
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯১৭ সালে। এ বছর সেই উপন্যাসের শতবর্ষ। বিগত একশো বছরে ‘দেবদাস’ অন্তত ১২ বার সিনেমায় প্রযোজিত হয়েছে। তবে হলের পর্দায় সেই ছবির আবির্ভাব ঘটেছে দশবার। বাকি দুটি অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
১৯২৮ সালে নির্বাক যুগে ‘দেবদাস’ প্রথম পর্দায় আসে অভিনেতা-পরিচালক নরেশ মিত্র’র উদ্যোগে। আর সাম্প্রতিক কালে তার পুনরাগমন ঘটিয়েছেন অনুরাগ কাশ্যপ। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, দেবদাসের কাহিনি নির্মাণে যে কাঠামো তাকে অনুসরণ করে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় কত যে ছবি তৈরি হয়েছে- তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোণ নিবিড় গবেষণা হয়নি।
একেবারে আদি কাল থেকে সিনেমার দর্শক পর্দায় এমন কাহিনি প্রত্যাশা করেছে যে অনেক টানাপোড়েনের পরেও নায়ক-নায়িকার মালা বদল হবে এবং তারা সুখে থাকবে। ‘দেবদাস’ সেই ছকে বাঁধা ধারণার বিরুদ্ধে একটা প্রবল প্রতিবাদ। সেটা প্রমাণিত হল এই কলকাতা থেকে।
১৯৩৫ সালে সবাক যুগে নিউ থিয়েটার্স ‘দেবদাস’ প্রযোজনা করল প্রমথেশ বড়ুয়ার অভিনয়ে এবং নির্দেশনায়। সেই ছবি বক্স অফিসে জোয়ার এনেছিল। প্রেমে ব্যর্থ দেবদাস মদ্য পানে আসক্ত হয়ে নিজেকে নিঃশেষ করছে, সেটাই তিরিশ-চল্লিশ দশকে শিক্ষিত যুব সমাজের কাছে একটি দৃষ্টান্তমূলক ভাবমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।
সিনেমার মত শক্তিশালী মাধ্যম এমন নেতিবাচক বার্তা ছড়াচ্ছে দেখে বিব্রত বোধ করেছিলেন ভি সান্তা রাম। ১৯৩৯ সালে তিনি পালটা ছবি করলেন ‘আদমি’- যার ইংরেজি নাম হল ‘Life is for Living’। সেই কাহিনির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক যুবক পুলিশ অফিসার আর এক সুন্দরী পতিতা। কিন্তু বাংলা সিনেমার দেবদাস বড়ুয়া এবং হিন্দি দেবদাস সাইগল যখন ব্যক্তিগত জীবনে ‘দেবদাস’ হয়ে অকালে মৃত্যুর পথে হাঁটলেন সেই আবেগের সামনে সান্তারামের সৎ প্রচেষ্টা বালির বাঁধের মত ভেঙ্গে গেল।
শুধু তাই নয়। কাহিনিকার হিসেবে শরৎচন্দ্রকে স্বীকৃতি না দিয়েও সিনেমার নানা প্লটে দেবদাস ফিরে ফিরে আসতে শুরু করল। ১৯৫৭ সালে গুরু দত্ত যখন ‘পিয়াসা’ তৈরি করলেন সেই ছবিতে গুলাব চরিত্রে ওয়াহিদা রহমান’কে দেবদাসের চন্দ্রমুখী ভেবে নিতে কোন অসুবিধা হয় না। দুই বছর পর ‘কাগজ কি ফুল’ ছবিতে গুরু দত্ত আবার দেবদাসকেই ফিরিয়ে আনলেন। এই দুই ছবি পাশাপাশি যদি রাখা যায় অবিস্মরনীয় গায়িকা গীতা দত্ত’র জীবন কাহিনিকে তাহলে শরৎবাবুর রচিত দেবদাসের বৃত্তটি যেন এক বাস্তব পূর্ণতা পায়।
ভারতীয় সিনেমা বলতে চেয়েছে দেবদাস কেবল শরৎবাবুর একার নয়। সময় বদলালে তার নির্মাণও বদলাবে। ‘মেলা’ ছবিতে দিলীপ কুমার কে সেই কারণেই দেবদাসের বিকল্প মনে হয়। সেই ছবিতে দিলীপ-বৈজয়ন্তি সারা ভারত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।হৃষিকেশ মুখার্জি’র ‘আনন্দ’এ রাজেশ খানা তো দেবদাস হয়েই ফিরে আসেন। ‘সূরজ কা সাতওয়ান ঘোড়া’ ছবিতে শ্যাম বেনেগালও কি পেরেছেন দেবদাস-এর প্রভাব এড়িয়ে চলতে?
শরৎবাবু দেবদাস সৃষ্টির সময় দুই নারীর বিপরীতে একজন পুরুষকে রেখেছিলেন। ভারতীয় সমাজ দুই পুরুষের মাঝখানে এক নারীর বিপন্নতাকে সহজে মেনে নিতে চায় না। সমাজ পুরুষ শাসিত তাই বেদনার ধ্বংসাত্মক পরিণতি পুরুষই বহন করুক।
শতবর্ষ পরেও সেই ছক সমানে চলেছে।