
যাঁরা ’৫০, ’৬০ কিংবা ’৭০-এর দশকের লং-প্লেয়িং রেকর্ডের ভক্ত এবং নস্ট্যালজিয়া প্রবণ, কলকাতা শহরের মির্জা গালিব স্ট্রিট তাঁদের জন্য সাংগীতিক গুপ্তধনের অন্যতম ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে। লতা মঙ্গেশকর থেকে লেড জেপলিন, মহম্মদ রফি থেকে মেটালিকা – পৃথিবী এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ভিন্ন স্বাদের পুরোনো রেকর্ডের আশ্রয়স্থল। ১৯৯৩ সাল থেকে কলকাতার সংগীতপ্রেমীদের মনের খোরাক জুগিয়ে চলেছেন তারকেশ্বর রাও, যাঁকে অনেকেই ‘মুন্না’ নামে চেনেন।
মির্জা গালিব স্ট্রিট (যা ফ্রি স্কুল স্ট্রিট নামেও পরিচিত) ‘সিটি অফ জয়’ অর্থাৎ কলকাতার অন্যতম সাংগীতিক ঘাঁটি। গানবাজনা নিয়ে কলকাতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। ভিনটেজ গান বা পুরোনো রেকর্ড সংগ্রহকারীদের জন্য এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিট-এর মতো রাস্তাগুলি এক্কেবারে উপযুক্ত। মুন্নার দোকান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে, যাঁরা পুরোনো দিনের গান পছন্দ করেন তাঁদের জন্য বিভিন্ন ধরনের গানের পসরা নিয়ে আজও বিদ্যমান।

সাম্প্রতিককালে নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে ভিনটেজ রেকর্ডগুলি। ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৭ বছরের মধ্যে ভিনাইল রেকর্ডের বিশ্বব্যাপী বিক্রি প্রথমবার সিডি-কেও ছাড়িয়ে গেছে।
হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা, পুরোনো সংস্কৃতি সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে এই দোকানগুলো। শুধু তাই নয় এই দোকানগুলো কলকাতার সংগীত-ইতিহাসের সাক্ষী। এই দোকানগুলোই কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ফলক।
দোকানই এখন মুন্নার ঘরবাড়ি, জীবন। দোকানেই থাকেন। ফ্রি স্কুলে তাঁদের দুটি দোকান ছিল, একটি ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিক নামে তাঁর কাকার, অন্যটি তাঁর নিজের, নাম- ভিনাইল স্ট্রিট স্টোর। কাকার বয়স হয়ে যাওয়ায়, বিশ্বস্ত ভাইপোর ওপরেই দোকান চালানো ভার সঁপেছেন। দুটি দোকান এখন একত্রে ‘ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিক ভিনাইল রেকর্ড স্টোর’ হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দক্ষ হাতে দোকানটি পরিচালনা করেন মুন্না। হিসেব করে দেখলে তিনি একাই বারো ঘণ্টার শিফটে কাজ করেন, কারোর কোনও সাহায্য ছাড়াই দ্বিগুণ কাজ করেন। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে ১৯৭৮ সালে লেডি ডাফরিন ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে তাঁর জন্ম। আর পাঁচটা সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারে যা হয়, অসচ্ছল পরিবারের হাল সামলাতে বড়ো দাদা হিসেবে ছোটো ভাইয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। সেই ভাই যখন লেখাপড়া শিখে চাকরি পেল, মুন্না ভাবলেন এবার নিজের মতো করে কিছু করা যাক। তারপরই নিজেকে নিয়োজিত করলেন রেকর্ড বিক্রির কাজে। ভিনাইল রেকর্ডগুলিই এখন তাঁর আপনার জন এবং বেশিরভাগ সময় তিনি দোকানেই থাকেন।
“আমার কাছে সব পাবেন। মহম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আর ডি বর্মন… সব আছে।” ঝড়ের বেগে বলে যাচ্ছিলেন আত্মবিশ্বাসী মুন্না। তাঁর দোকানের ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিক এবং দেশিয় ভিনাইল রেকর্ডের সম্ভার সত্যিই তারিফযোগ্য। মান্না দে, হেমন্ত কুমার, ফিরোজা বেগম, সন্ধ্যা মুখার্জি-র মতো আইকনিক বাঙালি শিল্পী থেকে শুরু করে এলভিস, দ্য বিটলস, পিঙ্ক ফ্লয়েড, আয়রন মেডেন, লেড জেপলিন সহ আরও অনেক পশ্চিমা সংগীত কিংবদন্তিদের রেকর্ড। এটি সত্যিই সংগীতপ্রেমীদের জন্য নির্ভরযোগ্য একটি ঠিকানা, বিশেষত যাঁরা সংগীত ইতিহাসের অনুরাগী বা গবেষক, কারণ সাহিত্যের মতোই বিশ্বজুড়ে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন এসব মণিমুক্ত, জিজ্ঞেস করায় মুন্না বলেন, “বিভিন্ন জায়গা থেকে”। তিনি এমন লোকদের কাছ থেকে রেকর্ডগুলি কেনেন যাঁরা সেগুলি আর ব্যবহার করেন না এবং এরকম অনেক ফেসবুক/হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, যেখান থেকে পুরোনো রেকর্ডসের হদিশ পান। মুন্না তাঁর সংগ্রহে শুধুমাত্র বাংলা গান রাখেন না বলে তাঁর বহু অবাঙালি খরিদ্দারও আছেন যাঁরা কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ এমনকি ভারতের বাইরে থাকেন। তাঁর কাছ থেকে রেকর্ড কিনতে বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, দিল্লি থেকেও সংগ্রাহকরা আসেন। অঞ্জন দত্ত, জোজোদের মতো বিখ্যাত সংগীতশিল্পীরাও ঢুঁ দিয়েছেন তাঁর দোকানে। প্রতি মাসে আনুমানিক ২০০টি রেকর্ড বিক্রি হয়, আয় হয় ৫০০০০ থেকে ১০০০০০ টাকার মতো। প্রতিদিন গ্রাহকের দ্দেখা না পেলেও যখন কেউ রেকর্ড কিনবেন বলে আসেন, একসঙ্গে অনেক বিক্রি হয়। অনেক সময় পর্যটকরা গুগল সার্চ করে মুন্নার দোকানে আসেন শুধুমাত্র রেকর্ডগুলি ছুঁয়ে দেখতে আর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

তারকেশ্বর রাও ওরফে ‘মুন্না’
সাম্প্রতিককালে নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে ভিনটেজ রেকর্ডগুলি। ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৭ বছরের মধ্যে ভিনাইল রেকর্ডের বিশ্বব্যাপী বিক্রি প্রথমবারের মতো সিডি-কে ছাড়িয়ে গেছে। নতুন করে আগ্রহ তৈরি হলেও, পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং কেনা ব্যয়বহুল হতে পারে। ডিজিটাল যুগে যেখানে এক ক্লিকেই পৃথিবীর যাবতীয় গানবাজনার সংগ্রহ চাইলেই পাওয়া যায়, সেখানে পুরোনো রেকর্ডের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রতিবন্ধতাগুলির সম্মুখীন হতে হয়।
ওয়েস্টার্ন পপ মিউজিকের মতো দোকান, বিশেষ করে মুন্নার দোকানকে সংগীতপ্রেমীদের স্বর্গ বলা যেতে পারে। রেকর্ডগুলি সাশ্রয়ী নয় ঠিকই কিন্তু মুন্না সেগুলির প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তিনি নিজেই বলেন যে গান শুধু তাঁর জীবনের একটা অংশ নয়; তাঁর জীবন। “গান না থাকলে, আমিও এখানে থাকতাম না।” কর্মক্ষেত্রে গান এভাবেই অনুপ্রাণিত করে মুন্নাকে।
যাঁরা গানবাজনার গুপ্তধনের সন্ধান করতে চান তাঁদের গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে এই দোকান, যা নানারকম মূল্যবান রেকর্ড সংরক্ষণের পাশাপাশি শ্রোতাদের সংগীতের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গভীরে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।