“এখন আসর জমিয়েছে হিমঝুরি ফুল। ও নামটা আমারই দেওয়া নাম, ফুল তোমার চেনা কিনা জানি নে। পশ্চিমে এ গাছের খুব প্রাদুর্ভাব। লম্বাবৃন্তওয়ালা শাদা শাদা ফুল— কেবলি ঝরে ঝরে পড়চে গাছতলায়। দীর্ঘ উচু গাছ, নিমের মত পাতা, ফুলে শাদা হয়ে গেছে তার শিখর, আমার মাথার মতো। গন্ধটি সুমিষ্ট। উত্তর দিক থেকে হাওয়া দিচ্চে, কোনো কোনো গাছের পাতা ঝরে পড়তে শুরু হোলো। দিন যত এগোতে থাকে মৰ্ম্মরিত বনভূমির মধ্যে রৌদ্রের লীলা ততই লাগে ভালো। এই অবারিত প্রান্তরের মধ্যে শীতের মধ্যাহ্ন আমার কাজ ভুলিয়ে দেয়— দিকপ্রান্তের নীলিমার মধ্যে আমার মুগ্ধদৃষ্টি হারিয়ে যায়।” 
–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২২ কাৰ্ত্তিক ১৩৪১ /২১ নভেম্বর ১৯৩৪ 

হুরি যেমন সোনা চেনে, রবীন্দ্রনাথও চিনেছিলেন একে। হেমন্তকালে ভারতীয় কর্ক গাছের (Millingtonia hortensis) সুগন্ধী, সাদা ফুলগুলি ঝরে পড়ে মাটিতে। মনে হয় হিম পড়েছে। সৌন্দর্য-মুগ্ধ কবি তাই একে ডেকেছেন ‘হিমঝুরি’ নামে। রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সেই নামই আপন করে নিয়েছে বাঙালি। এছাড়া, এদেশে অনেক অঞ্চলেই একে বলে আকাশনিম। প্রকৃতিপ্রেমী কবি বিষ্ণু দে বলেছেন- ‘তাই কৃষ্ণচূড়া, তাই জারুল গোলমোরে/ অশোক বান্দরলাঠি পিয়াশাল বিজাশালে/ হিজলে সোঁদালে/ শিরীষে আকাশনীমে নানা বনস্পতি মহিরুহে/ স্বদেশ আত্মার মূর্তি।’

হেমন্তের শিশির-ভেজা প্রকৃতিতে এমনিই ফুলের সংখ্যা অনেক কম, এই ঋতুতে যে ক’টি ফুল এখনও ফুটতে দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হিমঝুরি, যা আলাদা করে হেমন্ত ঋতুকে চেনায়।

 

বাংলার প্রকৃতিতে বছরের যে সময়টিতে ফুলের উপস্থিতি বেশ কমে যায়, হিমঝুরি গাছ তখনই ফুলে ফুলে সেজে ওঠে। হেমন্তের শিশির-ভেজা প্রকৃতিতে এমনিই ফুলের সংখ্যা অনেক কম, এই ঋতুতে যে ক’টি ফুল এখনও ফুটতে দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হিমঝুরি, যা আলাদা করে হেমন্ত ঋতুকে চেনায়।

এর আদি নিবাস প্রতিবেশী মায়ানমারে। এ দেশে এসে মানিয়ে নিয়েছে আমাদের পরিবেশের সঙ্গে। হিমঝুরি গাছের কাঠ নরম। তাও কিছু আসবাব ও সজ্জার কাজে ব্যবহার আছে এর। ইন্দোনেশিয়ায় বাকলের তেতো রস থেকে জ্বরের ওষুধ বানানো হয়। এক সময় গাছের বাকল থেকে শিশি বা ছোটো বোতলের কর্ক বানানো হতো। তাই বোধহয় একে ‘কর্ক ট্রি’ বলে।

গাছটি ছায়াঘন নয় বলে রাস্তার ধারে লাগানোর অনুপযুক্ত। ‘হিমঝুরি শাখা-পরে/ চিকন চঞ্চল পাতা ঝলমল করে/ শীতের রোদ্দুরে’ (সাঁওতাল মেয়ে, রবীন্দ্রনাথ)– এর পাতার আকৃতি ডিম্বাকার, অগ্রভাগ বল্লমের ফলার মতো চোখা। হেমন্তে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে পুরো গাছ। কলি অবস্থায় ফুলটি সাদা পুঁতির মতো দেখায়। প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা নলের মাথায় পাঁচ পাপড়ি ছড়িয়ে থাকে। ফুলের ব্যাস এক ইঞ্চির মতো। পাঁচ পাপড়ির ফুলের তিনটি পাপড়ি একটু বড়ো আকারের এবং স্বাধীন। বাকি দুটি পাপড়ি সামান্য ছোটো ও একসঙ্গে লাগানো। হিমঝুরি রাতে ফোটে এবং মনোরম সুগন্ধ ছড়ায়।

খুব কম হলেও, দুই বাংলারই কিছু কিছু জায়গায় হিমঝুরির দেখা মেলে। ‘নগরে নিসর্গ’ গ্রন্থে বিপ্রদাশ বড়ূয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশপথ লাগোয়া গাছটি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন বসু এ গাছের চারাটি কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এনেছিলেন। তখন এখানে তাঁর বাসা ছিল।’ বিশেষত এই সময় শান্তনিকেতনের বিভিন্ন এলাকা হিমঝুরির সুবাসে ভরে থাকে। বোলপুরের বাসিন্দা, বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী সুজিত ঘোষ নিজের অতিথিশালার নাম রেখেছেন এই ফুলের নামে। তাঁর কথায়, “এমন নয় যে শান্তিনিকেতনে যেসব গাছ আছে তা আর কোথাও নেই। সারা দেশেই সব রকমের গাছ আছে। শান্তিনিকেতনের বিশেষত্ব, এখানে এত চমৎকার ভাবে গাছগুলি আছে যা প্রতিটি ঋতুকে চিনিয়ে দেয়। আমরা সব গাছ চিনতে পারি না। দেখিও না হয়ত। হেমন্তের এই হিমঝুরি সেরকমই একটি ফুলের গাছ।”

Written by