দেবতার জায়গায় বিগ বি-র বিগ্রহ, কলকাতায় ঘটা করে পূজিত হচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন

২০০১ সালে বচ্চন ধাম নির্মাণ করেছেন সন্দীপ পতৌদিয়া

ভারতবর্ষের কাছে ক্রিকেট এবং সিনেমা ধর্মের সমান। আর যদি সিনেমা ধর্ম হয়, তাহলে ভগবান অমিতাভ বচ্চন। অন্তত কিছু ভক্তদের কাছে অমিতাভ বচ্চন তো ভগবানেরই মতো। গত ৫০ বছর ধরে বলিউডে অনেক কিছু পাল্টেছে, তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছে বিগবি-র নাম। আজও ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ বলতে কাহিল দর্শককূল। প্রতিদিন অমিতাভ বচ্চনের মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করেন কয়েক লক্ষ মানুষ। তবে বাংলা এবং অমিতাভ বচ্চনের সম্পর্ক কোথাও গিয়ে একটু বিশেষ। সবাই জানেন অমিতাভ বচ্চন বাংলার জামাইবাবু। তবে খুব কম মানুষই জানেন নিজের কর্ম জীবনের শুরু বাংলা থেকেই করেছিলেন অমিতাভ। অভিনয় জীবন শুরু করার আগে কলকাতায় বার্ড কোম্পানির সেলস এক্সিকিউটিভের চাকরি করেছেন অমিতাভ। অমিতাভ নিজেও স্বীকার করেন বাঙালি ভক্তরা তাঁকে যেমন ভালোবাসেন, তেমন ভালোবাসা অন্য কোথাও তিনি খুঁজে পান না। এমনকি ২০২২ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছিল অমিতাভ বচ্চন রেট্রোস্পেকটিভ

আরব সাগরের তীরে মুম্বাইয়ের জলসা বাংলোতে পরিবার নিয়ে থাকেন অমিতাভ। সেখান থেকে বেরিয়ে মাঝেমধ্যেই ভক্তদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন তিনি। তবে জানলে অবাক হবেন মুম্বাই থেকে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরে, আমাদের কলকাতা শহরেই রয়েছে অমিতাভের আরেক আস্তানা। কোনো সাধারণ ফ্ল্যাট বা বাড়ি নয়,  অমিতাভ বচ্চনের এমন এক আস্তানার কথা বলা হচ্ছে যেখানে তাঁকে পুজো করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা রোজ ছুটে আসেন তাঁদের দেবতাকে পুজো করতে। অনেকে কলকাতা ঘুরতে এলে ঢুঁ মেরে যান এই অভিনব জায়গায়।

কথা হচ্ছে বচ্চন ধামের। এই বচ্চন ধাম আসলে অমিতাভ বচ্চনের মন্দির। এখানে দেবতার বিগ্রহের জায়গায় বসানো রয়েছে অমিতাভ বচ্চনের বিগ্রহ। তাকেই প্রতিদিন নিয়মিত পুজো করা হয় এবং বিশেষ দিনে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে হয় পুজো। অমিতাভ বচ্চনের এই মন্দিরটি রয়েছে কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায়। বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে নেমে ৫-৭ মিনিট পায়ে হাঁটা দূরত্ব। এখানে যখন খুশি যে কেউ অমিতাভের দর্শনের জন্য আসতে পারেন। অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিনে তাঁকে এক ঝলক দেখতে পাওয়ার আশায় জলসার সামনে হাজির হন শয়ে শয়ে ভক্ত। তবে এটা কলকাতা বলেই হয়তো ভালোবাসার মাত্রা এতটা বেশি। যদি আপনিও বিগ বি-র ফ্যান হয়ে থাকেন এবং বালিগঞ্জ বা তার আশেপাশের অঞ্চলে যান, তাহলে অবশ্যই ঘুরে আসতে পারেন বচ্চন ধাম থেকে।

বচ্চন ধাম আসলে অমিতাভ বচ্চনের মন্দির। এখানে দেবতার বিগ্রহের জায়গায় বসানো রয়েছে অমিতাভ বচ্চনের বিগ্রহ। তাকেই প্রতিদিন নিয়মিত পুজো করা হয় এবং বিশেষ দিনে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে হয় পুজো।

কলকাতার বালিগঞ্জে অমিতাভ বচ্চনের মন্দির-এ যদি যান, তাহলে আপনার দেখা হয়ে যেতেই পারে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। অমিতাভ বচ্চনের মতোই উচ্চতা তাঁর। দুই হাতেরই ঊর্দ্ধবাহু থেকে কব্জি পর্যন্ত অমিতাভ বচ্চনের ট্যাটুতে ঢেকে রয়েছে। নাম সন্দীপ পতৌদিয়া। ইনিই এই মন্দিরের বর্তমান কর্তা এবং মন্দিরের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন। আক্ষরিক অর্থে ‘জবড়া ফ্যান’। সন্দীপবাবু bongodorshon.com-কে বলেন, “যদি আমার কাছে সুযোগ থাকত নিজের নাম পাল্টে অমিতাভ করে দিতাম। আমার দুই ছেলে আছে, তাদের নাম অভিষেক এবং অগস্ত্য। ইচ্ছে ছিল মেয়ে হলে শ্বেতা নাম দেব।” সন্দীপবাবু জানান, অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিনে এখানে বেশ ধুমধাম করে অনুষ্ঠান পালিত হয়। অমিতাভ বচ্চনের মূর্তির সামনে কেক কেটে, মূর্তিকে নতুন জামা পরিয়ে জন্মদিনের সেলিব্রেশন হয়। অবশ্য শুধু অমিতাভের জন্মদিনই নয়, জয়া বচ্চন কিংবা অভিষেক বচ্চন অথবা বচ্চন পরিবারের কোনো বড়ো অনুষ্ঠান বা যেকোনো উৎসবেই পুজো হয় এই মন্দিরে।

 

বালিগঞ্জের এক ফ্ল্যাটের গ্রাউন্ড ফ্লোরে মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল ২০০১ সালে। তবে ভগবানের সিংহাসন ছিল ফাঁকা। খানিকটা শ্রী রামের পাদুকার মতোই অমিতাভ বচ্চনের পাদুকা বা জুতোর পুজো করা হত। তবে ২০১৭ সালের ১২ মে সেই খালি সিংহাসনে বসে অমিতাভ বচ্চনের মূর্তি। এই মন্দিরটি তৈরি এবং মূর্তি স্থাপনের মূল উদ্যোক্তা হল অল বেঙ্গল অমিতাভ বচ্চন ফ্যানস অ্যাসোসিয়েশন (All Bengal Amitabh Bachchan Fans’ Association) এবং কর্ণধার সন্দীপ পতৌদিয়া। ২০১৭ সালের ১২ মে দেশজুড়ে মুক্তি পায় বিগ বি অভিনীত ‘সরকার থ্রি’। রামগোপাল বর্মার ‘সরকার’ অমিতাভ বচ্চনের কেরিয়ারে অন্যতম আইকনিক চরিত্র। তাই সেদিনই এই মন্দিরে ফাইবার গ্লাস নির্মিত ‘সরকার’-এর মূর্তি স্থাপন করা হয়। সেই উপলক্ষে মুম্বই থেকে কলকাতায় এসেছিলেন কয়েকশো অমিতাভ অনুরাগী। সন্দীপবাবু জানান মূর্তিটির ওজন মাত্র ২৫ কেজি। ‘অক্স’ (Aks) ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে যে সিংহাসনে বসতে দেখা গিয়েছিল সেই সিংহাসনের আদলেই তৈরি এই মন্দিরের সিংহাসনটি যা মন্দিরের শোভা বাড়াচ্ছে। জানা যায়, এই সিংহাসনটি মন্দির কর্তৃপক্ষকে উপহার দিয়েছিলেন খোদ বিগ বি নিজেই। সাদা চামড়ার জুতোও তাই। দিনে দুবার আরতি হয় মন্দিরে। তারপর হয় প্রসাদ বিতরণ।

এই মন্দির তৈরির কথা কীভাবে মাথায় আসে? এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সন্দীপ পাতৌদিয়া বলেন, “আমি শুধুমাত্র অমিতাভজির ফ্যান নই, ওঁর একজন ভক্ত। আমরা যাঁকে অনুসরণ করি তাঁরাই আমাদের ঈশ্বর হয়ে যান। ছোটো থেকে অমিতাভ বচ্চনজিকে দেখে অনেক কিছু শিখেছি। জীবনে কীভাবে চলতে হয়, সময়ানুবর্তিতা, মানুষের সঙ্গে কীভাবে মিশতে হয়- সবই ওঁকে দেখে আমি শিখেছি। যাঁর কাছ থেকে আপনি কিছু শেখেন, তিনিই আপনার ঈশ্বর। যেমন মা-বাবা বা শিক্ষক ভগবানের সমতুল্য, আমার কাছে অমিতাভ বচ্চনও তাই। ২০০১ সালে আমরা বানাই মন্দিরটি। প্রথমে বচ্চন সাহেবের পাদুকা রাখা হয়েছিল। এই জুতো তিনি অগ্নিপথ সিনেমায় পরেছিলেন। আমরা প্রতিবছর ওঁর জন্মদিনে দেখা করতে মুম্বাই যাই। তখনই ওঁর থেকে পাদুকা চেয়ে এনেছিলাম। পরে ২০১৭ সালে এই ছয় ফুট দুই ইঞ্চি উচ্চতার ফাইবার গ্লাসের মূর্তিটা বসানো হয়।”

কলকাতার বালিগঞ্জে অমিতাভ বচ্চনের মন্দির-এ যদি যান, তাহলে আপনার দেখা হয়ে যেতেই পারে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। অমিতাভ বচ্চনের মতোই উচ্চতা তাঁর। দুই হাতেরই ঊর্দ্ধবাহু থেকে কব্জি পর্যন্ত অমিতাভ বচ্চনের ট্যাটুতে ঢেকে রয়েছে। নাম সন্দীপ পতৌদিয়া।

এখানে কীভাবে পূজিত হন বিগ বি? সন্দীপবাবু জানান, “এখানে প্রতিদিন আরতি হয়। এছাড়াও বিশেষ মন্ত্র আছে। তবে সাধারণ পুজোর জন্য আমাদের একটাই মন্ত্র, ‘জয় শ্রী অমিতাভ’। এই মন্ত্র পাঠ করেই পুজো হয় এখানে।” মন্ত্রটি শুনে বুঝতেই পারছেন দেবতার নামের জায়গায় অমিতাভ বচ্চনের নাম বসানো। আক্ষরিক অর্থেই এখানে ওঁকে ভগবান রূপে পুজো করা হয়। তাই ঢুকতেই আপনার চোখে পরবে যে, দেওয়ালে লেখা রয়েছে- ‘Thank you God for being among us as an actor’।

অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিনে পুজোর পাশাপাশি রক্তদান শিবির কিংবা বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠানও আয়োজন করেন সন্দীপ পাতৌদিয়া এবং তাঁর সংস্থা। গতবছর অমিতাভ বচ্চনের ৮০তম জন্মদিনে ৮০ জন দুঃস্থ বাচ্চাকে পাত পেড়ে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। তবে শুধু জন্মদিন নয়, অমিতাভের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতেও এখানে উৎসবের আয়োজন হয়। অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন যেভাবে পালন করা হয়, সেভাবে পালিত হয় আরও একটি দিন। ‘অমিতাভ বচ্চনের দ্বিতীয় জন্মদিন’ অর্থাৎ ২ অগাস্ট। এই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সন্দীপবাবু বলেন, “কুলির শুটিংয়ের সময় আহত হয়ে অমিতাভ যখন কোমায় চলে যান, আমরা খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। মনে হচ্ছিল নিজের কেউ হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ২ অগাস্ট তিনি কোমা থেকে বেরোন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে এই দিনটি আমাদের কাছে অমিতাভ বচ্চনের দ্বিতীয় জন্মদিন। প্রতিবছর এই দিনে আমরা রক্তদান শিবির করে থাকি।” এছাড়াও প্রত্যেক শীতে অমিতাভ বচ্চনের নামে এখানে দুঃস্থদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিলি করার বন্দোবস্ত করা হয় বলে সন্দীপবাবু জানান। কখনও আবার বিনামূল্যে সিনেমা দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয় শিশুদের। বচ্চন ধাম খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত, রোববার বন্ধ। এই মন্দির এবং এর কর্মকাণ্ডের কথা নিজের আত্মজীবনী, ‘ম্যায় অমিতাভ বচ্চন বল রাহা হু’ (Main Amitabh Bacchan Bol Raha Hu)-তে উল্লেখ করেছেন বিগ বি। পাঠক মাথায় রাখবেন এখানে ঢুকতে গেলে কিন্তু মন্দিরের মতোই জুতো খুলে প্রবেশ করতে হবে। মন্দিরে ঢুকলেই দেখা যাবে সিংহাসনে বসে রয়েছেন বলিউডের শাহেনশাহ্।

_____

ঠিকানা: ১০এ, শ্রীধর রায় রোড, কলকাতা ৭০০০৩৯ (বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে)। ছবি: অল বেঙ্গল অমিতাভ বচ্চন ফ্যানস অ্যাসোসিয়েশন।

Post Tags
Developed by DXDasia