বনজঙ্গল পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনা। তাঁরা গাইছেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’ গানের ছায়ায় রচিত একটি প্রায় হিন্দি তর্জমা, ‘শুভ সুখ চৈন কী বরখা বরষে ভারত ভাগ হৈ জাগা…’। রবীন্দ্রনাথ রচিত মূল গানটির কোনও পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না। কিন্তু কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যেমন, সালটি ১৯১১। ২৭ ডিসেম্বর ‘ভারতের জাতীয় কংগ্রেস’-এর ২৬তম বার্ষিক অধিবেশন ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’ গানটি প্রথম জনসমক্ষে গাওয়া হবে বলে ঠিক করা হল। সেই মত গানের রিহার্সাল হয়েছিল ডঃ নীলরতন সরকারের হ্যারিসন রোডের বাড়িতে। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কবির সকল গানের ভাণ্ডারী দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। গানটি নিয়ে অনেকের মতামত ছিল যে সেটি ভারতসম্রাটের আগমন উপলক্ষে তাঁর স্তুতিতে রচিত। রবীন্দ্রনাথ এই নিন্দের জবাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন – ‘… জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় যুগ-যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই কোনক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।…’
রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তাকে পরিষ্কার ভাবে প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন নেতাজী। তাই যুদ্ধ ক্ষেত্রে কবির এই গানটিকে আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীতের শিলমোহর দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় গানটিকে যথা সম্ভব মর্যাদায় অনুবাদও করা হয়েছিল। যে সময় এই ঘটনা ঘটছে তখন ভারতবর্ষ এই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে দেখতে পায়নি। বলতে গেলে নেতাজি তাঁর স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলেন কবি গুরুর গানের ভাবে ও স্বরলিপিতে। তাই তিনিই ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগেই ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানকে ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনীর তথা সমস্ত দেশবাসীর জন্য জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গানটিকে নির্বাচিত করেছিলেন। এটা ছিল দেশের সেনানায়কের কবি প্রণাম।
ভারতের জাতীয় সেনাবাহিনী – ১৯৪২-১৯৪৫ (আর্জি হুকুমত-ই-আজাদ হিন্দ)।
স্থাপিত হয়েছে – ২১ অক্টোবর, ১৯৪৩।
ক্যাবিনেট মেমবার – নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস,
মিনিস্টার অফ ব্রডকাস্টিং – এস. এ. আইয়ার।
সেক্রেটারি- এ.ন. সাহায়।
জাতীয় সংগীত – ‘শুভ সুখ চৈন কী বরখা বরষে ভারত ভাগ হৈ জাগা……’
এই গানটি স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন ডঃ অম্বিক মজুমদার, সংগীতের স্বরগ্রামটি তৈরি করেছিলেন ক্যাপ্টেন রাম সিং ঠাকুর এবং প্রথম গানটি পিয়নতে বাজিয়ে নেতাজিকে শোনানো হয়েছিল। নেতাজি গানটি শুনে ‘ভারতের জাতীয় সেনা বাহিনীর’ জাতীয় সংগীত হিসাবে নির্বাচন করেন। গানটির অর্কেস্টা ছিল ‘হ্যামবুর্গ রেডিও অর্কেস্টা।’ গানটির চূড়ান্ত সংস্করণ করেন ডঃ এইজেল ক্রাটেজ।