December 7, 2016 | 12:00 PM

বাবরি ধ্বংস, আদবাণী এক বার চেষ্টা করে দেখতে পারতেন

৬ ডিসেম্বরের ২৪ বছর হল। দিনটা আমার কাছে গভীর দুঃখের দিন হিসেবে স্মৃতিতে থেকে যাবে। হয়তো আরও অনেক ভারতীও এমনই ভাবেন।

১৯৯২ সালের ওই দিনে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বিতর্কিত বাবরি মসজিদ দিনের আলোয় ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও। আর উত্তরপ্রদেশে তখন বিজেপির শাসন। মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং। কল্যাণ পরে তাঁর বক্তৃতায় বার বার বলেছেন, কোনও ঠিকাদারকে দায়িত্ব দিলে ওটা ভাঙতে ১২ মাস লেগে যেত। আর তাঁদের সমর্থকরা দু’দিনে ভেঙে দিয়েছেন।

ঘটনার দিন অযোধ্যায় বিশাল জমায়েত করেছিল বিজেপ, আরএসএস, বিশ্বহিন্দু পরিষদ-সহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠননের সমর্থক’ সদস্য এবং করসেবকরা। সাংবাদিক হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমরা থাকতাম অযোধ্যা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে ফৈজাবাদে হোটেলে। ৫ তারিখ রাতে ৮টা নাগাদ আমরা কয়েক জন সাংবাদিক হেঁটে হেঁটে অযোধ্যা গিয়েছিলাম। রাস্তায় এক মুসলিম আইনজীবীর সঙ্গে কথা হল। যখন তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছে, তার মধ্যেই তাঁর বৃদ্ধা মা আমাদের বললেন, খুব চিন্তায় আছি। কী হবে বুঝতে পারছি না। আপনারা ভগবানের কাছে আমাদের হয়ে একটু প্রার্থনা করবেন। যেন সব কিছু ঠিক থাকে। ৬ ডিসেম্বর বাবরি ধ্বংসের পর ৮ তারিখে আবার যখন ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখলাম ওই এলাকায় এখানে ওখানে পোড়া বাড়ি। তখনও সব আগুন নেভেনি। তার মধ্যে সেই উকিলের বাড়িটাও রয়েছে দেখলাম। চারি দিক জনশূন্য। কোথাও কোনও ফায়ার ব্রিগেডও চোখে পড়ল না।

ফিরে আসি ৬ তারিখের সকালের কথায়। বিরাট এলাকা। জুড়ে জমায়েত। মঞ্চে এল কে আদবাণী সহ বিজেপি নেতারা। বক্তৃতা চলছে। অনেকটা দূরে পুজোর আয়োজন চলছে। আমি বক্তৃতার এলাকা ছেড়ে এসে পুজোর জায়গায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি। আদবাণীর বক্তৃতা চলছে। এমন সময় এক দল যুবক পাথর ছুড়তে শুরু করলেন বাবরি মসজিদ ঘিরে রাখা কাঁটা তারের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে। তাঁরা সরে গেলেন। যুবকরা প্লায়ার্স দিয়ে তার কেটে ছুটতে ছুটতে গিয়ে বাবরি মসজিদের মাথায় উঠে গেরুয়া পতাকা তুলে দিলেন। শত শত যুবক গিয়ে বাবরি ঘিরে ফেললেন। শুরু হল শাবল, গাঁইতি দিয়ে মসজিদ ভাঙা। তখন আদবাণীর মঞ্চ থেকে মাইকে বলা হচ্ছে, আপনারা পতাকা তুলেছেন, এবারে নেমে আসুন, ফিরে আসুন। সে কথায় অবশ্য কেউ কান দেননি। কিছু ক্ষণ বাদে ঘটনাস্থল থেকে বাইরে এসে দেখলাম, বিভিন্ন গলিতে দাঁড়িয়ে কিছু যুবক বাঁশি বাজাচ্ছে। সেই ডাক শুনে ছুটে ছুটে আরও যুবকরা আসছেন। তাঁদের সবাইকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে মসজিদ ভাঙার কাজে।

আদবাণী যখন দেখলেন, মঞ্চ থেকে বলা সত্ত্বেও মসজিদ ভাঙা আটকানো গেল না, তিনি মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন। তার পর আমরা সাংবাদিকরা সেদিন আর তাঁকে পাইনি। উমা ভারতী-সহ অন্য বিজেপি নেতারা অবশ্য থেকে গেলেন। আমরা দেখলাম, মসজিদের একটা একটা করে ডোম ভেঙে পড়ছে, আর বিজেপির নেতা নেত্রীরা পরষ্পরকে আনন্দে জড়িয়ে ধরছেন।

আমার পরে অনেক বার একটা কথা মনে হয়েছে। আদবাণী কি জানতেন এমন ঘটবে? কখনও মনে হয়েছে হ্যাঁ। কখনও মনে হয়েছে না। কিন্তু বার বার মনে হয়েছে, অত বড় মাপের নেতা, তিনি তাহলে নিজে হেঁটে মসজিদের কাছে গিয়ে ওই যুবকদের নিরস্ত করলেন না। তাঁর যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, তিনি এক বার চেষ্টা তো করে দেখতে পারতেন! তিনি কিন্তু তা করেননি। মুমূর্ষু রোগীকে দেখেও যদি কোনও ডাক্তার চিকিৎসা না করে রোগীকে ছেড়ে চলে যান, এবং যদি রোগী মারা যায়, সে ক্ষেত্রে যেমন ডাক্তারকে নির্দোষ বলা যায় না। এ ক্ষেত্রেও, যদিও দেশের আইনে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত, আমার মনে হয় ওই একই কারণে বাবরি মসজিদ ভাঙায় তাঁর দায় থেকেই যায়। কারণ তিনি শেষ চেষ্টা না করে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এর ফলে দেশে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তাতে বহু নির্দোষ মানুষের মৃত্যু হয়।

এর দায় কি এল কে আদবাণীর মতো একজন প্রবীণ নেতা এড়াতে পারেন? ইতিহাস কি বলবে?