সত্যজিতের নিজের বিশ্বায়নের শুরু তো এই জার্মানি থেকেই
রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু প্লেনের চাকা মাটি ছোঁয়ার পনেরো মিনিট আগে থেকেই জানালার পাশে চেয়ারের হাতল দু-হাতে শক্ত করে ধরে, চোখ বন্ধ করে, এক অদ্ভুতরকম বিকৃত মুখ করে ইষ্টনাম জপছেন। প্লেনের চাকা মাটি ছোঁয়ার পরেও ব্রেকের চাপে যখন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন, তখন বাম হাতে আমার সিটবেল্ট টেনে ধরে আর ডানহাতে সামনের সিটের ওপর ভর দিয়ে প্রাণপণে ‘স্টপ’ ‘স্টপ’ বিড়বিড় করতে থাকলেন।
আইল সিটে বসা ফেলুদার কোনও ভ্রুক্ষেপ হলনা। ভোর-ভোর ওঠা অনেকদিনের অভ্যেস হলেও, ভোররাতের ফ্লাইটে আমাদের এই প্রথম যাত্রা। অনেকরাত অবধি আলো জ্বেলে কিছু একটা পড়ছিল। মোটা বইটায় স্বস্তিকা চিহ্নের মতো একটা ছবি দেখে ভাবলুম রাতজেগে সিম্বলটিম্বল নিয়ে নিশ্চয়ই মাথা ঘামাচ্ছে । ড্যান ব্রাউন যে ফেলুদা পড়বে না সে আমি বিলক্ষণ জানি। নামার আগে যখন ব্রেকফাস্ট চালু হল, তখন কিন্তু চাদরের ওপর সিটবেল্ট বেঁধে দিব্যি ঘুমোতে দেখলাম। এটার মানে আমি জানি। ওভাবে সিটবেল্ট বেঁধে রাখা মানে ব্রেকফাস্টের সময় যেন ঘুম না ভাঙানো হয়। এয়ারহোস্টেসও তাই খেতে ডেকে বিরক্ত করল না।
প্লেন থামার পরপরই জটায়ু মিনিট পাঁচেক আগেকার উদ্বেগ ঝেড়ে ফেলার ভান করে হাত নাড়তে নাড়তে বললেন, “যাই বলো ভাই তপেশ, বাস ট্রাকের ব্রেকফেল করতে পারলে প্লেনের ব্রেকফেল করবে না, এটা কেউ গ্যারান্টি দিতে পারে না। আল্পসের চড়াই-উতরাই রানওয়েতে পাইলট ধাতস্ত কিনা সেটা তো আর কারো জানার কথা নয়!”
“আল্পস আপনার ডানদিকে, প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে। সূর্যোদয়ের কিঞ্চিত পরেই পেরিয়ে এসেছেন”। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলল ফেলুদা। তারপর উঠে পড়ে ওপরের লকার থেকে আমাদের হ্যান্ডব্যাগগুলো নামাতে নামাতে বলল, “পাহাড়ের চড়াই উতরাইতে খুব কসরত করে হেলিকপ্টার হয়ত নামাতে পারবেন, এই ডবলডেকার সুপারজাম্বো ছাড়ুন, সাধারন প্লেনেরও তিন-চার কিলোমিটার সমতলভূমি লাগে রানওয়ের জন্য। তবে মিউনিখ না এসে ´লুক্লা ´তে নামলে আপনার সম্ভাবনা ফলতেও পারত অবশ্য”।
জটায়ু নিষ্প্রভ হয়ে নোটবুকে 'লুক্লা' লিখে রাখলেন। নেপালের এই দুর্গম এয়ারপোর্টির নাম যে আমার জ্ঞানের সঙ্গে পরে মিলিয়ে নেবেন সে আমি আন্দাজ করতে পারি।
পঞ্চাশে ফেলুদা উপলক্ষে লেখা শুরু করেও এক জঘন্য রাইটার্সব্লকের ফলে ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুকে জার্মানি আনিয়ে, রহস্য ঘনীভূত করিয়েও কেস সলভ্ করে আর দেশে ফেরত পাঠাতে পারিনি, সত্যজিতের শতবর্ষে পৌঁছেও। এখন লকডাউনের মরশুমে অসমাপ্তির সেই হতাশা থেকেই এই পত্রের অবতারণা।
নিজের শহরে ফেলুদাকে আনার অভিপ্রায় আমার বরাবরের। মিউনিখ শুধু ইতিহাস, ভূগোল, বিশ্বজনীনতা দিয়ে মোড়া একটি সচ্ছল শহর বলে নয়, ভারতীয়তা এবং নিখাদ বাঙালিয়ানা যে এই শহরে চারাগাছ থেকে মহীরুহে রূপান্তরিত হচ্ছে তা নিজের চোখে বিগত দশক ধরে দেখছি। আর শুধুমাত্র বিশিষ্টজন, গবেষক, ছাত্রছাত্রী কিংবা আমাদের মত চাকুরিজীবী নয়, মিউনিখের শহরতলী দাকাউতে থাকেন সত্যজিতের অনেককালের পুরোনো বন্ধু, ডঃ গিওরঘ লেষনার। ম্যাক্সমুলারের কর্ণধার হিসেবে বহু বছর ভারতে বসবাসের অভিজ্ঞতাসহ সেই বন্ধুত্বের গল্প শুনেছি খোদ ডঃ লেষনারের থেকে, প্রতিবার সাক্ষাতে। একটা সময় আমার মনে হত, সন্ডার্স আর ক্রোল কেউ একজন এই ডঃ লেষনারের সম্পর্ক থেকে।
তাছাড়া, সত্যজিতের নিজের বিশ্বায়নের শুরু তো এই জার্মানি থেকেই। আর তা শুধু ১৯৫৭-র পথের পাঁচালি বার্লিনালে জয় দিয়ে নয়, বছরের পর বছর অপরাজিত, তিন কন্যা, মহানগর, চারুলতা, নায়ক এমনকি অশনি সংকেত-কেও পুরস্কৃত করা — মানে বার্লিনালে যেন সত্যজিতের ইডেন গার্ডেনস।
রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যেমন পরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে, সত্যজিতের সৃষ্টিকে নিয়ে সেই কাটাছেঁড়া করার প্রথম মুশকিলটা হল, বাঙালি নিজে। এতটাই গলঃধকরন করে বসে আছে সবাই, যে মানিকেয় মোচড়ের চমক না থাকলে সে লেখা ব্যর্থ সাহিত্য হবে। আর বিন্দুমাত্র ভুলচুক হবে অমার্জনীয় অপরাধ। তবু অনামী কারো কারো সৃষ্টিতে ফেলুদা এখনও দেখা যায় ব্লগে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডে। এমনই একটি চমৎকার লেখার খোঁজ বন্ধু অরিন্দম চ্যাটার্জি দিয়েছিল কুয়ালালামপুর থেকে। আবোল তাবোলে ´গানের গুঁতো´র একটি লাইন কমবেশি সকলের জানা, ´গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা—আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা! ´ সুকুমার রায় সত্যি কোন রহস্য রেখে গেছিলেন কিনা জানা নেই, কিন্তু এই ছড়াটিকে রহস্যের মোড়কে ফেলে ফেলুদার মগজাস্ত্র দিয়ে তার সমাধান – জনৈক নীলাদ্রি রায়ের এই ফিকশনটি সত্যিই চমোপ্রদ এবং সত্যজিৎ অনুরাগী সাধারণ পাঠকের আরও কাছে পৌঁছনো দরকার। সত্যজিৎ নিজে বাবার লেখার নিয়ে এমন নিশ্ছিদ্র অনুসন্ধান করেছেন কিনা খুঁজেও পেলাম না, কিন্তু যুক্তিগ্রাহ্যতা দিয়ে প্রতিটি ছড়ার অসামান্য সমসাময়িক বিশ্লেষণ আছে নীলাদ্রির এমনই একটি বইতে – Rhymes of Whimsy – The Complete Abol Tabol: Translated into rhyme-accurate English, with investigative analysis of hidden satire. ফেলুদারহস্য হিসেবে কিন্তু এই লেখা প্রকাশ করতে পারেননি নীলাদ্রি। স্বাধীনভাবে ফেলুদা নিয়ে লেখার সেটি হল গিয়ে দ্বিতীয় মুশকিল। কপিরাইট।
সত্যজিৎ বেঁচে থাকলে জার্মানির প্রেক্ষাপটে ফেলুদাত্রয়ীকে নিয়ে একটা কাহিনি – খানিকটা অন্যায় হলেও আমাদের অধিকারের মধ্যেই পড়ত। কিন্তু তাদের নিয়ে ইউরোপ যাত্রা তিনি একবারই করেছেন। প্রথমবার স্বভাবতই বিলেতে ফেলুদা, কারণ ১৯৫০এ লন্ডনের সেই ছমাসে ৯৯টি সিনেমা এবং বাইসিকল থিফ না দেখলে সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর শতবর্ষ নিয়ে আমাদের এই লেখালেখির কারণ থাকত না।
১৯৯১ পরবর্তী বছরগুলো যদি স্বাধীন ভারতের আধুনিক যুগ হয়, সেখানে ১৯৯২-তে সত্যজিতের চলে যাওয়া মানে সেই আধুনিকযুগে বাঙালির ফিকশন আইকনকে অকালঅবসরে পাঠানো। তারপরও পুরোনো গল্পের ওপরেই ফেলুদা নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে। সব্যসাচী চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং বিভু ভট্টাচার্য মানানসই ত্রয়ী হওয়ার যথেষ্ট সাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু পূজাবার্ষিকী কিংবা ধারাবাহিক উপন্যাস-গল্প হিসেবে নতুন ফেলুদার অ্যাডভেঞ্চার থেকে বাঙালি আজ আঠাশ বছর বঞ্চিত। কপিরাইটওয়ালারা নিজেরা লিখছেন না, আর নীলাদ্রিদেরও প্রকাশ করতে দেবেন কিনা সন্দেহ।
সেখানেই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ওপর বিশ্বভারতীর কপিরাইট সমাপ্তির বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। ২০০২ থেকে বিশ্বভারতীর স্বত্বাধিকার লোপ পাওয়ার পর এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে রবীন্দ্রসঙ্গীত সমৃদ্ধ হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে কেন এই প্রশ্ন উঠবে না সত্যজিতকে স্বত্বমুক্ত দেখতে কি বাঙালিকে আরও বাইশ বছর, অর্থাৎ ২০৪২ অব্ধি অপেক্ষা করতে হবে ?
তাই শেষে প্রশ্ন একটাই, অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে দিয়ে ফেলুদা-২.০ থেকে আরও কতদিন বঞ্চিত থাকতে হবে বাঙালিকে? এই ধন্দেই বোধহয় আমার রহস্যগল্প আর এগোচ্ছে না, বোর্ডিংপাসে এসে আটকে গেছে।
…জিভ কেটে নোটবইতে ঠিক করতে করতে জটায়ু বললেন, “চার্চিল-হিটলার ভাষাখিচুড়ি কভী নাহোক, তবে এর বদলে আপনাকে আমি কিছু দিতেই পারি”। কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটি বোর্ডিংপাস বের করে এগিয়ে দিলেন সামনে সীটে ফেলুদার দিকে, “উইথ রিগার্ডস ফ্রম মিস্টার লেদারজ্যাকেট, স্মোকিং জোনে ফেলে এসেছিলেন বোধহয়। প্ল্যাকার্ড খোঁজাখুঁজির সময়, আমার হাতে দিয়ে গেল বেরোতে বেরোতে।”
ভ্রূ কুঁচকে ফেলুদা একবার নিজের বুকপকেটে হাত দিয়ে জটাযুর বোর্ডিংপাসটা নিল। উলটেপাল্টে কিছুক্ষণ দেখে আরও ভ্রূ কুঁচকে গেল।
ঠিক তখনি আমরা অটোবানে পড়লাম, আর সারাচের বাহন খেলা শুরু করল। গতিবেগ একশোআশি ছুঁয়ে একশোপঞ্চাশের নীচে নামছেই না। ভেতরে সেই বিশাল গতির কোন প্রভাব নেই। ডানদিকের হাতলের ওপর ভর দিয়ে জটায়ু নোটবুকে দিব্যি লিখছেন। ফেলুদা আর আমার চোখ বারবার সেই মসৃণ হাইওয়ে আর স্পীডোমিটারের কাঁটা, দুটিতে ঘোরাফেরা করছে। এই মুহূর্তগুলোর এক রোমহর্ষ উপভোগে আমাদের কথাও হুট করে থেমে গেল।
সীমাহীন গতিবেগে গাড়ি ছুটছে। পৃথিবীর আর অন্য কোন দেশে এ সম্ভব কিনা তা ইন্টারনেটও জানে না। তবে ফেলুদার দৃষ্টিতে যে অটোবানের রোমাঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে বোর্ডিংপাসের একটা খটকা জড়িয়ে আছে সেটা আমি বুঝতেই পারছিলাম।
ন্যাভিগাশনে আমাদের গন্তব্য আরও বারো কিলোমিটার দেখাচ্ছে, কিন্তু গাড়ির গতি কমে যাওয়ায় শহরে ঢুকছি বোধ হল। স্টিয়ারিং এর ওপর থেকেই আঙুল দিয়ে ডানদিকে আমাদের কিছু দেখতে ইশারা করলেন সারাচ। একটু পরে সেই সাদা ধবধবে ফিবারগ্লাস দিয়ে মোড়া পরিচিত স্টেডিয়ামটা স্বচক্ষে নজরে এল । জটায়ু নোট করতে গিয়ে আমার কাছে আলিয়াঞ্জ এরেনা শব্দটার সঠিক বানান জানতে চাইলেন। প্রায় বিশ মিনিটের নীরবতা চলছে, ফেলুদা তাকাল স্টেডিয়ামটার দিকে, দেখেও যেন দেখছে না।
অবশেষে, “কলেজস্ট্রীটের যে চটিবইটা আছে সেটার জার্মান দক্ষতা কেমন, লালমোহবাবু ?” বলেই বোর্ডিংপাসটা আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে থমথমে গলায় বলল, “ওখানে আমি কিছুই ফেলে আসিনি।”
আমরা দুজনেই বোর্ডিংপাসটার ওপর হামলে পড়লাম। জটায়ুর মুখ সাদা। মানে না বুঝতে পারলেও, পাসটি যে সাদামাটা একটি কাগজ নয় সে দেখেই হতচকিত হয়ে জার্মান চটিবইটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন। … (অসম্পূর্ণ)