অ এ ক খ-র মধ্যে খুঁজে পাওয়া এক অন্য জগৎ
অ আ ক খ আদতে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ। অর্থাৎ বর্ণগুলির কোনোটিতে থাকে স্বর বা শব্দের নিরবিচ্ছিন্ন বাধাহীন বেরিয়ে আসার আবেশ। আর কোনোটিতে থাকে তারই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা। কিন্তু অক্ষরমালা প্রয়োগ করে মানুষ নিজের বলা কথাকে যেমন নথিবদ্ধ করতে পেরেছিল আবার একইভাবে অক্ষরমালা প্রয়োগ করে চারপাশের দৃশ্যরূপকে কথায় পরিণত করেছিল। এই বিষয়টি পৃথিবীর ইতিহাসে নানাজনকে নানা ভাবে ভাবিয়েছে। ফলে শব্দ, কথা এবং দৃশ্য – এই তিনের এক অদ্ভুত যে মেলবন্ধন তা নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন শিল্পীরা। সেই রকমই একজন শিল্পী হলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
তিনি যে চিত্রাক্ষর নিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন তার মূল অর্থটি হল অক্ষরের আড়ালে চিত্রকে খোঁজার প্রয়াস। এখানেই অ–এ অজগর বা আ-এ আমটির সঙ্গে একটা ফারাক তৈরি হয়েছে। কারণ, চিত্রাক্ষরের মজাটি হল একটি অতিরিক্ত অন্বেষণ। যেখানে অ আ ক খ অক্ষরমালার যে গঠন সেই গঠনের আড়ালে খোঁজার চেষ্টা হয়েছে কোনো একটা চেনাপরিচিত চিত্রকে। সেই কারণেই হয়ত অ আ ক খ গঠনের সঙ্গে একটু এদিক ওদিকে জুড়ে দিলে সে একটা পরিচিত দৃশ্যরূপ পেয়ে যায়। বলতে গেলে অবনীন্দ্রনাথ সেটাই করতে চাইলেন। একটি গঠনের আড়ালে অন্য আর একটি গঠনের সাদৃশ্যের আনন্দ।
অক্ষরগুলিকে নিয়ে তিনি খেলছেন তখন আর নানাধরনের রেখাকল্প সেই অক্ষরমালার সঙ্গে সন্ধি করছে। এবং এই সন্ধি করে যেন একটা নতুন রূপের উন্মোচন করছে। অবনীন্দ্রনাথ শিশুদের নিয়ে ভাবতেন। চেনাপরিচিত ছকের চর্বিত চর্বনে শিশুর মন বিশ্বাস করে না। শিশু মনের এই সত্ত্বাকে আদর করে যত্ন করতেন ছোটদের দাদামশাই। তাই তিনি চাইতেন নিত্যনতুন কিছু খেলার ছন্দ প্রয়োগ করে শিশুদের একঘেয়ামি কাটানোর চেষ্টা করতেন। শিশুর মনের আনুসন্ধানিক রূপ জাগিয়ে তোলার জন্য পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে অমূল্য পাথর খুঁজতে বলতেন। শিশুর মনে কল্পনার জগত গড়ে তোলার জন্য শিশুদের বলতেন রাতে দেখা স্বপ্নকে লিখে রাখ খাতায়। শিশুর মনকে স্বতঃস্ফূর্ত রাখতে হবে। তাই কখনো বাড়ির ছেলেদের নীরব নিরেট পাথরের টুকরোর মধ্যে প্রাণ খুঁজে নিতে বলতেন – ধর ধর ধর আমার পাথরের ইঁদুর জীবিত হয়ে রেলিং দিয়ে বাগানে চলে গেছে। অথবা গুরুমশাইয়ের কানমলা খেয়ে পড়তে বসে রোজের দেখা ঘুম পাওয়া অ আ ক খ’র মধ্যে খুঁজে নিতে বলতেন নতুন দিনের পাখি বা হুঁকো হাতে নবাব বাদশাহকে। বাগানের কাটা গাছের গুঁড়ি দিয়ে বানিয়ে ফেললেন কুটুম কাটাম।