বাহা পরব : প্রকৃতির রঙে সাঁওতালি নববর্ষের সূচনা

বাহা, বাংলা অর্থে ফুল। সাঁওতাল পরম্পরার ‘সহরাই’ পরবর্তী দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ‘বাহা’। বসন্তে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্ম প্রধান প্রকৃতির, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যাপনের উদযাপন বাহা-পরব। জঙ্গলের অভ্যন্তরে উইঢিপিগুলি ঝরে পড়া বাদামি শালপাতার চাদরে ঢাকা। শাল, মহুয়া, পিয়ালের নির্বিষ মুকুলে মৌমাছি, প্রকাণ্ড নিরবতা আর উঠোনের শূন্যতা বুকে নিয়ে এক একটি সাঁওতাল গ্রাম। সাঁওতাল জনজাতি ভারতীয় উপমহাদেশের মূলত ছোটনাগপুর মালভূমি ও পার্শ্ববর্তী গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের আদি-বাসিন্দা। বসন্ত গ্রীষ্মের সূচনা, বসন্তেই অনুষ্ঠিত হয় বাহা পরব। কোনও নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত না থাকলেও সাঁওতাল পরম্পরায় বাহা পরবের মাধ্যমে ফাল্গুন মাসেই সূচনা হয় নববর্ষের। ফাল্গুনের নবীন প্রকৃতি ও নতুন বছরকে বরণ করার উৎসব ‘বাহা’। (বাহা পরব)

প্রাচীনকাল থেকেই সাঁওতালি ধর্মীয় আচার গাছেদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে, মনে করা হয়েছে মানুষের মতই বসন্তে শাল, মহুয়া, পিয়াল, নিমেরা গর্ভবতী হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই সাঁওতালি ধর্মীয় আচার গাছেদের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে, মনে করা হয়েছে মানুষের মতই বসন্তে শাল, মহুয়া, পিয়াল, নিমেরা গর্ভবতী হয়। বাহা পরবের দু’টি বিশেষ ক্ষেত্র, প্রথমটি হল সাঁওতাল জনজাতির প্রধান ধর্মীয় স্থান, গ্রামের প্রান্তিক মুক্ত-ভূমিতে অবস্থিত ‘জাহের-থান’ এবং অপরটি সাঁওতাল বাড়ির পরিচ্ছন্ন উঠোন। নাইকি’র (গ্রামবাসীদের দ্বারা নির্দিষ্ট, ধর্মীয় আচার পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন যে বিশেষ ব্যক্তি) উপস্থিতিতে জাহের-থানে আলপনা আঁকা হয়, মূলত দুই ধরনের আলপনা, একটি বৃত্ত আঁকা হয় এবং বৃত্তের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়, অন্যটিতে দু’টি সমান্তরাল রেখা আঁকা হয়, ওই রেখা দুটিকে বিপরীত দিক থেকে একাধিক সমান্তরাল রেখা দিয়ে ভাগ করা হয়। বৃত্ত অথবা সমান্তরাল রেখাগুলি, ভাঙা আতপ-চাল দিয়ে আঁকা হয়। বাহা পরবের আলপনায় ব্যবহৃত হয় মূলত শাল এবং মহুয়া ফুল, পলাশ অথবা শিমুলের মত উজ্জ্বল রঙা ফুলের ব্যবহার বাহা-পরব পরম্পরায় দেখা যায় না। (বাহা পরব)

জাহের থানের এই আলপনার সঙ্গে বাংলার অসাঁওতাল জনজাতির, পৌষ মাসের সংক্রান্তির আগের দিন অনুষ্ঠিত পৌষ আগলের আলপনার সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। শীতে একই সময়ে ফোটে সর্ষে আর মুলো ফুল, দেখতেও একই রকম। সর্ষে ফুল হলুদ, মুলো ফুল সাদা, রাঙামাটির লাল বৃত্তে (মারুলি) নিয়ম মতো আতপ চালের গুঁড়ো সহযোগে, মাথায় একটি ত্রিভুজ এবং নিচে বর্গক্ষেত্র অবলম্বনে একটি ঘর আঁকা হয়, সেই ঘরকে সাজানো হয় সর্ষে, মুলো আর অনান্য ফুল দিয়ে। সাঁওতাল পরম্পরায় বাহা উৎসবের আলপনাটি প্রায় একইভাবে রচনা করা হয় জাহের-থানে। এখানে ঘর আঁকা হয় না, রেখা দিয়ে ঘর কাটা হয়। (বাহা পরব)

জাহের থানের ধর্মীয় আচার সম্পূর্ণ হলে, নাইকি’র সঙ্গে গ্রামবাসীরা গ্রামের দিকে রওনা দেয়। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠোনে নাইকি প্রবেশ করে, একহাতে থাকে ধাতব ঘটি, তাতে বর্ণহীন বিশুদ্ধ জল, অন্য হাতে সাঁওতালি কুলো, কুলোর মধ্যে শাল ও মহুয়া ফুল। উঠোনে একটি ধাতব থালা অথবা কাঠের পিঁড়িতে পা রাখে নাইকি, সাঁওতাল রমণী শালপাতার ঠোঙায় রাখা সর্ষের তেল ও অন্য ধাতব পাত্রে রাখা জল দিয়ে পা ধুয়ে দেয়। সাঁওতাল মেয়ের পাঞ্চির আঁচলে কুলো থেকে ফুল দান করে নাইকি, এই আচারের মাধ্যমে স্থানীয় প্রকৃতির ফুল ব্যবহারের অনুমতি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহা পরবে একে অপরকে বর্ণহীন বিশুদ্ধ জল ছিটানোর নিয়ম প্রচলিত আছে, একে বলা হয় ‘বাহা ডাক’, যা কেবল ‘লান্ডা সাগাই’ (রসিক/ঠাট্টার সম্পর্ক)-এর মানুষদের উপর ছিটানো হয়। নাইকির উপবাস ভঙ্গের উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হয় চালের তৈরি সাঁওতালি সুরা ‘রসি’। পরবর্তী বাড়ির দিকে রওনা দেয় নাইকি, গৃহস্থের মাটির উঠোনে লেগে থাকে বিশুদ্ধ জলের দাগ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ম্বরে, অনাড়ম্বর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বাহা, জাপানি ‘ওয়াবি-সাবি’ নান্দনিকতায় সরলতা ও প্রাকৃতিক শক্তির উপলব্ধির বৈশিষ্ট্য বাহা-পরবে সুস্পষ্ট। (বাহা পরব)

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ম্বরে, অনাড়ম্বর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বাহা, জাপানি ‘ওয়াবি-সাবি’ নান্দনিকতায় সরলতা ও প্রাকৃতিক শক্তির উপলব্ধির বৈশিষ্ট্য বাহা-পরবে সুস্পষ্ট।

বাহা পরবে অনুষ্ঠিত সাঁওতাল নৃত্য পরম্পরার নামও ‘বাহা’। বাহা নৃত্যের পরম্পরায় পুরুষ ও নারী উভয়েই অংশগ্রহণ করে। মাদল (তুঙদা), লাগড়ে (তামাক্), বানাম এবং বাঁশির (তিরয়ো) ব্যবহার করা হয় এই নৃত্যে। তালবাদ্য, তারযন্ত্র বা বাঁশি বাজায় পুরুষেরা, নারী নৃত্যশিল্পীরা নাচের সঙ্গে গান গায়। ফুলের গন্ধকে সাঁওতালিতে বলা হয় ‘বাহা-বাস’। অনেক সময় নাচের একটি স্তবক শেষ হলে উপস্থিত যুবকেরা পাতা বা ফুল নিয়ে নৃত্যরত তরুণীদের মুখের সামনে ঘোরায়, অথবা ফুলের সুবাস শুঁকতে দেয়, এরপর আবার ফুলের সুগন্ধে মানুষ আর তাদের ছায়ারা বাহা’র ছন্দে শুরু করে আদিম নাচ। (বাহা পরব)

Written by