
পর্ব ২২
নব্বই-দশকের শেষ লগ্নে কোনও এক সংখ্যা ‘সানন্দা’ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে অপর্ণা সেন লিখেছিলেন বেঁটে, টাক-মাথা, মুখভরা পানের সেই বৃদ্ধ লোকটার রাধা চরিত্রে অভিনয় দেখে তিনি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন। নৃত্যশিল্পী দেখতে সুন্দর হবে, যৌবনের মানুষ হবে বলে আমাদের যে ধারণা ইনি তো তার উল্টো। অথচ মঞ্চে যখন তিনি শ্রীরাধিকার বিরহ, বেদনা কিংবা প্রেমাভিলাষ অভিনয় করে দেখাচ্ছেন তখন ভুল হয়ে যাচ্ছে ইনি সত্যিই শ্রীমতী রাধারানী নন তো! গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র (Guru Kelucharan Mohapatra) এমনই এক শিল্পী ছিলেন। গত ৮ জানুয়ারি ওঁর ৯৮তম জন্মবার্ষিকী পালিত হলো।

ওডিসি নৃত্যের গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র (Odissi Dance Guru Kelucharan Mohapatra) কী মাপের শিল্পী ছিলেন তা আমরা সকলেই জানি। হাতে-গোনা, দিকপাল যেসব শাস্ত্রীয়নৃত্য শিল্পী সমগ্র পৃথিবীতে নাম করেছেন এবং নাচের বাইরেও যাঁদের বহু মানুষ চেনেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র। তাঁর নৃত্যশিল্পী হিসেবে, গুরু হিসেবে যা ব্যাপ্তি তা খুব কম শিল্পীর জীবনে প্রাপ্তি হয়। কিন্তু আমি, তাঁর নৃত্যশিক্ষার যে পদ্ধতি এবং তাঁর ছাত্রছাত্রীদের যে অমলিন শ্রদ্ধা তাঁর রাতুল চরণে বরাবর, সেই দিকগুলির প্রতি আকৃষ্ট থেকেছি। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র ওডিসার নৃত্যশিল্পের দিকপাল শিক্ষক। কিন্তু তাঁর ছাত্রভাগ্য অসামান্য। সেই যে সত্তরের দশকে তিনি কলকাতার পদাতিক আর্টস সেন্টারে ওডিসি নৃত্যের ওয়ার্কশপ শুরু করেছিলেন আর অনেকগুলি বাঙালি মেয়ে তাতে যোগ দিয়েছিল, সেটা গুরুজির যে বিশেষ শৈলির নৃত্য তাকে অনেকটা জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছিল, এ নিয়ে আজ আর কোনও সন্দেহ নেই। একজন গুরুর সংযুক্তা পাণিগ্রাহীর মতো ছাত্রী তো ছিলই, সেই সঙ্গে শুধু কলকাতা থেকেই কৃষ্ণা নন্দী, সুধা দত্ত, সুতপা তালুকদার, শর্মিলা বিশ্বাস, পৌষালী মুখার্জি, দীপান্বিতা রায়, রিনা জানা, নন্দিনী ঘোষাল, দেবমিত্রা সেনগুপ্ত, মায়া ভট্টাচার্য, কাকলি বোস, রাজীব ভট্টাচার্য, অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়, কৃষ্ণেন্দু রায়, ডোনা গাঙ্গুলি, রঘুনাথ দাস, সুবিকাশ মুখার্জি, শিবনারায়ণ ব্যানার্জি কিংবা সায়োমিতা দাশগুপ্তের মতো এক ঝাঁক ছাত্রছাত্রী ছিল, সেটা আজ ভাবলে অবাক হতে হয়। আজও নিরলসভাবে কলকাতার ওডিসি ডান্স ফোরাম (Odissi Dance Forum Kolkata) প্রতি বছর গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রকে সম্মান জানিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান করে চলেছে।

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র প্রফেশনাল নৃত্যগুরু ছিলেন, নাচ শিখিয়েই তাঁর গ্রাসাচ্ছাদন চলতো এটা ঠিক, কিন্তু টাকা-পয়সা বা অর্থের ব্যাপারে তিনি উদাসীন ছিলেন। নাচের আগে তিনি কখনওই অর্থকে স্থান দিতেন না। ছাত্রছাত্রীদেরও ভীষণ পরিমাণ ছাড় দিতেন। যে যেভাবে বিকশিত হতে চাইতো উনি এগিয়ে দিতেন।
উনি যেমন ছাত্রছাত্রী তৈরি করেছেন এবং সেই পথে ওঁর ছাত্রছাত্রীরা ওডিসি-অনুগতপ্রাণ যতো ছাত্রছাত্রী তৈরি করে চলেছেন, তাতে মনে হয় না এই বঙ্গে এই নৃত্যশিল্পের জনপ্রিয়তায় আগামী একশো বছর কোনও ভাটা পড়বে। আমাকে আরও অবাক করে তাঁর শিক্ষনপদ্ধতি। সত্তরের দশকে উনি যেভাবে প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে পড়ে থাকতেন একেকটি হস্ত-পদ ঠিক করবেন বলে, নব্বইয়ের দশকে এসেও সেই শেখানোতে তাঁর কোনও ক্লান্তি ছিল না। সবার আগে উনি ওডিসিনৃত্য পদপ্রার্থীর চৌকা (ওই নাচের একটি আঙ্গিক) ঠিক করতেন। আজকাল বডি-কন্ডিশনিং যাকে বলে সেসবের পরাকাষ্ঠা ছিলেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র। আর ছিল তাঁর গুরুকুল। কটকে আর ভুবনেশ্বরে তাঁর বাড়িতে থেকে শিখতে হতো। ভোরবেলা উঠতে হতো, বাড়ির কাজ করতে হতো আর তারপর শুরু হতো প্র্যাকটিস। এই অভিজ্ঞতার কথা আমি যখনই জানতে চেয়েছি সুতপাদি (তালুকদার), রিনাদি (জানা), দেবমিত্রাদি (সেনগুপ্ত), রাজীবদা (ভট্টাচার্য), রঘু, সায়োমিতা কিংবা সুবিকাশের মুখ চিকচিক করে উঠতে দেখেছি। ওঁরা বলতেন সেই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা।

সারাদিন, নিরলস প্র্যাকটিস তো চলতোই এছাড়াও যখনই নতুন কোনও কম্পোজিশন তাঁর মাথায় আসত সে ভোর চারটে হোক বা রাত দশটা, তিনি নাচ তোলাতে শুরু করে দিতেন। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র প্রফেশনাল নৃত্যগুরু ছিলেন, নাচ শিখিয়েই তাঁর গ্রাসাচ্ছাদন চলতো এটা ঠিক, কিন্তু টাকা-পয়সা বা অর্থের ব্যাপারে তিনি উদাসীন ছিলেন। নাচের আগে তিনি কখনওই অর্থকে স্থান দিতেন না। ছাত্রছাত্রীদেরও ভীষণ পরিমাণ ছাড় দিতেন। যে যেভাবে বিকশিত হতে চাইতো উনি এগিয়ে দিতেন। সেটা তো আজও সত্যি। আপনি ইউটিউবে যান, দেখবেন ওডিসির মতো আর কোনও শাস্ত্রীয়নৃত্যের গান-বোল বা আইটেমের ভিডিও চারিদিকে ছড়িয়ে নেই। যে কোনও লোকের কাছেই ওডিসির সব আইটেম আছে। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র কিছু কুক্ষিগত করে রেখে যাননি। রাখবেনই বা কেন, উনি তো জানতেন একই নাচ তাঁর হাতে-গড়া একজন ছাত্র নাচবে আর ওঁর সেই প্রখ্যাত ট্রেনিং ছাড়া আরেকজন, দর্শক অচিরেই বুঝে ফেলবে পার্থক্য কোথায়। আরেকটি জিনিস খুবই লক্ষ্যণীয়- ভারতবর্ষে সংগীত হোক আর নৃত্যশিল্প, গুরুদের সব বিদ্যা কেবল আপন সন্তানদের দিয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এটা সম্পত্তি পাওয়ার মতো বংশগত প্রাপ্তি বলে তাঁরা মনে করতেন। নিন্দুকে বলবে ‘নেপোটিসম’। কিন্তু এরও ব্যতিক্রম বুঝি গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র। নিজের পুত্র রতিকান্ত মহাপাত্রকে তিনি যেভাবে নৃত্যশিক্ষায় লালন করেছেন অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের তার থেকে বিন্দুমাত্র কম যত্নে পালন করেননি। সে-কারণে তাঁর উত্তরাধিকার যতোটুকু রতিকান্ত মহাপাত্র কিংবা সুজাতা মহাপাত্রের ঠিক ততোটাই অন্য সকল ছাত্রছাত্রীদের। যাঁদের মধ্যে অন্যতম কলকাতার সেই ছেলেমেয়েগুলো।

গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র একজন মহীরূহ। ওডিসি নৃত্যের শরীর থেকে প্রাচীণতার বল্কল সরিয়ে তিনি তাকে বিশ্বজনীন করে তুলে ছিলেন। কিন্তু তাঁর বেড়ে ওঠা, ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস থেকে বাঙালি ছেলেমেয়েদের নাম আর কাহিনিগুলো যেন কখনও বাদ না পড়ে নৃত্যালোচক-সমালোচক-ইতিহাসবিদদের সেটা সব সময় মাথায় রাখতে হবে।
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

