কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল G20 বিজ্ঞান বসুধা
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”
নবজাতকের কাছে এই অঙ্গীকার করেছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কিন্তু বাস্তবে দূষিত পৃথিবীর বুকে বাস করে, দূষিত বায়ু থেকে শ্বাস নিতে নিতে প্রশ্ন জাগে, কী রেখে যেতে পারছি আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য? আদৌ কি শ্বাস নেওয়ার জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন, পান করার জন্য বিশুদ্ধ জল পাবে তারা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুব কঠিন। কারণ নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংস, জল অপচয়, প্লাস্টিক ব্যবহার ইত্যাদি নানাবিধ বিবেচনাহীন কাজকর্মের ফলে মানুষ ক্রমশ ধ্বংস করছে প্রকৃতির ভারসাম্য। ফলাফল বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল যে মারাত্মক হবে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে বসুধাকে রক্ষা করা যায় এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে, কীভাবে বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো যায় আশীর্বাদ রূপে? এই সমাধানসূত্রের খোঁজ করতেই গত ৪ অগাস্ট আকাশবাণী কলকাতার উদ্যোগে বেলগাছিয়ার ওয়েস্ট বেঙ্গল ভেটেরিনারি কাউন্সিলের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল G20 বিজ্ঞান বসুধা।
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক আয়োজিত ভারত জুড়ে আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্র বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে G20-র তাৎপর্য এবং ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সকলের সামনে তুলে ধরছে। এই কার্যক্রমেরই একটি আকাশবাণী কলকাতা আয়োজিত ‘বিজ্ঞান বসুধা’।
G20 বা Group of Twenty বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল ১৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী, যার উদ্দেশ্য বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সুস্থায়ী উন্নয়ন। ১৯৯৯ সালে এই গোষ্ঠী গঠিত হয় এবং ২০০৮ সাল থেকে এই গোষ্ঠীর বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়। ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন দেশ এই সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেছে। ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৩ তারিখ পর্যন্ত এই সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছে আমাদের দেশ ভারত। এই বিষয়ে ভারতের নীতি হলো ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার। G20 র অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন কর্মগোষ্ঠী (S20, F20, T20 ইত্যাদি) মিলে সুস্থায়ী উন্নয়নই এর মূল লক্ষ্য।

কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক আয়োজিত ভারত জুড়ে আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্র বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে G20-র তাৎপর্য এবং ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সকলের সামনে তুলে ধরছে। এই কার্যক্রমেরই একটি আকাশবাণী কলকাতা আয়োজিত ‘বিজ্ঞান বসুধা’। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ অনুধাবন এবং তার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান কিভাবে কার্যকরী হতে পারে সেই প্রসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় সন্ধান করা হল বিভিন্ন সমাধানসূত্র। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডক্টর চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী এবং এই অনুষ্ঠানের মুখ্য বক্তা ছিলেন ভূতপূর্ব IAS এবং পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব ডক্টর মানবেন্দ্রনাথ রায়। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং বিজ্ঞানীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চের দুই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী তথা প্রশাসক ডক্টর সীতাংশু কুমার দেব ও ডক্টর তাপস কুমার ঘোষাল। আলোচনা সভাটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী এ মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বসু। আলোচনা সভার শেষে ছাত্রছাত্রী ও উপস্থিত দর্শকদের প্রশ্ন এবং উপস্থিত বক্তাদের উত্তরে আরও সমৃদ্ধ হল আলোচনাসভা।
শুধু আলোচনা নয়, মানুষের মনে কোনো বিষয়ে রেখাপাত করার ক্ষেত্রে শিল্পমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা এবং মানুষের বিবেচনাহীন কার্যকলাপের ফলে সৃষ্ট প্রকৃতির রোষ এই বিষয় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অভিনীত নাটিকা মন ছুঁয়ে গেল উপস্থিত সকল দর্শকদের। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ এই ভাবনা নিয়ে শিল্পী দেবকুমার পাল ও তাঁর সহযোগী শিল্পীদের মূকাভিনয়ে মুগ্ধ হলো প্রেক্ষাগৃহ। সবশেষে ছাত্রছাত্রী ও উপস্থিত দর্শকদের জন্য আয়োজিত ক্যুইজের অনুষ্ঠান ছিল উপভোগ্য এবং একই সঙ্গে তথ্যসমৃদ্ধ।

সুইডিশ তরুণী গ্রেটা থুনবার্গ বহু বছর ধরেই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁর আহ্বানে বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটেও সামিল হয়েছে এই বাংলা। যথেচ্ছ গাছ কাটা, জলাভূমি নষ্ট করা, প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং সর্বোপরি মানুষের অজ্ঞানতা আমাদের পরিবেশকে করছে দূষিত, বাড়ছে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাব। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন এখন সুস্পষ্ট। বিশ্ব উষ্ণায়ন আজ তাই অত্যন্ত পরিচিত শব্দবন্ধ। তবে বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহারই একটু একটু করে সারিয়ে তুলতে পারে পৃথিবীর এই অসুখ। তার জন্য প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। এই সচেতন করার লক্ষ্যে আকাশবাণী কলকাতা আয়োজিত G20 বিজ্ঞান বসুধা ছাত্রছাত্রী এবং প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত দর্শক এবং অনলাইন সম্প্রচারের সকল দর্শকদের আরও একটু সচেতন করল, মনে করালো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আন্তরিক সম্পর্কের কথা।