June 6, 2017 | 12:00 PM

বাংলার অন্ন-কথা ৪

উচ্চ ফলনশীল ধানের চাষ করতে গিয়ে জমির উর্বরতা শক্তি কমেছে। এক বিঘে জমিতে প্রতিবছর সারের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে কৃষকের খরচ বাড়ছে ধান চাষ করতে গিয়ে। ক্রমাগত রাসায়নিক সার ব্যবহারে উর্বরতা শক্তি কমায় জমি থেকে ধান তুলে নেওয়ার পর পরের ফসলেরও ফলন কমেছে। তিন ফসলি জমিতে কমেছে পাটের উৎপাদন। তাই চড়া দাম না পেলে কৃষক লোকসানের মুখে পড়ছেন প্রতিবছর। আর গোবর সারে উচ্চফলনশীল ধানের উৎপাদন কম। ইদানীং প্রবণতা দেখা যাচ্ছে,কম দিনের পুরনো ধান চাষ করতে চাইছেন কৃষক।

অধিকাংশ পুরনো ধান ৫ থেকে ৬ মাসের ফসল। কিন্তু তালমুগুর, চিনিকামিনী, বেগুনবিচি ৪ মাসের ফসল। বাঁশকাঠিরও উচ্চফলন বীজ পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে এখন উচ্চফলনশীল বাঁশকাঠির চাষ করছেন কৃষক। দেখতে পুরনো বাঁশকাঠির মত, তবে স্বাদে আসমান – জমিন ফারাক। এখন আর সীতাভোগ চাষ হয় না বহু জেলায়। তবে ৩৭৪ নামের একধরনের উচ্চফলনশীল ধান হাতে পেয়েছেন কৃষক, দেখতে সীতাভোগের মতই, কিন্তু গন্ধ নেই। ব্যবসায়ীরা এই চালে দিব্যি রাসায়নিক ছিটিয়ে দিয়ে সীতাভোগের গন্ধ এনে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছেন। একসময় কৃষক জমির চরিত্র অনুযায়ী ধান বুনতেন। বিলে হত জলকামিনী, লালজোবরা, বাঁকুই, গন্ধকচু, উড়েচাতরা, হোগলা, লালবালাম, লাঠিশাল, নুনঝুরি দুলপি। তখন কৃষক বিলে ধান কাটতে যেতেন ডিঙি নৌকা অথবা তালকাঠের ডিঙিতে। উত্তর ২৪ পরগনার বল্লির বিলে তখন উড়েচাতরা ধান কাটতে হত ২০ ফুট জলের ওপর। উড়েচাতরা ধানের শিস ২০ ফুট জলের ওপর ভেসে বেড়াত অনেকটা শ্যাওলার মত। কৃষকের কাছে এমন বহু বীজ এখনও রয়েছে। এখন আর বর্ষা হয় না তত। কৃষক তাই কম জলের ধানের দিকে ঝুঁকছেন।

নোনা জমিতে বোনা হয় লীলাবতি আর পাথরকুঁচি আর যেখানে জল থাকে না সেখানে কৃষক বুনছেন কেয়া, নৈচি,ন্যাতোর মত ধান। বাঁকুড়ায় ভৈরব সাহানির কাছে এখনও এমন ৪২ জাতের ধান রয়েছে। বাঁকুড়া মত শুখা ও টাঁড় জমিতে এসব ধানের চাষ হচ্ছে। সুন্দরবনের নোনা এলাকায় চাষ হচ্ছে হামাই, হোগলা, লীলাবতি, সোনাঝুরির। সুন্দরবনের জগদীশপুর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের দীনবন্ধু দাসের কাছে রয়েছে এমন ৫০ জাতের ধান। কৃষিবিজ্ঞানী অনীশ দাস বলছিলেন, “কৃষক ব্যবসায়িক কথা ভেবে অতীতে কোনোদিন চাষ করতেন না। নিজের বাড়িতে খাওয়ার সময় যে চালের গন্ধ তার পছন্দ হত, আর যে চাল খেলে পেটে অনেকক্ষণ থাকত সেই ধানই চাষ করতেন কৃষক। তখন ভোরে পান্তা খেয়ে বেড়িয়ে পড়তেন কাজে, ফিরতেন বিকেলে, ততক্ষণে পেটে পড়ত না কিছু। আর এখন কৃষক জমিতে চাষ করতে যান চা- বিস্কুট খেয়ে, আজকাল মাঠেও চা-বিস্কুট যায়। পুরুলিয়ায় ১০১০ নামের একধরনে উচ্চফলনশীল ধানের চাষ করছেন কৃষক, তা নাকি পেটে অনেকক্ষণ থাকে। তবে তা পুরনো ধান বৌভোগ, ফুলকাঠি, চন্দ্রমণি, মেঘলালের বিকল্প হবে না কখনও।” বৌভোগের ভাত খেয়ে হাত ধুলেও গন্ধ যেত না। ভাতে লঙ্কা ডলে খেয়ে নিতেন কৃষক।