
ইমামবাড়ার প্রধান সম্মুখভাগ
হুগলি জেলা সদর চুঁচুড়ায় অবস্থিত হুগলি ইমামবাড়া শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, ইতিহাস ও স্থাপত্যের নিদর্শন। রাজ্যের হেরিটেজ স্বীকৃতি পেয়েছে মুঘল আমলে তৈরি এই স্মৃতিসৌধ। যা আজও সৌভ্রাতৃত্ব ও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যের প্রতীক।

ঘড়ি টাওয়ার
ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে শুরুতেই হেরিটেজ স্বীকৃতি লাভ করে হুগলি জেলা সদর চুঁচুড়ায় অবস্থিত প্রাচীন এই স্থাপত্য। ২০০৬ সালে প্রথমবারের জন্য কমিশনের টাকায় ইমামবাড়া সংস্কারের কাজ হয়।
গত মার্চে, হুগলি ইমামবাড়া পরিদর্শনে এসে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, সেখানে থাকা অনন্য ভাস্কর্য এবং ভেতরে থাকা বিখ্যাত বেলজিয়ান ঝাড়বাতি দেখে মুগ্ধ হন ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার এনড্রিও আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। বলেছিলেন, ‘এই স্থাপত্য শুধু হুগলির নয়, সমগ্র ভারতের গর্ব। এটি সমস্ত ভারতীয় এবং বিশ্বের প্রতিটি মানুষের দেখা উচিৎ।’ প্রসঙ্গত, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-র আমলে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন বিধি (২০০১) বলবৎ হওয়ার পরে, নানা মাপকাঠিতে রাজ্যের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যগুলি চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে শুরুতেই হেরিটেজ স্বীকৃতি লাভ করে হুগলি জেলা সদর চুঁচুড়ায় অবস্থিত প্রাচীন এই স্থাপত্য। ২০০৬ সালে প্রথমবারের জন্য কমিশনের টাকায় ইমামবাড়া সংস্কারের কাজ হয়। তার পর থেকে দফায় দফায় সেই টাকা এখনও আসছে।

ইমামবাড়ার সূর্যঘড়ি ও ঘড়ি টাওয়ারের বড়ো ঘণ্টা
দু’তলা ভবনের প্রবেশপথে রয়েছে দুটি ১৫০ ফুট উচ্চ মিনার, যেগুলোর মাঝে বসানো হয়েছে একটি বিশাল ঘড়ি। ঘড়িটি তৈরি করেছিল ইংল্যান্ডের সেই কোম্পানি, যারা বিখ্যাত বিগ বেন ঘড়ির নির্মাতা।
১৬০০ সালের শেষ দিকে হুগলিতে বসতি স্থাপন করেন আগা মোতাহের নামে এক পারসি নুন ব্যবসায়ী। তিনিই পরে হাজি মোহাম্মদ মহসিন নামে পরিচিত হন। বর্তমান ইমামবাড়াটি তৈরি করা হয়েছিল তাঁর স্মৃতিতেই। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক এবং দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। যদিও কোনো নির্ভরশীল তথ্য নেই, তবে বিশ্বাস করা হয় যে মোতাহের, সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে ইমামবাড়ার বিশাল জমি দানস্বরূপ পেয়েছিলেন। সেই জমিতেই তিনি ছোটোখাটো একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর কন্যা মন্নুজান খানম তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। কোনো সন্তান না থাকায়, মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সম্পদের উত্তরাধিকারী হন হাজি মোহসিন। মহসিন নিজেও সফল ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাঁর অর্জিত সম্পদসহ সবকিছুই তিনি দান করে দেন জনকল্যাণের জন্য।
বর্তমানে যে ইমামবাড়াটি রয়েছে তার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৮৪১ সালে সৈয়দ কেরামত আলির তত্ত্বাবধানে। তৎকালীন কিছু বিতর্কের সুরাহার পর ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপে এই নির্মাণকার্য সম্পন্ন হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল এবং খরচ হয়েছিল দু’লাখ টাকারও বেশি, যা সেই সময়ের জন্য ছিল বিশাল অঙ্কের অর্থ। এটি নির্মিত হয় পুরোনো ইমামবাড়ার ধ্বংসাবশেষের ওপর। এর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করেছিলেন কেরামতউল্লাহ খান। আজ এই ইমামবাড়াটি পশ্চিমবঙ্গের একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র, যা তার স্থাপত্যিক নৈপুণ্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের জন্য খ্যাত।

ঘড়ি টাওয়ার থেকে হুগলি নদীর দৃশ্য
দু’তলা ভবনের প্রবেশপথে রয়েছে দুটি ১৫০ ফুট উচ্চ মিনার, যেগুলোর মাঝে বসানো হয়েছে একটি বিশাল ঘড়ি। ঘড়িটি তৈরি করেছিল ইংল্যান্ডের সেই কোম্পানি, যারা বিখ্যাত বিগ বেন ঘড়ির নির্মাতা। ১৮৫২ সালে প্রায় ১১,০০০ টাকার বিনিময়ে ইমামবাড়ার এই বিশালাকার ঘড়িটি আনা হয়েছিল। ঘড়িটির দু’টি মুখ ও তিনটি ঘণ্টা রয়েছে। সবচেয়ে বড়ো ঘণ্টাটির ওজন ৩২০০ কেজি! ছোটো ঘণ্টাগুলো প্রতি ১৫ মিনিটে বাজে এবং বড়ো ঘণ্টাটি প্রতি ঘণ্টায় একবার বাজে। ঘড়িটি সচল রাখতে প্রতি সপ্তাহে দুইজন ব্যক্তিকে ২০ কেজি ওজনের একটি চাবি দিয়ে এটিকে ঘোরাতে হয়।
অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, এখানে রয়েছে প্রশস্ত মার্বেলের মেঝে, একটি ফোয়ারা ও পুকুর, যা স্থানটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। ফোয়ারার দুই পাশে রয়েছে দু’তলা বিশিষ্ট বিশাল দালান, যা ‘বিবিখানা’ নামে পরিচিত। এখানকার প্রধান নামাজের স্থানটিকে বলা হয় ‘জারি দালান’, যা সাদা-কালো মার্বেল, ঝলমলে লণ্ঠন ও ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি দিয়ে সুসজ্জিত। দরজাগুলোর উপরের অংশে বসানো আছে রঙিন বেলজিয়াম কাচ। এছাড়া, এখানে একটি প্রাচীন ও সচল সূর্যঘড়িও (সানডায়াল) রয়েছে, যা একটি কংক্রিটের টেবিলে রাখা আছে। ঘড়িটি আজও সূর্যালোকের মাধ্যমে সঠিক সময় দেখায়।

মুহাম্মদ মহসিনের কার্যকলাপ সম্পর্কিত শিলালিপি
হুগলি ইমামবাড়া শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে মুহররম উপলক্ষে এখানে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায় একত্রিত হয়। ইরাকের কারবালার আদলে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও রীতিনীতির সঙ্গে এখানকার মুহররম পালিত হয়। সর্বধর্মের মানুষকেই এই স্থাপত্যসৌধটি স্বাগত জানায়।
ছবি সূত্র:
উইকিমিডিয়া কমনস্
