February 25, 2019 | 9:59 PM

শুধু বন নয়, জলের ধারেও বাস যাদের

এ এক অন্য সুন্দরবনের গল্প

শুধু বাঘের সঙ্গে নয়, মানুষগুলোকে রোজ লড়তে হয় জলের সঙ্গেও। লড়াই কেন? জল তো জীবন? হ্যাঁ, কিন্তু, সমুদ্রের নোনা জল বাঁধ ডিঙিয়ে জমিতে ঢুকে এলে বন্ধ্যা হয়ে যায় মাটি। ফসল ফলে না। তখন বদলে ফেলতে হয় জীবিকা। চাষি হয়ে পড়েন মজুর কিংবা নির্মাণশ্রমিক। বাঁধ ভাঙলে জল বাস্তু খেয়ে নেয়। কিন্তু, নোনা জল খাওয়া যায় না। সমুদ্র ফুঁসে উঠলেই তাই বুক কেঁপে ওঠে। সুন্দরবনের জঙ্গলঘেরা, নদী-সমুদ্র-খাঁড়ির পাশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামগুলির পঞ্চাশ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকা আবর্তিত হয় তাই রক্ষাকবজ বাঁধকে ঘিরেই।

এই বাঁধ কতখানি ক্ষতিকর, বাঁধের জন্য নদীগর্ভে পলি জমেই জলস্তর উঠে আসছে কিনা, এইসব প্রশ্ন আজ মুলতুবি থাক। আজ বরং কথা হোক, ঐ মানুষগুলোকে নিয়েই। বাঁধের ভালো-খারাপ দিক নিয়ে তর্কের বাইরে যারা বাসা বেঁধেছেন বাঁধের পাশেই। জল বারবার বাসা খেয়ে নেয়। জমিতে ঢুকে আসে নুন। বন্ধ্যা জমিকে তখন ফেলে রাখতে হয় তিন-চার বছর। বৃষ্টিতে নুন ধুয়ে যেতে সময় লাগে। এক ধাক্কা থেকে পরের ধাক্কার মাঝে ঘুরে দাঁড়াতেও কম সময় লাগে না মানুষগুলোর। তারইমধ্যে মোহনা উজিয়ে হেসে ওঠেন কেউ। একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন খাটতে খাটতে। ভাঙা ঘরের দেওয়ালে লেপ্টে থাকে পুরোনো সাধের ছবি। ভাটির দেশ সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দেশ সুন্দরবন। পর্যটকদের দুদিনের নৌকাবিলাস আর বাঘ দেখার রোমাঞ্চের সুন্দরবন। সেখানেই এঁরা থাকেন, বাঁচেন। ঘর বাঁধেন। ধ্বংসের মুখে বাঁধ দেন।

এই মানুষদের জীবনালেখ্যকেই কলকাতায় হাজির করল একটি অসামান্য প্রদর্শনী। ‘বাঁধের ধারে যাদের বাস’। ২১-২৩ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রসদন-সংলগ্ন গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শনশালায় আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে একইসঙ্গে ছিল আলোকচিত্র ও পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রীর প্রদর্শনী। আয়োজনে ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’। উদ্যোক্তারা নিজেরাই জানিয়েছেন, সুন্দরবন নিয়ে প্রদর্শনী কম হয়নি। কিন্তু, এই প্রদর্শনীর গল্প আলাদা। কেন আলাদা, তা প্রদর্শনীতে গেলে বুঝতে অসুবিধে হয় না। সুন্দরবনের ভয়াল বন্য পরিবেশ এখানে নেই। বাঘ নেই, মধু নেই, কুমির নেই। আছে বাঁধের পাড়ের মানুষ। সুন্দরবন যাদেরও দেশ। আছে পাড়ে লেগে ছিটকে আসা ঢেউ। আছে জলে ধসে যাওয়া বাড়ি, ফের বাসা গড়ার গল্প। বড়ো তেজি বাতাস এখানে। হাওয়ায় যেন ছিটকে যায় আলোও। সেই আলো, বাতাস, জল, স্রোত, স্রোতে ক্ষয়ে আসা ইট, ভাঙা দেওয়াল, বলিরেখা-ভরা মাটির মানুষদের মুখ, বেঁচে থাকার গান, ফুলের মাঝে অলীক একটা হাসিমুখ, বই শুকোতে দেওয়া কচি-কাচা—এই সবটাকে জুড়ে নেয় একের পর এক অনবদ্য ফ্রেম। সাজানো ছবি নয়। অভিজিৎ চক্রবর্তী আর কৌশিক চ্যাটার্জীর ক্যামেরায় জীবন তাদের গতিতেই কথা বলে ওঠে। বাঁক নেয়। উথাল-পাথাল হয়। সব ছবি সাদাকালো। না ভুল বললাম, সাদা আর কালোর মধ্যেই হাজারো স্তর। আলো-ছায়া, দোলাচল, বাঁককে এত রঙিনভাবে ধরতে পারত আর কোন রং!

শুধু ছবি নয়, এই প্রদর্শনীতে রয়েছে সুন্দরবন থেকে খুঁজে পাওয়া নানা পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রীর প্রদর্শনীও। সেই কবেকার মুদ্রা, ফসিল। রয়েছে সুন্দরনের লোকজীবনের নানা হদিশ। পুতুলে, গয়নায়। এই সবই উজ্জ্বল সরদারের সংগ্রহ। সংগ্রহ অবশ্য এখানেই শেষ নয়, সুন্দরবন নিয়ে ভার-বাংলাদেশের প্রকাশ করা ডাকটিকিট, দুষ্প্রাপ্য বই, পত্রিকা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিলও সাজানো এই চার দেওয়ালের ভিতরেই।

কলকাতাবাসীর কাছে এক অন্য সুন্দরবনকে হাজির করে ‘শুধু সুন্দরবন চর্চা’র এই প্রদর্শনী। শুধু ম্যানগ্রোভ, আদিম বনজীবন নয়, সুন্দরবন এইসব মানুষদেরও আলেখ্যভূমি। এখানে সব ছবিই তাই একাধিক গল্প বলে। সব সংগ্রহই চিনতে শেখায় সেই আবহমান লোকজীবনকে, সভ্যতাকে।

Developed by DXDasia