May 4, 2017 | 12:00 PM

ধর্মসম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রকৃত সন্ধানী কিছুই পেতে পারেন না

সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমি বুঝি ধর্মের চেয়ে ধর্মসম্প্রদায়কে এবং ব্যক্তির চেয়ে গোষ্ঠীকে বড়ো ক’রে দেখা। যে নিজেকে সবসময়ে হিন্দু বা মুসলমান ব’লে ভাবতে অভ্যস্ত, অন্যের সঙ্গে পরিচিত হ’লে তার চরিত্র, বিদ্যাবুদ্ধি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ইত্যাদির খোঁজ না-নিয়ে প্রথমেই জানতে চায় লোকটি ব্রাহ্মণ না শূদ্র, হিন্দু না মুসলমান, ইহুদি না খ্রীষ্টান, সে সাম্প্রদায়িক মানুষ। এই সাম্প্রদায়িক মানসিকতাই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রাদর্শের সবচেয়ে বড়ো হন্তারক। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা ইংরেজ সরকারের আদর-আপ্যায়নে পুষ্ট হ’য়ে দু-তিন দশক ধ’রে ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অশুভ শক্তিরূপে দেখা দিয়েছিলো। ইংরেজদের সাম্রাজ্যিক স্বার্থান্বেষী দূরদর্শিতা আর হিন্দুদের অদূরদর্শিতার আপতিক দুর্যোগের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ ক’রে ঐ আসুরিক শক্তি দেশের উপর যে প্রচণ্ড আঘাত হানলো তাতে ক’রে দেশ দু-খণ্ড হ’য়ে গেলো। খণ্ডিত ভারতে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার শিঙ ভেঙেছে কিন্তু মেরুদণ্ড ভাঙেনি এখনও।

হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্কে যাঁরা মৈত্রী কামনা করেন তাঁরা সম্মিলন ও সমন্বয়ের উদাহরণগুলি খুঁজে-খুঁজে বার করেন – সঙ্গীতে, স্থাপত্য, চিত্রে, সাধু-সন্ত ফকির-দরবেশ আউল-বাউলদের সাধনায়, আকবরের মতন মহান সম্রাটের দূরপ্রসারী উদার বুদ্ধির রাজকীয় প্রকাশে। যাঁরা বিরোধকেই বড়ো করতে বদ্ধপরিকর তাঁদেরও খুব বেশি বেগ পেতে হয় না সংঘর্ষ ও সংঘাতের দৃষ্টান্ত উদঘাটন করতে। বিজয়োম্মত্ত ক্ষমতাগর্বিত মাহমুদ গজনবী, আলাউদ্দিন খলজী, ঔরঙ্গজীব, নাদির শাহ, আহম্মদ শাহ-র যে সব দানবিক কীর্তি ক’রে গেছেন তা-ও ইতিহাসের পাতাকে কলঙ্কিত ক’রে আছে। কিন্তু ঠিক এই ব্যাপারে ইতিহাসের উপর এতোটা নির্ভর করার কোনো প্রয়োজন আছে ব’লে আমি মনে করতে পারি না। ঐতিহাসিক কৌতূহল ভালো, জ্ঞানীগুণী ঐতিহাসিকের রচনা পাঠ ক’রে আনন্দ পাওয়াটা সঙ্গত। কিন্তু কোনো জাতি যদি তার ভবিষ্যৎ পন্থা খোঁজে ইতিহাসের পাতায়, তবে বলতেই হবে যে, এগিয়ে চলবার ইচ্ছা তার এখনও জন্মায়নি।

ইতিহাস যা-ই বলুক, ভারতে ও পাকিস্তানে উভয় সম্প্রদায়ের অধিকসংখ্যক লোকের শিরায়-উপশিরায় ভেদবুদ্ধি এমন নিয়ত প্রবহমান যে যখন তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারূপে ফেটে না-পড়ে তখনও তার নানাপ্রকার সূক্ষ্ম প্রকাশ বা প্রচ্ছন্ন ক্রিয়া দেখা যায়। উদাহরণত আমরা সাম্প্রদায়িক উপদ্রবকে বন্যা-মহামারী জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুল্য জ্ঞান করি, তারই মতো বেদনাদায়ক কিন্তু তার চেয়ে বেশি ন্যক্কারজনক নয়। অল্প লোকই উপলব্ধি করেন যে সাম্প্রদায়িক হিংস্রতায় একটা অসহায় মানুষের প্রাণনাশ বন্যায় বা কলেরায় হাজারটি মৃত্যু অপেক্ষা অনেক বেশি মর্মন্তুদ ব্যাপার – কারণ প্রথমটি নৈতিক অধঃপতন, দ্বিতীয়টি প্রাকৃতিক বিপদ্‌পাত মাত্র।

প্রাচীন যুগে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি অনিবার্যভাবে জড়িত ছিলো। রাজনীতির প্রকৃত কর্মক্ষেত্র সমাজের সুষ্ঠ গঠন ও উন্নয়ন; ধর্মের ক্ষেত্র মনের সৌষ্ঠব ও শান্তি। আজ যখন সর্বত্রই কর্মবিভাগের আবশ্যকতা মেনে নেওয়া হয়েছে তখন এটুকু বুঝতে বাধা কেন যে, মানব-জীবনের সবচেয়ে গুরুতর দুই ক্ষেত্রেও সীমারেখা অস্পষ্ট রাখলে উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের প্রয়োজন আজও রয়েছে, কিন্তু সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলা ও বিবর্তনের দায়িত্ব এখন সেকুলার নেতৃবৃন্দ ও প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। অর্থাৎ ধর্মসম্প্রদায় ও ধর্মসংস্থা আজ নিষ্প্রয়োজন; শুধু নিষ্প্রয়োজন নয়, এক মস্ত বড়ো অন্তরায়। জাতীয় জীবনে ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধনের অন্তরায় তো বটেই, ধর্মসাধনার পথেও ধর্মসম্প্রদায়ের দুর্মর অস্তিত্ব রীতিমতো একটি বিঘ্ন হ’য়ে দাঁড়িয়েছে। ভাববার কোনো কারণ নেই চোদ্দশো, হাজার বা তিন-হাজার বৎসর পূর্বে ধর্মসাধকরা যে স্তরে উঠেছিলেন সেখান থেকে শুধু নাবাই সম্ভব, অবনতিই অনিবার্য – যদি-না আমরা সেই দূর অতীতকালের খুঁটি আঁকড়ে আধ্যাত্মিক অধঃপতন থেকে নিজেকে কোনোমতে রক্ষা ক’রে চলি। সভ্যতা ও সংস্কৃতির যাবতীয় বিভাগ যখন এগিয়ে চলেছে, নতুন-নতুন পথ খুঁজে বার করেছে, তখন কেমন ক’রে বিশ্বাস করবো যে, অধ্যাত্মসাধনার বেলাতেই কেবল আমাদের অভিব্যক্তির সকল সম্ভাবনা ফুরিয়ে গেছে, কোনো-এক অতীত যুগের মন্ত্র আউড়ে আমরা পাথর হ’য়ে গেছি; চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছি?

ধর্মসম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রকৃত সন্ধানী কিছুই পেতে পারেন না। যাঁদের অন্তরে সাধনা নেই অথচ মুখে ধর্মের বুলি আছে, তাঁরা তাঁদের সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পান গোঁড়ামি আর আনুষ্ঠানিক আচার। অথচ এই দুই প্রকাণ্ড বেড়া ভাঙতে না-পারলে ধর্মের পথে এক পা-ও এগুনো সম্ভব নয়। ধর্মের মধ্যে হয়তো কিছু শাশ্বত সত্য আছে, কিন্তু নিত্য নতুন ক’রে তাকে পেতে হবে, যুগে-যুগে জনে-জনে নব-নব আধারে তাকে ধরতে হবে। ধর্ম শুধু কয়েকটি বুলি নয় যা তোতা পাখির মতো শিখে ফেলা যায়, কসরৎমাত্র নয় বা কয়েক মাসে ডন-বৈঠকের মতো অভ্যাস ক’রে নেওয়া যায়। বহু বৎসরের ব্যাকুল হতাশ অন্বেষণের পর হয়তো পথের ক্ষীণ আভাস দেখতে পাওয়া যাবে। তবু প্রত্যেককে এই আত্মিক অন্ধকারে ক্ষতবিক্ষত চরণে একাই চলতে হবে।

গোঁড়ামী আর সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি একই সঙ্গে বেড়ে ওঠে এবং পরস্পরকে পরিপুষ্ট ক’রে তোলে। দুটোরই মূলে রয়েছে ধর্মশিক্ষাদানের অতিশয় ভ্রান্ত চিরাচরিত প্রথা। শিশুবয়সে যখন ভালোমন্দ সত্যাসত্য বিচার করবার মতো চিৎশক্তি আদৌ তৈরি হয়নি, তখনই আমরা সম্প্রদায়-বিশেষের কতকগুলি অবোধ্য শাস্ত্রবাক্য বা ডগ্‌মা মুখস্থ করাই, কতকগুলি অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠান অভ্যাস করাই। তার চেয়েও যেটা সাংঘাতিক, ভিন্ন মত, আচার ও অনুষ্ঠানের প্রতি অতিশয় অবজ্ঞার ভাব আমরা সেই কাঁচা বয়স থেকেই ছেলেমেয়েদের মনে পাকা করিয়ে রাখি। সব দেশেই এটা কুশিক্ষা, কিন্তু ভারতবর্ষের মতো দেশে – যাকে আমরা বহু দূরদেশাগত মত ও পথের ত্রিবেণীসঙ্গম ব’লে গর্ববোধ করি – এ-কুশিক্ষার অনিষ্টকারিতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

(১৩৭২ বঙ্গাব্দে লেখা প্রবন্ধ ‘সেকুলারিজম্‌ এবং জওয়াহরলাল নেহেরু’-এর নির্বাচিত অংশ, ‘পথের শেষ কোথায়’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত, দে’জ পাবলশিং)