ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি : জাপানে বাংলার ডাল-ভাত-চচ্চড়ি, জাপানি দম্পতির বঙ্গপ্রেম

জাপানে বাঙালি খাবার! মিলছে সর্ষে মাছ, মুরগির ঝোল, বেগুনি, কলকাতা বিরিয়ানি। গরম ভাত আর মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল বেড়ে দেওয়া হচ্ছে কলা পাতায়। না না! কোনও বাঙালি নয়। জাপানি দম্পতি রাঁধছেন এবং পরিবেশন করছেন। কোজি নাকায়ামা এবং সাচিকো নাকায়ামা (Koji & Sachiko Nakayama) ২০১৮ সাল থেকে জাপানের ফুকুওকায় চালাচ্ছেন এক রেস্তোরাঁ। নাম: ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি (The Indian Spice Factory)। বিগত সাত বছর যাবৎ তাঁরা কেবল খাঁটি বাঙালি খাবার পরিবেশন করেন নিজেদের রেস্তোরাঁয়। জাপানে বাঙালি খাবারের প্রচার এবং প্রসার ঘটানোই তাঁদের লক্ষ্য।

 

কলকাতায় থাকাকালীন বাংলার খাবারের সঙ্গে কোজি নাকায়ামার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। শহর কলকাতা ও বাংলার খাবারের প্রেমে পড়ে যান কোজি। জাপানে বাঙালি খাবারের রেস্তোরাঁ শুরু করার নেপথ্যে এটাই ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা।

কোজি নাকায়ামা বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানালেন তাঁদের সফরের কথা। পেশায় তিনি নিজে একজন শেফ। কলকাতায় জাপানি খাবারের রেস্তোরাঁ শুরু হবে, তাই ডাক পড়েছিল কোজির। ২০১৩ সালে তিনি কলকাতায় আসেন এবং রেস্তোরাঁর কাজে সাহায্য করেন। তখন বেশ কিছুকাল কলকাতায় ছিলেন কোজি। কলকাতায় কাটানো প্রতিটি দিন তাঁর কাছে ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা এবং সে অভিজ্ঞতা যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। তাঁর কথায়, “আমি দিল্লিতে, চেন্নাইয়ে থেকেছি কিন্তু ভারতে আমার প্রিয় জায়গা কলকাতা। অতিমারির আগে প্রতি বছর দু-তিনবার করে কলকাতায় যেতাম। কখনও কখনও গোটা পরিবার নিয়ে গিয়েছি। অতিমারির পর আর যাওয়া হয়নি। খুব শীঘ্রই সপরিবারে কলকাতায় যাওয়ার প্ল্যান করছি।”

কলকাতায় থাকাকালীন বাংলার খাবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে। শহর কলকাতা ও বাংলার খাবারের প্রেমে পড়ে যান কোজি। জাপানে বাঙালি খাবারের রেস্তোরাঁ শুরু করার নেপথ্যে এটাই ছিল তাঁর অনুপ্রেরণা। কোজি জানাচ্ছিলেন, কলকাতায় থাকাকালীন প্রতিদিন যেসব বাঙালি পদ খেতেন, সেগুলি তাঁর খাদ্যভাসের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যেত। ভাজা মুগের ডাল, পুঁই শাক ভাজা আর সর্ষে মাছ কোজির প্রিয় বাঙালি পদ। তিনি বলছিলেন, “কলকাতায় থাকার দৌলতে আমার সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ। মূলত শহরতলির পরিবারগুলির তরফে সহযোগিতা পেয়েছি। তাঁদের ভালোবাসায় উষ্ণতা ছিল।”

 

বাঙালি খানার রেস্তোরাঁ শুরু করার নেপথ্য কারণ হিসাবে তিনি জানাচ্ছেন, “জাপানি এবং বাঙালিদের খাদ্যাভাস প্রায় এক। উভয়ই ভাত এবং মাছ খেতে ভালোবাসে। জাপানি ও বাঙালি খাদ্য সংস্কৃতির অনেক মিল রয়েছে। সেই সাদৃশ্যের সূত্র ধরে জাপান তথা জাপানিদের পাতে বাঙালি খাবার পৌঁছে দেওয়া ভাবনার জন্ম।” কোজি আরও বলছিলেন, “ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বাংলার খাবারের ক্ষেত্রে রান্নার উপকরণগুলির গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। জাপানের সঙ্গে খাদ্যাভাসগত মিল তো আছেই, এই দুই কারণে বাঙালি খাবারের রেস্তোরাঁ শুরু করার কথা ভাবা।”

সাত বছরের সফরে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছেন কোজি ও সাচিকো। ধাক্কা খেয়েছেন, প্রতারকের পাল্লায় পড়েছেন, বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে, অতিমারির সময় বিক্রি কমেছে কিন্তু সব বাধাকে জয় করে তাঁরা কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছেন। বলছিলেন, “প্রথমে আমরা কলকাতার একজন শেফকে আমাদের রেস্তোরাঁয় নিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু আমরা যেমন বাঙালি খাবার পরিবেশন করতে চাইছিলাম, তিনি তেমন করছিলেন না। দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক হচ্ছিল। এখন আমরা, স্বামী-স্ত্রী নিজেরা গোটা রেস্তোরাঁ চালাই। খাবারের গুণমানকে আমরা অগ্রাধিকার দিই। আমার স্ত্রী সাচিকো একজন স্প্যানিশ শেফ, তিনি বাঙালি খাবার রান্নার পুরো বিষয়টা দেখভাল করেন।”

বাঙালি খানার রেস্তোরাঁ শুরু করার নেপথ্য কারণ হিসাবে কোজি জানাচ্ছেন, “জাপানি এবং বাঙালিদের খাদ্যাভাস প্রায় এক। উভয়ই ভাত এবং মাছ খেতে ভালোবাসে। জাপানি ও বাঙালি খাদ্য সংস্কৃতির অনেক মিল রয়েছে। সেই সাদৃশ্যের সূত্র ধরে জাপান তথা জাপানিদের পাতে বাঙালি খাবার পৌঁছে দেওয়া ভাবনার জন্ম।”

 

‘ইন্ডিয়া স্পাইস ফ্যাক্টরি’-তে আমিষ এবং নিরামিষ, দুই ধরনের খাবারই পাওয়া যায়। বাসমতি চালের ভাত, ভাজা মুগের ডাল, বেগুনি, আলু পুঁই শাক ভাজা, আলু ভাজা, উচ্ছে ভাজা, কুমড়ো চচ্চড়ি, সর্ষে রুই মাছ, চিংড়ির মালাইকারি, কষা মাংস, মুরগির ঝোল, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, ফিশ ফ্রাই, মাছ ভাজা, মাছের পাতুরি, মাছের কালিয়া, মাছের ঝোলের মতো খাবার তাঁরা পরিবেশন করেন। এছাড়াও মিষ্টি তৈরি করেন। থাকে কলকাতা স্টাইল বিরিয়ানিও। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সবজি তাঁরা নিজেরাই চাষ করেন। পাশাপাশি বাজার থেকেও কেনেন। টাটকা, সতেজ মাছ কেনেন স্থানীয় মাছ বাজার থেকে।

কোজি জানাচ্ছিলেন, “জাপানিদের মধ্যে আমাদের রেস্তোরাঁর সর্ষে মাছ এবং মাছের কালিয়া খুবই জনপ্রিয়। তাঁরা আমাদের মাছের পদগুলি বেশ পছন্দ করেন। বাঙালি খাবার মজা করে খান জাপানিরা। বাঙালি খানা খেয়ে কেউ কেউ বলেন, ‘আগে কখনও বাঙালি রান্না খাইনি। খুব সুস্বাদু এবং লোভনীয়।’ আবার কারও কারও ধারণা ছিল ভারতীয় খাবার মানে প্রচণ্ড মশলাদার। কিন্তু এখন খাওয়ার পর বলেন, ‘এই খাবার প্রতিদিন খাওয়া যায়।’ জাপাননিবাসী বাঙালিরাও আমাদের রেস্তোরাঁয় আসেন। ইংল্যান্ড, হংকংয়ে থাকা বাঙালিরা জাপান বেড়াতে এলে আমাদের এখানে খেতে আসেন। খাবার খেয়ে তাঁরা আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তাঁরা বলেন, ‘একেবারে খাঁটি বাঙালি খাবার, ঠিক যেন বাড়ির মতো। খাবার খেয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়লাম।’ আবার কেউ কেউ বলেন, ‘জাপানে বসে বাঙালি খাবার খেতে পারব…! ভাবতেই পারিনি!”

বাংলা বিবিধের মহামিলন ক্ষেত্র, যুগে যুগে নানা মত, নানা ভাষা, নানা দেশের মানুষেরা এখানে এসেছেন। কেউ থেকে গিয়েছেন, কেউ কেউ ফিরে গিয়েছেন কিন্তু সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছে বঙ্গ এবং বঙ্গের সংস্কৃতি। কোজি জাপান থেকে কলকাতায় এসে বাংলার, বাঙালি খানার প্রেমে পড়েছেন। বাংলার স্বাদে তিনি এতটাই প্রাণিত হয়েছেন যে, নিজের দেশে বাঙালি খাবারকে জনপ্রিয় করার, জাপানিদের দোরে দোরে বাঙালির ডাল-ভাত-মাছ-চচ্চড়িকে পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়ে ফেলেছেন। অবিরাম গতিতে কাজ করে চলেছেন। ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি-কে ঘিরে কোজি ও সাচিকোর কর্মযজ্ঞ চলতে থাকুক। তাঁদের সফরনামা যেন বাঙালি খাবারের জাপান বিজয়ের গাথা।

________________
ইন্ডিয়ান স্পাইস ফ্যাক্টরি-র ইন্সটাগ্রাম লিংক:
https://www.instagram.com/indian_spice_factory/ 
**সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত হয়েছে এই প্রতিবেদন, যা বঙ্গদর্শন.কম-এর এক্সক্লুসিভ। লেখা থেকে কোনোরকম উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে এবং লেখাটি কপি-পেস্ট করে অন্যত্র প্রকাশ করলে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ছবি সৌজন্যে কোজি নাকায়ামা।

Written by