রিয়্যালিটি শো এবং বাংলা-বাজারে নাচের দর্শক

জল বারুই নামের এক তরুণ নৃত্যশিল্পী সম্প্রতি প্রাণ হারাল। কেন? যে-উৎসবে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিল সজল, উদ্যোক্তাদের অসাবধানতাবশতঃ সেই মঞ্চে বৈদ্যুতিক তার পড়েছিল এবং খানিক আগেই হয়ে গিয়েছিল কয়েক পশলা বৃষ্টি। বৈদ্যুতিক তারে পা পড়তে ওই স্থানেই সে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে অকালে চলে গেল। উদ্যোক্তারা অবশ্য তা মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য সজল মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল এবং তাতেই বিপত্তি। কিন্তু দু-পক্ষের টানাটানি, বাগবিতণ্ডায় একটা কথা পরিস্কার যে এক তরুণ শিল্পী নিহত হয়েছে যার অনেক কিছু হয়ে ওঠা বাকি ছিল। একটি পরিবার হারাল তার ভবিষ্যৎ। আমরা সজলকে মনে রাখব আবার আমরাই তাকে ভুলে যাবো। সময় সব ক্ষত শুকিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কোনও শিক্ষাই কি আমরা এ-ঘটনা থেকে পাবো না?

চ্যানেল আর টিআরপি-র চাপে তাঁদের ওডিসি-কস্টিউম পড়ে হিন্দি সিনেমার আইটেম-সং নাচতে হয় কিংবা মণিপুরি নৃত্যের বেশে দক্ষিণ ভারতীয় নাচ-এর সুরে শরীর দোলাতে হয়। কিন্তু বরিষ্ঠ শিল্পী যাঁরা, তথাকথিত গুরু যাঁরা, তাঁরা কী করে হাসিমুখে এসব মেনে নেন?

পশ্চিমবাংলায় নৃত্যশিল্প খুব প্রখ্যাত কোনও কেরিয়ার নয়। তাও বহু ছেলেমেয়ে নৃত্য নিয়ে জীবনে এগিয়ে যায়। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকে বিষয় করে পড়াশোনা করে। কিন্তু সে-পথ কি খুব উন্নতির পথ? উন্নতি বলতে অর্থকড়ি বুঝলে সেটা খুব বেশি নৃত্যশিল্পে আর আছে কোথায়! কম বয়সী ফুটবলাররা যেমন জেলা, শহরের নানা জায়গায় একটু রোজগারের জন্য খেপ খেলতে যায়, নৃত্যশিল্পীদের ভাগ্য তার থেকে খুব আলাদা কিছু নয়। তাদেরও নানা জায়গায় ছুটতে হয় ছোটো-বড়ো সব ধরনের প্রোগ্রাম করতে। হয়তো সারাটা দিন কিছু খাওয়া হয়নি, হয়তো বাড়িতে বাবার রোজগার নেই তেমন কিংবা ছোটো বোনটার স্কুলে বেতন দিতে হবে; সমস্ত সংগ্রামের মুখোমুখি হয়ে তাদের মেকআপে বসতে হয় আর গান চললেই নেমে পড়তে হয় মঞ্চে। পুরো মঞ্চটাই তো তখন যুদ্ধক্ষেত্র একটা!

এছাড়া আছে নাচ-শেখানো। এই নাচ তো আর এখন শুধু শাস্ত্রীয়নৃত্য নেই। টেলিভিশনের দৌলতে নাচ ইদানীং রিয়্যালিটি শো-তে পরিণত হয়েছে। ফিল্মের গানে দেহভঙ্গিমা প্রদর্শন না করলে আজ আর সেটা নাচ বলে গণ্য হবে না। কিছুটা শাস্ত্রীয়নৃত্যের ছোঁয়া আর বাকিটা ফিল্মি গানের সঙ্গে জিমনাস্টিকের ভঙ্গিমা- এই মিশেলই আজকাল অভিভাবকরা চাইছেন তাঁদের সন্তানদের জন্য। তরুণ নৃত্যশিল্পীদের অতএব অন্যদের শেখাতে সেসবেরও তালিম রাখতে হচ্ছে। গুটিকতক দর্শক ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে নৃত্যশিল্পের রুচি রিয়্যালিটি শো-ভিত্তিক নাচে এসে ঠেকেছে। আর সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নাচ। কিন্তু তার মধ্যেও শাস্ত্রীয়নৃত্য যেসব তরুণ শিল্পীরা ছাড়তে চাইছেন না, ওই নাচেই অনুভব করছেন নাড়ির টান, তাঁরা প্রণম্য।

কিন্তু রিয়্যালিটি শোগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা ক্ষতিকর? পুরোটা নয় অবশ্যই। একে তো বহু নৃত্যশিল্পীকে এই টিভি-শোগুলো একটা দাঁড়াবার জায়গা, একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিচ্ছে। রোজগারের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে রিয়্যালিটি-শো থেকে সিরিয়াল, সিরিয়াল থেকে এমনকি সিনেমা পর্যন্ত অনেক যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে এই সব শিল্পীদের। তাছাড়া শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে-পথ, সেটা তো মসৃণও নয় আবার কঠিন পরিশ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। সকলের যে সে পথে এগোবার অধ্যবসায় থাকে তাও নয়। প্রতিভাও হাতে-গোনা। অতএব, রিয়্যালিটি শো-গুলি একটা মধ্যপন্থার হদিশ যদি দিতে পারলে মন্দ কি? কিন্তু সমস্যা তো তরুণ শিল্পীদের নিয়ে নয়। তাঁদের বাধ্যবাধকতা আছে।

চ্যানেল আর টিআরপি-র চাপে তাঁদের ওডিসি-কস্টিউম পড়ে হিন্দি সিনেমার আইটেম-সং নাচতে হয় কিংবা মণিপুরি নৃত্যের বেশে দক্ষিণ ভারতীয় নাচ-এর সুরে শরীর দোলাতে হয়। কিন্তু বরিষ্ঠ শিল্পী যাঁরা, তথাকথিত গুরু যাঁরা, তাঁরা কী করে হাসিমুখে এসব মেনে নেন? তাঁদের তো হারানোর কিছু নেই। তাঁদের যখন এইসব শোতে আমন্ত্রণ করা হয় তাঁরা কি একবার বলতে পারেন না রিয়্যালিটি শো-এর মঞ্চে যেটা চলছে সেটা একটা অত্যন্ত লঘুনৃত্য, জগাখিচুড়ি এবং শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে কস্টিউম সেটা ভীষণরকম সম্মাননীয় পোশাক? নৃত্যশিল্পের দর্শক এমনিতেই তলানিতে, তারপর যদি বাংলার নানা প্রান্তের মানুষ রিয়্যালিটি শো দেখে নাচ চিনতে শেখে তাহলে ভালো নাচের ভবিষ্যৎ এ-বাংলায় যে কী হবে তা ভাবলেও শঙ্কিত হতে হয়। বিনোদন বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে কিন্তু ভালো নাচের যে শিল্প তার সমাদর যেন কখনও না কমে, সেটা আমাদের দেখতে হবে। এবং তাতেই তরুণ শিল্পীরা হয়তো দিশেহারা হবেন না এবং অকালে হারাবেন না মূল্যবান প্রাণটুকু।

__
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by