বাংলার মানুষকে তিনি জয় করেছিলেন প্রভাতী আর ভাটিয়ালি দিয়ে
কঠোর সত্যি কথা দিয়ে গান বাঁধার অপরাধে চরণদাসকে মুখ-হাত-পা বেঁধে বনের মধ্যে গর্তে ফেলে দিয়েছিল হীরক রাজার পেয়াদারা। ভয়াবহ শাস্তি হবে জেনেও গান থামাননি চরণদাস। স্বৈরাচারী রাজার দরবারে গিয়ে শাসককে সেই গান শোনানোর সাহস দেখিয়েছিলেন। যে চরণদাসের গলার স্বর অত্যাচারী হীরক রাজা থামিয়ে দিতে পারেননি, তা শেষ পর্যন্ত হার মানল সময়ের কাছে। ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে যিনি চরণদাসের বিখ্যাত “কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়…” গানটি গেয়েছিলেন, সেই প্রবাদপ্রতীম লোকশিল্পী অমর পালের কণ্ঠ থেমে গেল চিরদিনের মতো। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এসএসকেএম হাসপাতালের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। আগামী ১৯ মে তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনের ঠিক একমাস আগে তিনি অমর্ত্যলোকে যাত্রা করলেন।
অমর পালই প্রথম লোকশিল্পী হিসেবে আকাশবাণীতে গান গেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে তাঁর গান প্রথম সম্প্রচারিত হয় রেডিওতে। অবশ্য ছোট্ট বয়স থেকেই তিনি গানের চর্চা করতেন। ১৯২২ সালের বর্তমান বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবেড়িয়ায় তাঁর জন্ম। ছোটোবেলা থেকেই মা দুর্গাসুন্দরীর থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিতেন। পাশাপাশি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের ছোট ভাই আয়েত আলি খানের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন ৮ বছর ধরে। ১০ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তাঁকে সংসারের দায়িত্ব মাথায় তুলে নিতে হয়। দেশভাগের পরে ১৯৪৮ সালে আকাশবাণীর গীতিকার শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে চলে আসেন কলকাতায়। এখানে বেঙ্গল মিউজিক কলেজের অধ্যাপক মণি চক্রবর্তী, সুরেন চক্রবর্তী, ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে লোকসংগীতের তালিম নিতে থাকেন। তারপর আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে প্রথম গান এবং ধীরে ধীরে আকাশবাণীর গ্রেডের শিল্পীর সম্মান লাভ।
আরও পড়ুন
‘পাল উড়াইয়া’ দিয়েছিলেন যে মানুষটি
এভাবেই কিংবদন্তী শিল্পী হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়। অনেক রেকর্ডে গান গেয়ে, অনেক সিনেমায় প্লেব্যাক করে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছেন অমর পাল। প্রচুর গান গেয়েছেন রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। সত্যজিৎ রায় তো বটেই, দেবকীকুমার বসু থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণ ঘোষ পর্যন্ত একাধিক প্রজন্মের গুণী চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। তাঁর গান রয়েছে ‘সাগরসঙ্গমে’, ‘বাবা তারকনাথ’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘শিউলিবাড়ি’র মতো সিনেমায়। যদিও বিভিন্ন স্বাদের গান আমরা তার কণ্ঠ থেকে উপহার পেয়েছি, তবে, সারা বাংলাকে তিনি জয় করেছিলেন প্রভাতী আর ভাটিয়ালিতে। তাঁর গাওয়া “প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে”, “রাই জাগো রাই জাগো”-র মতো বহু গান আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে 'সঙ্গীত মহাসম্মান'-এ ভূষিত করেছেন। লালন পুরস্কারও তিনি লাভ করেছেন রাজ্য সরকারের থেকে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সাম্মানিক ডিলিট উপাধি। সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার সহ পেয়েছেন দেশ ও বিদেশের আরও অনেক সম্মাননা।