ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়ে : পোশাক নিয়ে বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর বিতর্কিত বয়ান
শিল্পী- হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার, ছবিঋণ : ম্যুরালআর্ট.কম
বক্ষ নিয়ে সাম্প্রতিক যে বাকযুদ্ধ, তাতে মনে পড়ে গেল, সুধীর চক্রবর্তীর প্রবন্ধে পড়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর গানের শব্দ পাল্টেছিলেন। সুধীরবাবু বলছেন, “রবীন্দ্রনাথ নিয়ে গবেষণা করেন বা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে থাকেন, এমন অনেকে (যেমন নিত্যপ্রিয় ঘোষ, সমীর সেনগুপ্ত, স্বপন সোম) আমায় জানালেন… প্রথম মুদ্রিত রূপে ছিল: ঝড়ে যায় উড়ে যায় আমার বুকের আঁচলখানি…।” কিন্তু পরে কবি স্বয়ং বদলে করলেন ‘মুখের আঁচলখানি।’ যৌনতা নিয়ে কি তাঁর ছুৎমার্গ ছিল? তিনি কি লেখেননি ‘একটি চুম্বন দাও হে প্রমদা…’ ইত্যাদি? তাহলে কেন? সম্ভবত, কারণটি এই যে, প্রথমোক্ত গান নারীর বয়ান। নারী কী করে নিজমুখে বলবেন আপন বুকের কথা? তেমন নিলাজ, বেহায়াকে কি মানা যায়?
এই যে খানিক ভিক্টোরিয়, খানিক ব্রাহ্ম ঘরানার শালীনতার ধারণা, তার রেশ আজও বর্ষীয়ান নৃত্যশিল্পী/অভিনেত্রীর কণ্ঠে। শাড়ি পরার আধুনিক ধরন বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়, বক্ষযুগল থেকে আঁচল সরে যাওয়ার প্রবণতাটি অশালীন। অথচ আমাদের নিরক্ষীয় সংস্কৃতিটি প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভুদের সংস্কৃতির থেকে খানিক আলাদা। খাজুরাহো বা কামসূত্র-র সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, তারা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সৃষ্ট হলেও, খোলামেলা নারীশরীর দেখলেই আঁতকে ওঠার প্রবণতা প্রতিহত করবে— এ কাম্য ছিল। আমাদের জ্ঞান ও শিল্পের দেবীর স্তুতি শুরু হয় ‘কুচযুগ-র’ বর্ণন দিয়ে, কিন্তু শরীর ছাড়িয়ে তাঁর ধী-র প্রতি প্রণতি জানাতে এ সংস্কৃতির অসুবিধে হয়নি।
বিতর্কিত বয়ানটিতে ‘রাস্তার মেয়ে’ বা ‘ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়ে’ বলতে যাঁদের বোঝানো হয়েছে, আমাদের সাহিত্য, ইতিহাস ও লোককথা অনুযায়ী তাঁদের কেউ কেউ শুধু যৌনপেশাজীবী নন, বরং স্বাধীনচেতা, স্বোপার্জনশীল, বুদ্ধিজীবী নারী।
এদিকে বিতর্কিত বয়ানটিতে ‘রাস্তার মেয়ে’ বা ‘ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়ে’ বলতে যাঁদের বোঝানো হয়েছে, আমাদের সাহিত্য, ইতিহাস ও লোককথা অনুযায়ী তাঁদের কেউ কেউ শুধু যৌনপেশাজীবী নন, বরং স্বাধীনচেতা, স্বোপার্জনশীল, বুদ্ধিজীবী নারী। তাঁদের বাড়িগুলি সেযুগের শিল্পসংস্কৃতি ও বৌদ্ধিকচর্চার ক্ষেত্র। যেমন আম্রপালি (বৌদ্ধ জাতক) বা বসন্তসেনা (মৃচ্ছকটিক)। আজ আমরা তাঁদের ‘যৌনকর্মী’ বলি, কিন্তু অন্তত ‘যৌনকর্মী’ বলাটা কাম্য, ‘রাস্তার মেয়ে’ বা ‘ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়ানো মেয়ে’ নয়।
তবে বিতর্কিত বয়ানটিতে দেহোপজীবিনীদের অনাভিজাত্যের প্রতি হয়তো তাচ্ছিল্য আছে, কিন্তু সমালোচনার আসল লক্ষ্যবস্তু ‘এখনকার মেয়েরা’, যাদের পেশা দেহকেন্দ্রিক নয়। তারা কেন আঁচল সম্পর্কে সতর্ক হবে না? আঁচল বক্ষকে ভালোভাবে না ঢাকলে সে কেমন ‘ভালো মেয়ে?’
ভালো মেয়ে আর মন্দ মেয়ের এই দ্বিত্বকে পশ্চিমে বলে angel/ whore binary। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেহেতু ‘বলাকা’-য় ‘দুই নারী’ নামে এক কবিতা লিখেছিলেন, আর সেখানে পরস্পরের বিপ্রতীপে দাঁড় করিয়েছিলেন লক্ষ্মী ও ঊর্বশীকে, তাই আমরা না হয় একে লক্ষ্মী-ঊর্বশী দ্বিত্ব নামেই ডাকলাম। এই দ্বিত্বের বিকাশ যে পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকেই হচ্ছিল না তা নয়, কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রভাব তাকে করেছিল অতিত্বরাণ্বিত। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুরা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের পত্র-পত্রিকায়, অনেক সময় কাল্পনিক দুই নারীর কথোপকথনের মাধ্যমে, এমন নানা নীতিশিক্ষামালা প্রকাশ করতেন, যাকে বলা যায় ‘লক্ষ্মী মেয়েদের কনডাক্ট বুক’। তারা গৃহের শোভা, অবগুণ্ঠনাবৃতা, তারা বেশি পড়াশোনা করলে স্বামী মারা যায়, আর পরপুরুষে আসক্ত হলে সাদাস্রাব বাড়ে — এমন অনেক অদ্ভুতুড়ে তত্ত্ব সেখানে থাকত। সর্বোপরি, এই মেয়েরা প্রায় অযৌন, কিন্তু স্বামীর যৌন সেবাদাসী। সে আব্রু রক্ষা করবে, সেই আব্রু ভেদ করার অধিকার একমাত্র পুরুষের। তার আবরণ উন্মোচন করে পুরুষ যা দেখবেন, তাকে পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী, স্তোকনম্রাস্তনাভ্যাং, শ্রোণীভারাদলসগমনা ইত্যাদি বলে বর্ণনা করবেন। কিন্তু নারী যেচে নিজেকে উন্মোচিত করবেন না।
পোশাক যদি নিজেকে আকর্ষক করে তোলার প্রচেষ্টাও হয়, সচেতনে বা অবচেতনে, তবু সে শ্রদ্ধার পাত্রী হতে পারে, কারণ তার যৌন ইচ্ছা তার একটি মাত্র পরিচয়, একমাত্র পরিচয় না। যে কোনো পুরুষের ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুমতি লেখা নেই তার পোশাকে।
নারীর বড়ো বুক বা নিতম্ব জৈবিক। কিন্তু দেখার চোখটি যেহেতু পুরুষালি ফ্যান্টাসি নির্মিত, তাই বর্ণনা সচরাচর বিবর্ধিত। এবার, নিজের জৈবিক দেহটিকে নারী আঁচলের বাইরে রাখবে না ভিতরে, ওড়না পরবে না পরবে না, তা যে কোনো সভ্য দেশে ব্যক্তিই স্থির করেন৷ সভ্য জগতের আরেক দস্তুর হল, যা কিছু প্রলুব্ধ করে, তাতে হামলে পড়া মানা। চোখের সামনে সুইস ঘড়ি পড়ে থাকতে দেখলেও চুরি করতে বাধা দেয় যা, তাকে আমরা বলি ‘বিবেক’ আর ফ্রয়েড বলেন ‘সুপার ইগো’ বা ‘কনসেন্স’। তা অর্জিত শিক্ষা ও সংস্কারের ফসল। মুশকিল হল, চুরি করা যে খারাপ, তা যেমন ভাবে আমাদের অর্জিত শিক্ষা, তেমন ভাবে নারীকে কেবলমাত্র ভোগ্য না-ভাবাটা আমাদের সহজাত শিক্ষা নয়। চলার ধরন, বসার ধরন (‘ঠিক করে বোসো’ শুনতে শুনতে আমাদের বড়ো হওয়া; ফ্রকে যেন আহাঁটু ঢাকা থাকে, যেন কোনোভাবে দেখা না যায় উরু, যোনিদেশ), পোশাক, বাচালতা — যে কোনো অজুহাতে নারীর ভাগ থেকে সম্মান খারিজ হতে থাকে৷ পুরুষের উরু বা শ্রোণিদেশ দেখা গেলেই ধরে নিই না তিনি অসম্মাননীয়, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে অন্য বিধান।
নারীর মনেও যেন নিজ শরীরের খুঁটিনাটি নিয়ে লজ্জা ঢেলে দেওয়া হয়েছে উপুড়হস্ত। ব্রা-এর দড়িদড়াও যদি বেরিয়ে যায় সেমিজের বাইরে, তবে সহনারী চোখ মটকে মনে করিয়ে দেন, শালীনতার সীমালঙ্ঘন হচ্ছে। পুরুষের খোলা বুক, আঁটো জামা, গেঞ্জি দৃশ্যমান হওয়া— কোনোকিছুই নারীকে পুং যৌনকর্মীর কথা মনে করায় না। কিন্তু নারী খুব সহজেই হয়ে ওঠেন বেশ্যাতুল্য৷ তাঁরা তাঁদের পেশায় নিয়োজিত, তার ভালোমন্দ আলোচ্য নয়। কিন্তু যাঁরা সে পেশায় নিয়োজিত নন, তাঁরা সমাজ-নির্ধারিত যে কোনো সীমানা লঙ্ঘন করলে — জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, চলনে-বলনে-পোশাকে-মতামতে — যে কোনো মুহূর্তে হয়ে তিনি যেতে পারেন ‘বেশ্যা’৷ সেই নারীর সঙ্গে যদি কখনও কোনো যৌন অত্যাচার ঘটে, তবে ভুক্তভোগীর মধ্যেই অত্যাচারের কারণ খোঁজা চলে। অত্যাচারের পর সামান্য সহমর্মিতা পেতে গেলে, তার মানে, মেয়েকে আজীবন ‘ভালো মেয়ে’ সেজে একপায়ে খাড়া থাকতে হবে। উক্ত বিতর্কিত বয়ানেও বলা হয়েছে ‘এরপর ছেলেরা কিছু বললে আমাদের রাগ হবে।’ বা ‘তাদের মধ্যে এমন কিছু থাকতে হবে যাতে ছেলেরা তাদের শ্রদ্ধা করে।’ অর্থাৎ ডিফল্ট সেটিং-টি অশ্রদ্ধার৷ নানাভাবে নারীকে নিজের পোশাক (ও অন্যান্য আচরণ) এমনভাবে ‘কাস্টমাইজ’ করতে হবে, যাতে জোর করে শ্রদ্ধা-টদ্ধা আনা যায়। পরিভাষায় একে একদিকে বলে ‘স্লাট শেমিং’, অন্যদিকে বলে ‘ভিক্টিম ব্লেমিং।’ যুক্তরাষ্ট্রে এক পুলিশকর্মী যৌন নির্যাতনের জন্য একটি মেয়েকে দায়ী করায়, তাকে ‘স্লাট’ বলায়, বিভিন্ন প্রদেশে যে ‘স্লাটওয়াক’ নামক মিছিল হয়েছিল, তার স্মৃতি হয়তো ফিকে হয়নি৷
প্রশ্ন উঠতে পারে, বে-আঁচল নারী নিজেই কি নিজেকে ভোগ্যে পরিণত করতে চাইছেন না? তিনি কেন তা করছেন? হয়তো জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে নিজেকে (যৌনভাবে) আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই করছেন। কিন্তু নিজের যৌনায়ন স্থান-কাল নির্বিশেষে সর্বত্র মন্দ ব্যাপার কি? বিজ্ঞাপনে নারীর যৌনায়ন একটি সামগ্রিক ও ব্যপ্ত বিষয়। কিন্তু পুঁজিবাদের আবির্ভাবের বহু আগে থেকে ব্যক্তিমানুষ সাজসজ্জার সময় নিজেকে আকর্ষণীয় করতে চেয়েছেন৷
যৌনতার সময়, বা যৌন ভাবনার সময়, সকলেই নিজেকে যৌনতার কারক ও যৌনবস্তু উভয় হিসেবে দেখে, সম্ভবত। নারীদের দাবিটা তাহলে পণ্যায়ণ এবং ‘কেবলমাত্র যৌনায়নের’ বিরুদ্ধে। তার অবশ্যই দেহ আছে, তেমনই আছে মনন এবং সত্তাও। নিজ দেহের মতো নিজ যৌনতাতেও প্রথমত তার হক। সে তখনই এক যৌন সত্তা, যখন সে চাইছে। তার সঙ্গেই সে যৌনতায় লিপ্ত হবে, যার সঙ্গে সে চাইছে। তার পোশাক যদি নিজেকে আকর্ষক করে তোলার প্রচেষ্টাও হয়, সচেতনে বা অবচেতনে, তবু সে শ্রদ্ধার পাত্রী হতে পারে, কারণ তার যৌন ইচ্ছা তার একটি মাত্র পরিচয়, একমাত্র পরিচয় না। হয়তো সে বিশেষ বা স্বনির্বাচিত কারও / কারও কারও জন্য নিজেকে সাজিয়েছে। যে কোনো পুরুষের ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুমতি লেখা নেই তার পোশাকে। স্লাট-শেমিং-এর ভাষ্যে ওই ঝাঁপিয়ে পড়ার পথই প্রস্তুত হয়।
নারী, বেশিরভাগ নারীই, আসলে লক্ষ্মী বা ঊর্বশী নন, তাঁরা আছেন এই দুই চরম অবস্থানের মধ্যিখানে। সেটিই স্বাভাবিক। দুয়ের একটি খোপে তাঁদের আঁটানোর চেষ্টার চেয়ে, এই স্বাভাবিকতার স্বীকৃতি বড়ো প্রয়োজন।
(সম্প্রতি বর্ষীয়ান নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী মমতা শঙ্কর (Mamata Shankar Controversy) একটি সাক্ষাৎকারে এখনকার মেয়েদের সাজ বা পোশাক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন — রাস্তার মেয়ে এবং ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ানো মেয়ে জাতীয় বিতর্কিত তকমা। এতে করে কয়েকদিন যাবৎ সামাজিক মাধ্যম উত্তাল হয় এবং সর্বত্র প্রতিবাদ শুরু হয়। উক্ত বয়ানটিকে ভিত্তি করেই কথাশিল্পী, শিক্ষক ও অধিকার আন্দোলন কর্মী শতাব্দী দাশের এই লেখা। মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব।)