এশিয়ার বৃহত্তম বইপাড়ায় নববর্ষের উৎসব, লেখক-প্রকাশক-পাঠকের বৈঠকী আড্ডা

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এ কলেজস্ট্রিটে উঁকিঝুঁকি

‘নববর্ষ’ অর্থাৎ পুরোনো বছরের ক্লান্তি ভুলে আবার আগামী বছর জুড়ে নতুন স্বপ্ন, নতুন কথার খাতা খোলার পালা। বাংলায় নতুন বছর (নববর্ষ ১৪৩৩) আসে বৈশাখে- অগ্নিস্নানে শুদ্ধ হয়ে। পঞ্জিকা, সিঁদুর রাঙা হালখাতার খাতা, দরজায় সাজানো আমপাতার মালা, মিষ্টি আর নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ মিশে থাকে বাঙালির নববর্ষ জুড়ে। তবে বইপ্রেমীদের কাছে বাংলা নববর্ষ নতুন বইয়ের গন্ধ, খাতায় প্রিয় লেখকের স্বাক্ষর আর বইপাড়ার আড্ডা‌ ছাড়া অসম্পূর্ণ। আর তাই বছরের শেষ লগ্ন থেকেই বইপাড়ায় শুরু হয়ে যায় বর্ষবরণের প্রস্তুতি। ব্যস্ততা বাড়ে ছাপাখানায়, সাজো সাজো রব শুরু হয় প্রকাশকদের ঘরে ঘরে। সাবেক আমপোড়ার শরবত হোক বা বোতলের ঠান্ডা পানীয়, মিষ্টির প্যাকেট হোক বা মুখোরোচক নোনতা খাবার সহযোগে লেখক, প্রকাশক আর পাঠকদের ত্রিমুখী আড্ডায় জমজমাট হয়ে ওঠে পয়লা বৈশাখের কলেজ স্ট্রিট। আর এই আড্ডা মিশে গেছে কলকাতা তথা বাংলার ঐতিহ্যে। কোভিড পরবর্তীকালে কতটা অক্ষুণ্ণু আছে সেই ঐতিহ্য, নতুন বইয়ের গন্ধ কতটা মেশে নতুন বছরের উৎসবের গন্ধের সঙ্গে? নববর্ষের প্রাক্কালে কলেজস্ট্রিটের বিভিন্ন প্রজন্মের প্রকাশকদের কাছ থেকে সেই খোঁজই নিল বঙ্গদর্শন.কম।

মুঠোফোনে বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে ই-বুক বা পিডিএফ পড়ছেন অনেকে। তবে বইমেলার দিকে তাকালে দেখা যায় বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমেনি, বরং কোভিড পরবর্তী কালে রেকর্ড সংখ্যক বই বিক্রি হয়েছে বইমেলায়।

মধ্য কলকাতার এই বইপাড়া এশিয়ার বৃহত্তম বইয়ের বাজার। নতুন থেকে পুরোনো সব বইয়ের ঘ্রাণ মাখানো এই অঞ্চলে বারোমাসই যেন বইমেলা। ছাত্রছাত্রী থেকে বইপ্রেমী সবাই পাঠ্যবই বা পছন্দের বই কিনতে সারাবছরই ভিড় জমান এই পাড়ায়। ১৮১৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ অর্থাৎ তৎকালীন হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই রাস্তার নাম হয় কলেজস্ট্রিট। দুই মলাট বন্দি কালো অক্ষরের এই আঁতুড়ঘর নতুন ভাবে সেজে ওঠে নতুন বাংলা বছরে। কলকাতা বইমেলা পূর্ব যুগে পয়লা বৈশাখেই প্রকাশিত হতো নতুন বই। এখন বারো দিনের আন্তর্জাতিক বই পার্বণেই প্রকাশিত হয় বেশিরভাগ বই, তবে বইপাড়ায় নববর্ষও হারায়নি তার ঐতিহ্য। ঐতিহ্য মেনে এখনও প্রকাশিত হচ্ছে নতুন বই, বসছে বৈঠকী আড্ডা।

কোভিড মহামারীর ভয়াবহ বছর পেরিয়ে নতুন করে সচল হয়েছে জীবনযাত্রা। পরিবর্তন এসেছে প্রায় সবক্ষেত্রেই। ডিজিটাল জগতে মানুষ ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, বই পড়ার মাধ্যমেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। মুঠোফোনে বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে ই-বুক বা পিডিএফ পড়ছেন অনেকে। তবে বইমেলার দিকে তাকালে দেখা যায় বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কমেনি, বরং কোভিড পরবর্তী কালে রেকর্ড সংখ্যক বই বিক্রি হয়েছে বইমেলায়। নতুন প্রকাশিত বইয়ের প্রতিও বইপ্রেমীদের আকর্ষণে ভাটা পড়েনি। বইপাড়ার প্রবীণ ও নবীন প্রকাশকরা জানালেন নববর্ষে বইপ্রকাশ এবং বৈঠকী আড্ডায় একুশ শতকের গোড়ায় একটু ভাটা পড়লেও কোভিডের বছরগুলো বাদ দিয়ে শেষ কয়েক বছরে পয়লা বৈশাখে আবার পুরোনো মেজাজে ফিরেছে বইপাড়া। দে’জ প্রকাশনার পক্ষ থেকে অপু দে বঙ্গদর্শন.কম কে জানিয়েছেন, “বইমেলায় বেশি বই প্রকাশিত হলেও নববর্ষেও আমাদের নতুন বই প্রকাশিত হয়। বইমেলায় নতুন প্রকাশিত সব বই পাঠকের সামনে সাজিয়ে রাখার সুবিধা পাওয়া যায়, ফলে পাঠকদেরও সুবিধা হয় বই দেখতে কিন্তু নববর্ষ বা অন্য কোনো সময়ই কলেজস্ট্রিটে এই সুবিধা পাওয়া যায় না, ফলে বইমেলায় বইপ্রকাশ এখন তুলনামূলক বেশি হলেও ঐতিহ্য মেনে নববর্ষেও বই প্রকাশিত হয়।” প্রসঙ্গত আরও জানালেন, ২০২১ সালে কোভিডের জন্য যখন বইমেলা হয়নি সে বছরেও নববর্ষের অনুষ্ঠান হয়েছিল। এবং সেই বছরই প্রকাশিত হয়েছিল তরুণ মজুমদারের ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ বইটি।

কলেজস্ট্রিটে পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গের প্রথম থিম্যাটিক বুক ক্যাফে তথা প্রকাশনা সংস্থা অভিযান-এর কর্ণধার মারুফ হোসেন জানাচ্ছেন, “কলেজস্ট্রিটে বাংলা নববর্ষের উৎসব-এর ঐতিহ্য বহু পুরোনো, তবে কলকাতা বইমেলা শুরু হওয়ার পর থেকে বইমেলায় অনেক বেশি পরিমাণে বই প্রকাশিত হতে থাকে এবং মাঝে কিছু বছর পয়লা বৈশাখে বই প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তবে করোনার বছরগুলো বাদ দিয়ে ২০১৭-১৮ থেকে নববর্ষে বইপ্রকাশের রেওয়াজ আবার ফিরে এসেছে। এখন অনেক তরুণ কলেজস্ট্রিটে ছোটো ছোটো প্রকাশনা সংস্থা শুরু করেছে। তারাও চাইছে নববর্ষের উৎসব ফিরে আসুক, নতুন বই প্রকাশিত হোক, বিক্রি হোক। তাই বইমেলা পূর্ব যুগের মতো না হলেও বইপাড়ায় নববর্ষের উৎসব আবার ফিরছে।”

এখন অনেক তরুণ কলেজস্ট্রিটে ছোটো ছোটো প্রকাশনা সংস্থা শুরু করেছে। তারাও চাইছে নববর্ষের উৎসব ফিরে আসুক, নতুন বই প্রকাশিত হোক, বিক্রি হোক।

প্রায় একই সুর শোনা গেল পত্রভারতীর প্রকাশক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “আগে শুধুমাত্র নববর্ষেই বইপাড়া জেগে উঠতো। এখন বইমেলা আসার পর সেটা ভাগ হয়ে গেছে। বইমেলায় অপ্রকাশিত কিছু বই এবং কিছু নতুন বই, যেগুলো নববর্ষের জন্যই তোলা থাকে সেগুলো প্রকাশিত হয়। নববর্ষের দিনে বইয়ে বিশেষ ছাড়ও দেওয়া হয়। নববর্ষের আলাদা মাধুর্য। বইমেলায় পাঠকরা লেখকের সঙ্গে সেলফি তুলতে পারেন বা নতুন কেনা বইতে তাঁর সই নিতে পারেন কিন্তু আমপোড়া শরবত বা কোল্ডড্রিংক, সঙ্গে মুখোরোচক কিছু খাবার খেয়ে লেখক, প্রকাশকদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার আনন্দ বইমেলায় মেলে না। একুশ শতকের প্রথম ভাগে এই উৎসবের জৌলুস অনেকটা ম্লান হয়ে গেলেও ক্রমে ক্রমে আবার তা ফিরে আসছে।”

 

 

 

ধানসিড়ি-র প্রকাশক শুভ বন্দোপাধ্যায় জানান, “করোনার সময় সারা বইপাড়া ভীষণভাবে নববর্ষের অনুষ্ঠান মিস করেছে। কিন্তু তারপর স্বমহিমায় আবার সেই উৎসব ফিরেছে। অনেক প্রকাশনা থেকে পয়লা বৈশাখে নতুন বই প্রকাশিত হয়, পাঠকরাও কেনেন। সবমিলিয়ে নববর্ষে উৎসবের রেশ থাকে বইপাড়া জুড়ে।”

কথায় বলে, বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সেই বন্ধুত্বের টানেই শীতের বিকেলে বারোদিন গায়ে ধুলো মাখে কলকাতা, সেই বন্ধুত্বই বছরের প্রথম দিনে গ্রীষ্মের দুপুরে বইপাড়াকে করে তোলে উৎসবমুখর। নতুন বইয়ের গন্ধ মেখে কলেজস্ট্রিটের পয়লা বৈশাখ শুভ হয়ে ওঠে লেখক পাঠক‌ আর প্রকাশকদের ত্রিবেণী সঙ্গমে। যে সঙ্গমের জলে সাময়িক ভাঁটা এলেও আবার নতুন করে এসেছে জোয়ার। যে জোয়ার ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে চলেছে আগামীর দিকে।
 

Post Tags
Developed by DXDasia