দ্য স্কাল্পটেড শি : ভাস্কর্যে বিশ্বজোড়া ভাবনা, প্রয়োগ ও দর্শন
নব্বই দশক থেকে আমি সেই ছিপছিপে অলকাকে চিনতাম। ভাস্কর মীরা মুখার্জির সুবাদে। তখন তরুণ শিল্পী সন্দীপন (ভট্টাচার্য) প্রায় আমার ডেরায় আসতো। নানা রকম কাজ করতো ও। হয়তো ওর পাশেই অলকাকে দেখতাম। তবে তখন ওর কাজ তেমন দেখিনি। তারপর বহুদিন ওদের সঙ্গে আর দেখা হতো না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছিল। মীরাদিও চলে গেলেন। তার বহু বহু বছর পর আবার ভেসে উঠতে দেখলাম, এক অসাধারণ ভাস্করকে। চমকে ওঠার মতোই ভেসে ওঠা। আকাদেমিতে দেখলাম অলকানন্দার অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে। দু’দিন গেলাম এবং আমার স্বভাব মতো বেশ কিছু ছবি আঁকলাম। ভাস্কর্যের রেখাচিত্র করা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বিদেশে বহু কাজ করেছি। নানা প্রদর্শনীতে আলোকচিত্র তোলার নিষেধ থাকলেও, আঁকার ওপর কোথাও কোনও নিষেধ ছিল না। সেই অভ্যাস এখানেও জারি রইলো।
মোর্নিং – এই কাজটিতে মায়ের মুখের আদল আছে, কোনো খুঁটিনাটি নেই শুধুমাত্র দুটো অস্ফুট ঠোঁট ছাড়া। সে ভাষা হারিয়েছে। তার চোখ নেই, নাক নেই, সমস্তটা একটা শূন্যতা। মায়ের কোল যেমন খালি হয়েছে তেমনি তাঁর মুখ, পাঁশুটে। এমন ভাষাহীন ভাষা নির্মাণ আমাকে বিচলিত করেছে। একে আমি এঁকেও রেখেছি।

এই বঙ্গে লিঙ্গ বিভাজন, একটা করুণ বিষয়। আমাদের শিল্প শিক্ষায়তনে (গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট, GCAC), ভাস্কর্য বিভাগে কাবেরী নামে এক মেয়ে ছিল। আজ প্রয়াত। তাঁকে ভাস্কর চিন্তামণি কর খুবই তিরস্কার করতেন, নানা কথা বলে। এটা ওঁর স্বভাব ছিল। একবার ভাস্কর মীরা মুখার্জিকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠেন, ‘উনি তো পুতুল খেলেন’। আমি নিশ্চিত, অলকানন্দাকে নিয়ে একই উক্তি করতেন। কারণ খুবই পরিষ্কার। আসলে কর মশাই, অবন ঠাকুরের বেঙ্গল স্কুলের ছাত্র হয়েও, বিদেশে যাবার প্রভাবে, হেনরি মুরের প্রভাবে, বেশ গোঁড়া মানসিকতার মানুষ হয়ে ওঠেন। এই প্রসঙ্গ আমি আনলাম, কারণ অলকানন্দাকে বুঝতে গেলে, ভাস্কর্যের বিশ্বজোড়া ভাবনা, প্রয়োগ, দর্শনকে বুঝতে হবে। এর সীমাবদ্ধতাকেও বুঝতে হবে। এই ভাস্কর্যগুলি পোড়ামাটির কাজ, তাঁর ওপর রঙের প্রলেপ, একটি ত্রিমাত্রা, আরেকটি দ্বিমাত্রা এবং এই রং আরও একটা বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
দ্য বেঙ্গল স্টোর (The Bengal Store) অলকানন্দার যে প্রদর্শনীটি (দ্য স্কাল্পটেড শি/ The Sculpted She) করছে, তা মূলত নারীকেন্দ্রিক। মেয়েদের ব্যথা, বেদনা, ভালোবাসা, একান্তে অন্যমনস্ক থাকা, যেন একটা নিভৃত জগৎ, বড়োই মুগ্ধ করে, বিচলিত করে, বিস্মিত করে। এমন নয় এই জগতের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। কিন্তু এই কাজগুলো শিল্পের ভুবনকে শুধু উর্বর করে না, বিস্তৃতিও দেয়। দিগন্ত অনেক দূর, তার সীমানা ছাড়ার।

প্রথাগত ভাস্কর্যের আড় ভাঙে। চিত্র-দৃশ্য যেমন দ্বিমাত্রিক, এ তেমনি মিশ্রণে ত্রিমাত্রিক। একে নারীর নিজস্ব জগৎ বলে চিহ্নিত করলে অন্যায় হবে। নারী থেকেই পুরুষের জন্ম। আমাদের মধ্যে একটা নারীও বাস করে। সে মা, প্রেমিকা বা কত বিচিত্র রূপে আমাদের আশ্রয় দেয়। এই নারী-আশ্রয় একটা বিশেষ অবস্থান। নারী অবশ্যই আমাদের আকর্ষিত করে, কিন্তু তাঁর আকর্ষণ শুধু যৌনতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমি চিত্রশিল্পী হিসেবে এই নারী-আশ্রয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিই।
আমার জানা নেই এই সময়ে অলকানন্দার সমকক্ষ ভাস্কর কেউ আছেন কিনা। শিল্পের দক্ষতাকে ছাড়িয়ে, ওর মনন, দর্শন ও তার প্রয়োগ, চর্চা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একটি কাজ, মোর্নিং – Mourning (2025)। আশ্চর্য এই কাজটিতে মায়ের মুখের আদল আছে, কোনো খুঁটিনাটি নেই শুধুমাত্র দুটো অস্ফুট ঠোঁট ছাড়া। সে ভাষা হারিয়েছে। তার চোখ নেই, নাক নেই, সমস্তটা একটা শূন্যতা। মায়ের কোল যেমন খালি হয়েছে তেমনি তাঁর মুখ, পাঁশুটে। এমন ভাষাহীন ভাষা নির্মাণ আমাকে বিচলিত করেছে। একে আমি এঁকেও রেখেছি। বহু সময় অনেক কথা না বলেও, না খোদাই করেও বলে দেওয়া যায়। এই মায়ের পোশাক দেখে আমরা অনুমান করছি, তিনি গাজার অধিবাসী। যেভাবে প্যালেস্তাইনের উপর ইজরায়েল হানা দিয়ে নারী ও শিশু হত্যা করেছে তার প্রতীক যেন এই ভয়ংকর ভাস্কর্য।

আকাদেমির পর দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর এই প্রদর্শনী কলকাতার শিল্পী মহলে আলোড়ন তুলছে, আনন্দও দিচ্ছে তার অসাধারণ উপস্থাপনা। ১৪টা টেরাকোটা ভাস্কর্যের পাশাপাশি অলকানন্দার বেশ কিছু কালি-কলম-তুলির কাজ রাখা আছে, সেগুলোও বিশিষ্ট।
প্রদর্শনী The Sculpted She
শিল্পী অলকানন্দা সেনগুপ্ত
প্রদর্শনী চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত
প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা (রবিবার বেলা ১২টা থেকে রাত ৮টা)
ঠিকানা: দ্য বেঙ্গল স্টোর | ১২৭, যোধপুর পার্ক, গ্রাউন্ড ফ্লোর | কলকাতা ৭০০০৬৮
দূরভাষ: ৮৫৮৫৮৪০৭২৫

অলকানন্দার বিভিন্ন কাজ নিয়ে এক এক করে বিশদে লেখা যায়, বলা যায়। কিন্তু তার থেকেও বড়ো, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যা দর্শককে অনেক বেশি আনন্দ দেবে। ভাবনার খোরাক জোগাবে। দ্য বেঙ্গল স্টোরের এই প্রদর্শনী অবশ্য কলকাতার শিল্পী মহলে আলোড়ন তুলছে, আনন্দও দিচ্ছে তার অসাধারণ উপস্থাপনা। ১৪টা টেরাকোটা ভাস্কর্যের পাশাপাশি অলকানন্দার বেশ কিছু কালি-কলম-তুলির কাজ রাখা আছে, সেগুলোও বিশিষ্ট। সব মিলিয়ে, এক কথায় দারুণ।
__________
প্রদর্শনী ঘুরে অলকানন্দা সেনগুপ্তের ভাস্কর্যগুলি দেখে ছবি এঁকেছেন হিরণ মিত্র। এখানে সেগুলিই ব্যবহৃত হল। বিনা অনুমতিতে ছবিগুলি অন্যত্র প্রকাশ করা যাবে না।