June 16, 2017 | 12:00 PM

অদ্রীশ বায়োস্কোপওয়ালা আড়ি করে চলে গেল

বন্ধু অদ্রীশ আমাদের সঙ্গে সারা জীবনের মতো আড়ি করে চলে গেলো। ভাব আর ডাব বলার কোনও সুযোগ দিতে রাজি হল না। সেটা আমাদের রবীন্দ্রভারতী জোড়াসাঁকো বাড়ির ঠাকুর দালানের দিন চত্বর। এসেছিল মৌয়ের সঙ্গে। মূল আড্ডার সুত্রধর আমাদের আরেক অধ্যাপক বন্ধু শমীন্দ্র। মৌ গান করত আকাশ জুড়ে। আর অদ্রীশ বসে বসে আমাদের সাথে আড্ডার বুলি কাটতো। মৌয়ের গলায় ‘ অমল ধবল পালে লেগেছে’ শুনে আমরা অনেকটা সময় চুপ করে এমন থাকতাম তাতে মনে হত প্রচুর কোলাহল আজ স্তব্ধ হল। ঠিক এমন কথাটাই মনে পড়ছে অদ্রীশ আড়ি করে চলে গেলো বলে। অদ্রীশ আমি মৌ আমরা সকলেই তখন একদিকে যেমন লেখাপড়া করি আবার তেমন লেখালিখিও করি। আনন্দবাজার পত্রিকায় বলতে গেলে পালা করেই লেখা দিতাম আমরা। প্রকাশ হলে ল্যান্ড লাইনেই আড্ডা হত চুটিয়ে। কিন্তু তার থেকেও বড় যেটা হত সেটা হল লেখার মধ্যে আর কি কি থাকতে পারতো তার আলোচনা। সেই সঙ্গে এডিটর সাহেবের কাঁচির তলায় ঠিক কোন লাইন গুলো শহীদ হয়েছে সেসবের চুল চেরা বিচার করতাম আমরা।

এসবের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে অদ্রীশ আমাদের কাছে একদিন আত্মপরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছিলো। বিরল আত্মপরিচয়। একদিকে জানার বিপুল পরিধি আর অন্য দিকে নিজের জানাকে আনকোরা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে হাজির করার তীব্র দক্ষতা। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম। নয় কেন? অমর চিত্র কথা সিরিজের চটি বইগুলো কি ভাবে আমাদের বাল্য মনের সবুজ মাঠে দেশাত্ম বোধের বীজ বোনে সে কথা ওর মুখে না শুনলে খেয়ালই করতাম না। এক পাটি জুতো মানে কি কি হতে পারে তা দিয়ে অদ্রীশ একটা মহাভারত লিখতে পারে। রবীন্দ্রনাথ আর বিদ্যাসাগরের চটির পার্থক্য কি তা আমি জেনেছি অদ্রীশের কাছে। সেই এক পাটি চটি-জুতো কি ভাবে তাঁদের আত্মপরিচয়ের দোসর হয়ে উঠেছিলো বা তাঁদের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হয়ে গিয়েছিল সে বিষয় একটা পনেরো মিনিটের ক্লাস নিয়েছিলো অদ্রীশ বাংলা আকাদেমি-র গেটে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে।

ওই সময়েই দেখেছিলাম উনিশ শতক নিয়ে ওঁর একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে। বিশেষ করে বটতলা নিয়ে। ওই শতকটা যেহেতু নানা ভাবে আমারও আগ্রহের বিষয় তাই কিছু আদানপ্রদান চালিয়েছিলাম আমরা কখনো গোল পার্কের সামনে, কখনো ফোনে। আমার বাড়িতে ১৯০২ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত সময় কালের রেকর্ড গুলো অনেকবার শুনতে আসবে বলেছিল। আসা হয় নি। কিন্তু আমি যে বার পুরনো গান নিয়ে রেকর্ড বাজিয়ে বাংলা আকাদেমিতে অনুষ্ঠান করেছিলাম সেবার ও আর মৌ আমার অনুষ্ঠানের কার্ড বিলি করেছিল নন্দন চত্বরে ঘুরে ঘুরে। ওদের বন্ধু বান্ধবদের জন্যে অনুষ্ঠানে লোকও হয়েছিলো অনেক। সে আরেক কাহিনি।

এসবের সাথে সাথেই কেটে গেল অনেক দিন। আমি জানি ওঁর নিজের একটা পার্সোনাল স্পেস আছে। সেখানে আছে অনেক ঝড়-ঝাপ্টা। এই ঝড় ঝাপ্টার মাঝেই একদিন একটা গল্প বলল অদ্রীশ। গল্পটা হল বব ডিলান আর জোয়ান বায়েজের সম্পর্কের ওঠা নামার গল্প। সাথে সাথে এলো এল্টন জনের প্রসঙ্গ। লেডি ডায়নার প্রেম মৃত্যু আরও নানা কথা। সেই গোটা গল্পটা এমন ভাবে বলেছিল অদ্রীশ যে আমার মনে হয়েছিলো আমি বাইস্কোপ দেখছি। জোয়ান- ডিলানের তুমুল সংঘাত, গালাগালি, আর ভালোবাসার কথা নয় যেন চলমান ছবি দেখিয়েছিল অদ্রীশ।

সেই গল্পের শেষে ‘অদ্রীশ বায়োস্কোপওয়ালা’ বলেছিল অবক্ষয়ের পৃথিবীতে একদিন বেঁচে ছিল ভালোবাসা। আর আজ অবক্ষয়ের পৃথিবীতে ভালোবাসার অবক্ষয় ঘটেছে।