প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন বিভূতিভূষণের পৌত্র তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়
দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে যেন এক টুকরো নিশ্চিন্দিপুর উঠে এসেছে। ২৯ অগাস্ট থেকে অরণ্যবাড়িতে শুরু হয়েছে- আরণ্যক, এক প্রদর্শনী। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী যা চলার কথা ইংরেজি মতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন অর্থাৎ, ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। যদিও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়ায় সময়ের আগেই প্রদর্শনীর দরজা হয়তো বন্ধ করতে হবে আয়োজকদের। কারণ, বিভূতিভূষণের জীবন, চিন্তা, সাহিত্য, সৃষ্টি ও সৌন্দর্যবোধে অনুপ্রাণিত যে সব সামগ্রীর সম্ভারে প্রদর্শনী সেজে উঠেছিল, তার অধিকাংশই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে। প্রদর্শনীতে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষ ভালোবেসে সে সব সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছেন।

আরণ্যক-এ পাওয়া যাচ্ছে, পথের পাঁচালী-র অপুর পরিবারের টি-শার্ট, পুতুল, ফ্রিজ ম্যাগনেট, নোটবুক, তারানাথ তান্ত্রিক, ইছামতী, চাঁদের পাহাড়, আরণ্যকের টি-শার্ট, ফটোফ্রেম, লাগেজ ট্যাগ, কুরুশ কাজের তিতপল্লা, সোঁদালি ফুলের টেবিল ঢাকা ইত্যাদি। যার অধিকাংশই নিঃশেষিত।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক উজ্জ্বল নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখায় উঠে আসে মানুষের কথা, সম্পর্কের কথা, সারল্যের কথা, শিকড়ের কথা, পল্লিবাংলার কথা, গ্রামের মেঠো পথের কথা। ‘আরণ্যক’ যেন এসবেরই প্রতিচ্ছবি। কেবল একটি প্রদর্শনী পরিচয়ে একে আটকে রাখা যায় না। বিভূতিভূষণের জীবন এবং সাহিত্য-অনুপ্রাণিত দৈনন্দিন সামগ্রীর এই প্রদর্শনীর প্রতিটি জিনিস অতি যত্নে তৈরি হয়েছে, যে যত্ন বিভূতিভূষণের লেখায় রয়েছে, ঠিক সেই যত্ন। সে শান্তি বিভূতিভূষণ পাঠ করলে মেলে, অরণ্যবাড়ি ক্যাফের নরম আলোয় প্রদর্শনী কক্ষে পা দিলেও সে শান্তি মিলছে। প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি বিভূতিভূষণের পৌত্র।
আরণ্যক-এ পাওয়া যাচ্ছে, পথের পাঁচালী-র অপুর পরিবারের টি-শার্ট, পুতুল, ফ্রিজ ম্যাগনেট, নোটবুক, তারানাথ তান্ত্রিক, ইছামতী, চাঁদের পাহাড়, আরণ্যকের টি-শার্ট, ফটোফ্রেম, লাগেজ ট্যাগ, কুরুশ কাজের তিতপল্লা, সোঁদালি ফুলের টেবিল ঢাকা ইত্যাদি। তবে পাওয়া যাচ্ছে না-বলে অতীতকালে পাওয়া যাচ্ছিল বলাই শ্রেয়। অধিকাংশ জিনিসই শেষ হয়ে গিয়েছে। প্রদর্শনীর একটি দেওয়াল সেজে উঠেছে বিভূতিভূষণকে নিয়ে। তাঁর কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছবি, চিঠিপত্র, হিসেবের খাতার ছবি, পথের পাঁচালী উপন্যাসের খসড়ার একটি পাতার ফ্যাকসিমিলি কপি, চাঁদের পাহাড়ের সম্ভাব্য খসড়ার ফ্যাকসিমিলি কপি ইত্যাদি শোভা পাচ্ছে দেওয়ালে, যা প্রদর্শনীকে অন্যমাত্রা যোগ করেছে। বিভূতিভূষণপ্রেমীদের জন্য এটা উপরি পাওনা।

বনগ্রাম-গোপালনগরের কাছে বারাকপুরে রয়েছে বিভূতিভূষণের বসতবাড়ি। বিভূতিভূষণের সেই গ্রামই আদপে পথের পাঁচালী-র গ্রাম। অনেকে সেখানে যান, পছন্দের সাহিত্যস্রষ্টার বাড়ি ঘুরে দেখেন। পর্যটক, দর্শক, বিভূতিভূষণপ্রেমীদের এবং বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের চাহিদা থেকেই এহেন প্রদর্শনী আয়োজনের ভাবনার জন্ম।
তৃণাঙ্কুর জানাচ্ছিলেন, মানুষ রীতিমতো কাড়াকাড়ি করে জিনিস নিয়ে যাচ্ছেন। তারকা থেকে আম জনতা সকলেই সংগ্রহ করেছেন। জিনিস প্রায় নিঃশেষিত। কিছু জিনিস, যেগুলো বহু সংখ্যায় তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলো কিছু রয়েছে। বিভূতিভূষণের নামাঙ্কিত স্মারক জিনিসগুলো তৈরির ক্ষেত্রে গুণমানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রায় মাস সাতেক ধরে এসব তৈরি হয়েছে। জিনিসগুলোর উন্নত গুণমান প্রশংসিতও হয়েছে। মানুষ পছন্দ করছেন। সংগ্রহ করছেন।

বনগ্রাম-গোপালনগরের কাছে বারাকপুরে রয়েছে বিভূতিভূষণের বসতবাড়ি। বিভূতিভূষণের সেই গ্রামই আদপে পথের পাঁচালী-র গ্রাম। অনেকে সেখানে যান, পছন্দের সাহিত্যস্রষ্টার বাড়ি ঘুরে দেখেন। লেখকের কোনও স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ করে ফিরতে চান তাঁরা। পর্যটক, দর্শক, বিভূতিভূষণপ্রেমীদের এবং বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের চাহিদা থেকেই এহেন প্রদর্শনী আয়োজনের ভাবনার জন্ম। এমন প্রদর্শনী আয়োজন করার ভাবনার জন্মকথা সম্পর্কে আয়োজক তথা বিভূতিভূষণের উত্তরপুরুষ তৃণাঙ্কুর বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, ‘‘বনগ্রামের বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর অনতিদূরে তিনের দশকে বিভূতিভূষণ বাড়ি কিনেছিলেন। সেটাই তাঁর বসতবাড়ি। সেখানে মানুষ ক্রমাগত যান। বেড়াতে যান। কলকাতার মানুষ যান। আমি খবর পাই। ছবি, ভিডিও পাই। উইকএন্ডে প্রচুর মানুষ যান। বাবার অসুস্থতা-সহ নানা কারণে বাড়িটি অনেক দিন ভালো করে সংরক্ষণ করা হয়নি। প্যান্ডেমিকের পর আমিই বাড়িটি খোলার ব্যবস্থা করি। অনেক সময় এমন হচ্ছে, মানুষ আসছেন খোলা না-পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বাড়িটি আমাদের, ফলে দায়িত্বও আমাদের। আমার ইচ্ছে ছিল জায়গাটা সংরক্ষণ করা। একটা সংগ্রহশালা গড়া। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই করছিলাম, কিন্তু একটা পর্যায়ে পৌঁছতে গেলে আরও টাকা দরকার। ভেবেছিলাম, কারও অনুদানে নয়। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যদি টাকা সংগ্রহ করা যায়।’’
তিনি আরও বললেন, ‘‘দেখেছি, যাঁরা বাড়িতে আসেন তাঁরা কোনও স্মারক বা ‘মেমোরেব্লিয়া’ সংগ্রহ করতে চান। সেই থেকেই ভাবনাটা আসে। যদি স্মারকের একটা সিরিজ বানাই, যা মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংগ্রহ করবেন। এর মধ্যে দিয়ে যে লাভটা হবে, তার কিছুটা ব্যয় হবে বাড়িটার সংরক্ষণের কাজে, রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। এই ভাবনা থেকে ইচ্ছে হল। আরও একটা কারণ রয়েছে, বাংলার সংস্কৃতির প্রতি একটা ভালোবাসা আছে। আজকাল মানুষ বাংলা থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মনে করা হয়, বাংলা ভাষার কী ভবিষ্যৎ আছে। মানুষের হৃদয়ে প্রবেশের একটা উপায় হল পণ্য তৈরি করা। ছোটোখাটো জিনিস অনেকেই সংগ্রহ করেন। একটা পুতুল দেখলে হয়তো পথের পাঁচালীর পরিবারের কথা তাঁদের মনে পড়ে। এগুলোর মধ্যে দিয়ে তাঁরা যদি ফেরেন, তাহলে আমার মনে হবে বড়ো একটা পাওয়া হল। বিভূতিভূষণ-কেন্দ্রিক হলেও পরে আঞ্চলিক কিছু করার, দীনবন্ধু মিত্র ওই অঞ্চলের মানুষ, বাঙালির কোনও ‘কালচারাল আইকন’-কে নিয়ে কিছু করার ইচ্ছে রয়েছে। বাংলা, বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি যদি আবার আগ্রহ তৈরি করা যায়। সেটাও একটা পাওয়া হবে।’’

বাঙালির দুর্নাম রয়েছে আত্মবিস্মৃত জাতি হিসেবে। সে জাতির একজন, পূর্বপুরুষের স্মৃতিমাখা স্মারক বানিয়ে হালআমলের মানুষদের মধ্যে বাঙালি সত্তার পুনর্জাগরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সাহিত্যের টানে, বিভূতিভূষণের টানে মানুষ আরণ্যক-এ ভিড় জমাচ্ছেন, স্মৃতি স্মারক সংগ্রহ করছেন। এ যেন এক নতুন শুরু। এভাবেই না-হয় সাহিত্যের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি, সর্বপরি শিকড়ের প্রতি বাঙালির টান বাড়ুক।