
কালীপুজোর গান মানে কী? পান্নালাল! এমন গান যে চোখে জল চলে আসবেই। ষাটোর্ধ্ব মীনা বাগ (নাম পরিবর্তত)। পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী। হাওড়ায় বাড়ি। গানপাগল মানুষ। এখন সবে স্মার্টফোনের ব্যবহার শিখেছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে গান খুঁজে বের করতে ততটা সড়গড় হননি। ছেলেমেয়ের সাহায্য নেন। ভীষণ ভালোবাসেন শ্যামাসংগীত। বেশি শোনেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, “ছোটোবেলায় পান্নালালের গলা চিনতে শিখেছিলাম রেডিয়োতে। বাড়িতে কালীপুজো হত। এ গান বাজলে কেমন ঘোর লেগে যেত মনে। অমন করে ‘মাগো’ বলে ডাকতে আর কে পারে?”
রিষড়ার সুভাষ হালদার (নাম পরিবর্তত)। একসময় নিজের ব্যবসা ছিল। আজ আর নেই। মেনে নিতে হয়েছে আকস্মিক অবসর। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ। এখন জানলার ধারেই কাটে দিনের অনেকটা সময়। সঙ্গী গান আর বালিশের তলায় রামপ্রসাদের গানের চটি বইখানা। একবার ট্রেন থেকে কিনেছিলেন। এই বই তাঁর বন্ধু, প্ৰিয় সখা। একই বই। একই গান। একই গানের লাইন। তবু প্রতিদিন পড়ে চলেন। কেন? ভাঙা গলায় বৃদ্ধ উত্তর দেন, “গীতবিতান যদি হয় আমার রামায়ণ-মহাভারত, তাহলে এ বই আমার গীতা।”
চল্লিশের দশক থেকে শ্যামাসংগীতের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। পান্নালালের কণ্ঠের মরমিয়া মায়া, সারল্য তাঁকে করে তুলেছিল আমজনতার ঘরের লোক। তাঁর নিজের জীবনের শুরুর পথ ছিল বেদনাজারিত। পিতৃহীন পরিবারে দেখেছিলেন প্রবল দারিদ্র, অনিশ্চয়তা। তাই শুরু থেকেই গানের ‘মা’ ডাকে হয়তো তাঁর এমন আকুতি।
কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন। সাধক আর কবি-দুই বিশেষণ-ই মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে তাঁর নামে। ২৪ পরগনা জেলার কুমারহট্ট, এখনকার হালিশহরে বাংলার ১২২৯ সনে বৈদ্য বংশে রামরাম সেনের ঔরসে তাঁর জন্ম। বাগবাজারে দুর্গাচরণ মিত্রর কাছারিতে ৩০ টাকা বেতনে মুহুরির কাজ করতেন। কিন্তু স্বভাব কবি রামপ্রসাদের হিসাব নিকাশের কাজে মন লাগত না। মায়ের নাম, মায়ের পদ আর নিজের ভিটের জন্য কাতর হতেন। কথায় বলে ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’! বাড়ির অভাব বিবাহযোগ্যা কন্যার চিন্তা তাঁকে বন্দি করে ফেলেছিল কাছারি ঘরের ঘেরাটোপে।
কিন্তু যে দড়ি ছেঁড়ার সে তো ছিঁড়বেই। একদিন বেখেয়ালে খাজনার পাকা খাতায় লিখে ফেললেন ‘আমায় দে মা তবিলদারী, আমি নিমক-হারাম নই শঙ্করী’। হিসাবের খাতায় গান লেখার অভিযোগে ভেবেছিলেন কড়া শাস্তি হবে। জমিদারের ‘আপিস’ থেকে চাকরির ছুটি হয়েও গেল। কিন্তু তাঁর গানে মুগ্ধ দুর্গাচরণবাবু তাঁকে মাসিক ভাতা আর ভাইয়ের চাকরির বন্দোবস্তু করে দিলেন। হালিশহরে ফিরে গিয়ে মায়ের কাজে মন দিলেন কবি।
১৭৩৯-এর মহাপ্লাবন, ১৭৪২-এর বর্গীহানা, ১৭৫৭-র পলাশীর যুদ্ধ আর ১৭৬৯-এর মন্বন্তর দেখেছিলেন রামপ্রসাদ। লিখেছিলেন, ‘অন্ন দে গো, অন্ন দে গো, অন্ন দে গো, অন্নদা’। মায়ের কাছে ক্ষুধায় অন্ন চায় সন্তান। চায় আশ্রয়। তাই ভারতচন্দ্রের ঈশ্বরী পাটনি অন্নপূর্ণার কাছে চেয়েছিলেন – সন্তানকে অন্নে সুরক্ষিত থাকার বর। জীবনের কঠিন সময় আর কঠিনতম সত্যকে গানে বেঁধেছিলেন রামপ্রসাদ। সে গান হয়ে উঠেছিল মাটির মানুষদের ভাষা।
রামপ্রসাদের গানকে কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। আম বাঙালির ‘পান্নালাল’। শ্যামা সংগীতের দিক পুরুষ। দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর ইচ্ছেতেই তিনি ভক্তিগানের জগতে আসেন। শ্যামাসংগীত গাওয়ার পর আর কোনও গান কণ্ঠে নেননি কখনও। তাঁর মেজদা ভক্তিগানের দিকপাল ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য নিজে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানিতে সুপারিশ করেছিলেন। পান্নালালের গানের সংখ্যা আর জনপ্রিয়তা যত বেড়েছিল তত প্রবল হয়েছিল মাতৃ দর্শনের আকুলতা। ভবতারিণীকে দেখার জন্য কাঁদতেন, শ্মশানে শ্মশানে ঘুরতেন। তাঁর মা ডাকের আর্তি আকুল করেছিল মানুষকে।
শ্মশানবাসিনী কালিকা শাক্ত বাঙালির ‘কালো মেয়ে’, ‘আদরিনী শ্যামা মা’। ঈশ্বর-ভক্তের আধ্যাত্মিক সম্পর্কে লেগেছে বাৎসল্য রসের আটপৌরে মানবী মায়া। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অভাব, অভিযোগ, মান, অভিমান মাকে ঘিরেই। আর সেই কারণেই রামপ্রসাদী শ্যামাসংগীত আজও সকলের গান। এ গানের কোনও রাজা-প্রজা নেই! মাঝিমাল্লার গলা থেকে ঠাকুরঘরের গানে ফিরে বেড়ায় কথার আবেদন।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে গানের ট্রিটমেন্ট, সাধকের সাধনসংগীতে রক মিউজিকের ছোঁয়া লেগে হয়ে উঠেছে এই প্রজন্মের ‘মোটিভেশনাল সং’। হয়ে উঠেছে বাস্তবের গরম উত্তাপ সইয়ে নেওয়ার জোর।
শাক্তকবি রামপ্রসাদ তাঁর সহজিয়া ভাবনায় লিখেছিলেন, ‘সংসারে ডরি কারে, রাজা যার মা মহেশ্বরী।/ আনন্দে আনন্দময়ীর খাসতালুকে বসত করি।।’ পরাধীন জাতি স্বাধীনতা পেয়েছিল দেশভাগের দামে, মন্বন্তর, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু শিবিরের স্মৃতি তখনও দগদগে। নিদারুণ অসহায়তায় তাদের কামনা ছিল মায়ের কোলের মতো নিরাপদ কোনও আশ্রয়। যে মায়ের কাছে নেই কোনও দ্বেষবিভেদ। এক অপার স্নেহ। রামপ্রসাদ সেনের জীবনের অনেক প্রামাণ্য তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল বহুদিন। স্ট্যাটিসস্টিক্যাল সার্ভে অব বেঙ্গল-এর দ্বিতীয় খণ্ডে তাঁর পরিচয় মেলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রর সভাসদ হিসাবে- আ স্যানস্ক্রিট স্কলার। রামপ্রসাদ তুলে ধরেছিলেন তাঁর সমকালের কান্নার স্বর। সময় বদলালেও মানুষের কান্না থেকে যায় একই।
চল্লিশের দশক থেকে শ্যামাসংগীতের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠেন পান্নালাল ভট্টাচার্য। অবশ্যই তাঁর দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যও ছিলেন প্রবলভাবে। কিন্তু পান্নালালের কণ্ঠের মরমিয়া মায়া, সারল্য তাঁকে করে তুলেছিল আমজনতার ঘরের লোক। তাঁর নিজের জীবনের শুরুর পথ ছিল বেদনাজারিত। পিতৃহীন পরিবারে দেখেছিলেন প্রবল দারিদ্র, অনিশ্চয়তা। তাই শুরু থেকেই গানের ‘মা’ ডাকে হয়তো তাঁর এমন আকুতি।
২০২৫-এ দাঁড়িয়েও সেই ছবি বিশেষ বদলায়নি। গানের জগতে ঘটেছে ডিজিটাল বিপ্লব। জীবনযাত্রার গড়ন ধরনের সঙ্গে আমূল বদল ঘটেছে মানুষের গান শোনার অভ্যাসেও। কিন্তু বদলায়নি অন্ন চিন্তা। একাল দেখেছে অতিমারীর দাপট, মৃত্যু মিছিল, বিপন্নতা। টিকে থাকার দৌড়, প্রতিযোগিতা, অবিশ্বাস, সন্দেহের তীর ডানায় বিঁধে অভ্যেস করে নিয়েছে দিশাহীন জীবন! অভিমানে কাঁদে মানুষ কার কাছে! কার কাছে জানায় নালিশ? তবে দুঃখের বাতিখানি সে আজও জ্বালিয়ে রাখে। দিন ফুরোলে নিবেদন করে আরাধ্যর কাছে। জিজ্ঞাসা করে এ ব্যথার শেষ? আপাত অভিব্যক্তিহীন কোনও মধ্য কুড়ির হেডফোনে বেজে চলে, ‘কালী নামের দাও রে বেড়া ফসলে তছরূপ হবে না, সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া/ তার কাছেতে যম ঘেঁষে না’। জীবনের কোনও দুঃস্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে একজন কবি, একজন গাইয়ে তাকে শোনায়, ‘নাইকো জরিপ জমাবন্দি, তালুক হয় না লাটে বন্দি…’। এই গান যেন বলে চোখ রাঙানির দুনিয়াতে দুর্বলের কুঁকড়ে বাঁচাই সার নয়, এ অবাধ দুনিয়া সকলের।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে গানের ট্রিটমেন্ট, সাধকের সাধনসংগীতে রক মিউজিকের ছোঁয়া লেগে হয়ে উঠেছে এই প্রজন্মের ‘মোটিভেশনাল সং’। হয়ে উঠেছে বাস্তবের গরম উত্তাপ সইয়ে নেওয়ার জোর। কারণ শব্দের আবেদনকে এড়ানো যে দুঃসাধ্য। আজও বাঙালির কালীপুজোর সূচনা হয় পান্নালালকে দিয়েই। বাঙালি এ ধন হারাবে কীভাবে!

