। এ চালেও মন মাতানো গন্ধ।শুধু আবহাওয়ার পার্থক্যে স্বাদে আলাদা।

রত্নমুখীর চাষ হয় পুরুলিয়ায়। চাল দেখতে সাদা, তবে একমুখ সোনালি। সোনালি -সাদা ভাত থালায় পড়লে মনে হবে যেন স্ফটিক। রাধাতিলক চাষ হয় পুরুলিয়ায়, পূর্ব মেদিনীপুরে চাষ হয় মধুমিতার। চালের রং গিনির মতো। রামনগরের কৃষক অসিত মান্না বলছিলেন, “গোলায় ধান রাখলে গন্ধ বের হয়। বোঝা যায় মধুমিতা রাখা আছে।”

এ রাজ্যের প্রান্তিক কৃষক বিক্রির জন্য এসব ধানের চাষ করে বাজারে নিয়ে গেলে ব্যবসায়ী মিলবে না,তা সে সন্দেশখালি হোক অথবা বাঁকুড়া। সর্বত্র ব্যবসায়ীদের চাহিদা মিনিকিট, স্বর্ণ মাসুরি, আইআর ৩৬ এ, ইদানীং দেখা যাচ্ছে বহুজাতিক সংস্থাগুলো বাজারে নানা জাতের উচ্চফলনশীল ধানের বীজ নিয়ে আসছে। একটু সরু চাল হলে বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে বাঁশকাঠি, চামরমণি, দুধেরসর বলে। বৌভোগ, বৌদুলালি, মধুমিতা পড়েই থাকবে কৃষকের গোলায়।