
কলকাতার দুর্গাপুজো এখন পৃথিবীর মানচিত্রে অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যের জায়গা। কর্পোরেট হাউজের কথা যদি বাদও দিই, আপাত অর্থে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের রোজগার করার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে কলকাতার দুর্গাপুজো। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক দিক। দুর্গাপুজোকে ভিত্তি করে যা যা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা, তা প্রত্যেকটিই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই জাঁকজমকের পিছনে যে মূল ‘ভক্তি’, তা কি ক্রমশ হ্রাস পেয়েছে?
গত কয়েকবছরে কলকাতার দুর্গাপুজো – শিল্প প্রদর্শনের একটা বড়ো রূপ নিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ‘পাবলিক আর্ট এক্সজিবিশন’। এই পুজো-শিল্প শুধুমাত্র ক্লাব বা শিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, শিল্পকে ভিত্তি করে নতুন ব্যবসা, অর্থ বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডভ্যালু, সর্বোপরি চোখ ধাঁধানো প্রতিযোগিতার নির্মাণ হয়েছে অত্যন্ত সুচারু ভাবে।
ম্যাডক্স স্কোয়ার ২০২৫
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বন। খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এর প্রায় প্রত্যেকটিই নির্দিষ্ট ধর্ম কিংবা চিরাচরিত প্রথাকে কেন্দ্র করে; এবং যার মূল ভিত্তিই ভক্তি। গত কয়েকবছরে কলকাতার দুর্গাপুজো – শিল্প প্রদর্শনের একটা বড়ো রূপ নিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ‘পাবলিক আর্ট এক্সজিবিশন’। এই পুজো-শিল্প শুধুমাত্র ক্লাব বা শিল্পীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, শিল্পকে ভিত্তি করে নতুন ব্যবসা, অর্থ বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডভ্যালু, সর্বোপরি চোখ ধাঁধানো প্রতিযোগিতার নির্মাণ হয়েছে অত্যন্ত সুচারু ভাবে। নিঃসন্দেহে এতে লাভ বই ক্ষতি হয়নি। কিন্তু বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর আবহ থেকে হারিয়ে গিয়েছে ভক্তি।
ভক্তি বনাম শিল্পের এই দ্বন্দ্বের কথা মানতে নারাজ অনেকেই। অনেকেরই মত, ভক্তির সঙ্গে শিল্পের কোনো বিরোধ নেই। এই সমাজ পরিবর্তনের চাকা যেদিকে যেভাবে ঘুরেছে; মানুষ তার মতো করে উৎসব, আনন্দ ও সামাজিক রীতিনীতি প্র্যাক্টিস করতে থেকেছে। অর্থাৎ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের বসিয়ে ফেলা। কিন্তু এতকিছুর পরেও প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়কে কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। ফলত গত কয়েক বছরে প্রকাশ্যে এসেছে এক ক্লাবের সঙ্গে আরেক ক্লাবের বিরোধ, খাটো করে কথা বলা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, পুরষ্কারপ্রদানকারী কোম্পানিকে বয়কট ঘোষণা এবং টাকা দিয়ে ঠাকুর দেখা।
‘ঠাকুর দেখা’ শব্দবন্ধটিকে পাঠক লক্ষ্য করবেন। এখনও কলকাতার এক অংশের মানুষ ‘ঠাকুর দেখতে যান’। ঠাকুর দেখতে যাওয়ার মধ্যে যে অনাবিল আনন্দ তা এককালে প্রকৃত উৎসবের অংশ হিসেবে পরিগণিত হত। কিন্তু এখনকার দর্শক শুধু ঠাকুর দেখতে যান না, আর্ট ইন্সটলেশন কিংবা থিম দেখতেও যান। এবং অনেকেরই মত তাঁরা কিছু বুঝতে পারছেন না। বুঝতে পারা, না-পারা খুবই ব্যক্তিগত ও আপেক্ষিক। কিন্তু যেহেতু এটিকে পাবলিক আর্ট ইন্সটলেশন বলা হচ্ছে, তাই শিল্পীদের কিছু সার্বিক দায়িত্ব থেকেই যায়। উৎসব যদি জনগণের হয়, তাহলে জনগণের কথা মাথায় রেখেই একটি শিল্প-নির্মাণ হওয়া উচিত। হয়তো বা সেই জায়গায় কোথাও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। যেখানে শিল্পের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের কথা, সরাসরি কথোপকথন তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে কি তা আদৌ হচ্ছে? নাকি পুজো-শিল্প চর্চা হয়ে উঠছে একাংশের, বিশেষত পুরষ্কারপ্রদানকারী কোম্পানিগুলোর জন্যই নির্মিত হচ্ছে বহুবর্ণ থিম? এ-প্রশ্ন আজ অনেকেরই।
শিল্পের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের কথা, সরাসরি কথোপকথন তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে কি তা আদৌ হচ্ছে? নাকি পুজো-শিল্প চর্চা হয়ে উঠছে একাংশের, বিশেষত পুরষ্কারপ্রদানকারী কোম্পানিগুলোর জন্যই নির্মিত হচ্ছে বহুবর্ণ থিম?
অর্জুনপুর আমরা সবাই ২০২৫
লাইভ আর্ট বা পারফর্মেন্সের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগ খুবই পুরনো একটা প্রথা। কিন্তু যেখানে সরাসরি সংযোগের বদলে ফাঁক থেকে যাচ্ছে এবং সুনির্দিষ্ট ক্লাবকর্তারা দক্ষতার সঙ্গে তা এড়িয়ে চলেছেন, একে কি প্রকৃতপক্ষে জনগণের উৎসব বলা যায়? এসব প্রশ্ন, সমাজের সমস্ত অন্দরমহলে জট পাকাচ্ছে। শিল্পী আর কারিগরদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে শিল্পের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতাগুলি সময়ের দাবিকে আড়াল করে চলেছে। দুর্গাপুজো-শিল্প যদি শুধুমাত্র শিল্পীদের নিজস্ব শিল্প-প্রকাশের মাধ্যম হয়, তাহলে তাতে ফাঁক আছে বৈকি! ভক্তি সেখানে আপাত অর্থে ম্লান। জনগণের উৎসবে জনগণের কথাই যদি শেষ না হয়, তবে টিকিট কেটে পুজো দেখিয়ে কি এটাই প্রমাণ হয় না যে, বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবে কেন স্বচ্ছল বা উপরের শ্রেণির মানুষরাই ‘এক্সক্লুসিভ’ ঈশ্বর দর্শনের সুযোগ পাবেন! আর যাদের সামর্থ্য নেই, তাঁরা লক্ষ ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে ‘শিল্প’ দেখবেন মাত্র দুই মিনিটে। এই বিভাজন কি বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব চেয়েছে কোনোদিন?
___________________
মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ-লেখার উদ্দেশ্য নয়।

