
মানুষ শব্দের প্রথম অক্ষর ‘মা’। মা সকল সৃষ্টির উৎস, তাই মায়ের পুজো আসলে মানবতার মহোৎসব। বাংলা ক্যালেন্ডারে আশ্বিন মাস আসার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোর তোড়জোড়। কুমোরটুলির ব্যস্ততা তো আছেই, তাছাড়াও গ্রামে গ্রামে কোথাও তৈরি হচ্ছে প্রতিমার সাজ, অস্ত্রশস্ত্র তো কোথাও প্রতিমার চুল। মণ্ডপ-শিল্পীরা ব্যস্ত তাঁদের শিল্পের সর্বোত্তম প্রকাশের জন্য। পাড়ার মোড়ের দর্জির দোকান হোক বা নামজাদা আধুনিক শপিং মল, সবাই এখন ব্যস্ত ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক সরবরাহের জন্য। এই বিপুল আয়োজনে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সমাজের সকল ধর্ম, বর্ণ। বাঙালির একান্ত আবেগের এই পুজো আক্ষরিক অর্থেই সর্বধর্মের মিলনমেলা। আর সে কারণেই বাংলার দুর্গাপুজো হয়েছে বিশ্বনন্দিত, অর্জন করেছে ইউনেস্কোর অনন্য সম্মান। দুর্গাপুজো সকলের উৎসব হয়ে উঠেছে।
অধ্যাপিকা তপতী গুহ ঠাকুরতা বঙ্গদর্শন.কমকে জানান, “দুর্গাপুজো শুধু পুজো নয়, সামাজিক উৎসব। বাংলায় বারোয়ারি পুজোর সময় থেকে তো বটেই, কিন্তু তার আগে থেকেও বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও নানা সম্প্রদায়ের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে নানা কাজের মাধ্যমে যুক্ত হতেন।”
অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলির ফুল হাতে নিয়ে বিভোর হয়ে বা ঢাকের তালে আরতির সময় ধুপ ধুনোর সুগন্ধে তন্ময় হয়ে আমরা চেয়ে থাকি সুসজ্জিতা দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গার দিকে। তবে যাদের হাতে একটু একটু করে অবয়ব পান দেবী, যাদের তৈরি গয়না পরে সাজেন, যাদের হাতে বানানো অস্ত্র তুলে নেন নিজের হাতে, একঢাল খোলা চুলে আরও বাড়িয়ে তোলেন নিজের সৌন্দর্য, তাদের পুজো শুরু হয় ঢাকে কাঠি পড়ার অনেক আগে থেকেই। কলকাতার কুমোরটুলি বা অন্যান্য জায়গার পালপাড়ায় ঘরে ঘরে কন্যা উমা জন্ম নেয় তার মৃৎশিল্পী বাবা-মায়ের যত্নে। শুধু মৃৎশিল্পী বাবা মায়েরাই নন, উমার মৃন্ময় রূপ গড়ে তোলার সূচনালগ্নে মাটি দান করেন সেই মায়েরা, সমাজ যাদের দিয়েছে পতিতার তকমা।
সেই নিষিদ্ধপল্লির মাটি গায়ে মেখেই যখন একটু একটু করে গড়ে উঠতে থাকে দেবীর অঙ্গ, তখন হাওড়া জেলার জগদ্বল্লভপুর ব্লকের পার্বতীপুর গ্রাম ব্যস্ত থাকে দেবীর কেশসজ্জার আয়োজনে। বিভিন্ন জায়গা থেকে সাদা পাট সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তা প্রয়োজনমতো কালো, সোনালি, বাদামী ইত্যাদি রঙে রাঙিয়ে প্রতিমার সৌন্দর্যের উপযুক্ত করে তোলার কাজে একই সঙ্গে হাত লাগান গ্রামের হিন্দু-অহিন্দু সকল সম্প্রদায়ের মানুষ।
হাওড়া জেলার আরেকটি গ্রাম গুটিনাগোড়ীর ঘরে ঘরে বছরভরই ব্যস্ততা তুঙ্গে। পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য স্বর্গের দেবতারা দুর্গাকে নানা অস্ত্র ও অলংকারে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মাটির পৃথিবীতে, মাটির দুর্গা মণ্ডপে মণ্ডপে সেজে ওঠেন গুটিনাগোড়ীর অধিবাসীদের হাতে বানানো গয়নায়, তাঁর রণসজ্জা সম্পূর্ণ হয় এই গ্রামের ভূমিপুত্রদের বানানো অস্ত্রে। সেই অস্ত্রের ধারে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় ঠুনকো জাতপাত।
বাংলায় এই মাতৃপূজার প্রচলন কবে থেকে হয়েছিল? কীভাবেই বা এই পুজো ধর্মের বেড়াজাল টপকে হয়ে উঠলো মহোৎসব? এই ইতিহাস জানতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে কয়েক শতক আগের অবিভক্ত বঙ্গে। বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রচলন ঠিক কবে হয়েছিল তা নিয়ে মতান্তর আছে। অনেকে মনে করেন ষোড়শ শতকের শেষভাগে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী জেলার তাহেরপুর গ্রামে জমিদার কংসনারায়ণ তাঁর গড়ে বাংলার প্রথম দুর্গাপুজো করেন। আবার অনেকের মতে নদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার ১৬০৬ সালে তাঁর তৎকালীন রাজধানী বাগোয়ান গ্রামে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। কলকাতার প্রথম দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় ১৬১০ সালে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবারে। এরপর অনেক ঘটনার মধ্যে দিয়ে এই পুজো পারিবারিক গণ্ডি অতিক্রম করে প্রথমে বারোয়ারি ও তার পরে হয়েছে সর্বজনীন।
ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক গৌতম বসুমল্লিক জানাচ্ছেন, “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব থাকে। সাধারণ ভাবে সেই উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক হয়। দুর্গাপুজো এই ধর্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।”
ব্যয়বহুল এই পুজো একসময় ছিল ধনীদের বৈভব প্রদর্শনের ক্ষেত্র। এই বৈভব প্রদর্শনের অন্যতম উপায় ছিল দরিদ্র ভোজন। এই প্রসঙ্গে কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের অধ্যাপিকা তপতী গুহ ঠাকুরতা বঙ্গদর্শন.কমকে জানান, “দুর্গাপুজো শুধু পুজো নয়, সামাজিক উৎসব। বাংলায় বারোয়ারি পুজোর সময় থেকে তো বটেই, কিন্তু তার আগে থেকেও বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও নানা সম্প্রদায়ের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে নানা কাজের মাধ্যমে যুক্ত হতেন। এই বনেদি পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দরিদ্রভোজন। এই দরিদ্রভোজনের সময় বা ঠাকুর দেখার উদ্দেশ্যে বহু মানুষ দুর্গাপুজোর সময়ে বনেদি বাড়ির আঙিনায় মিলিত হতে পারতেন।”
যুগ বদলেছে, বদল এসেছে শারদীয়া উৎসবেও। ধনীদের বৈভবের প্রতিযোগিতা এখন বদলে গেছে ক্লাবের উদ্যোক্তাদের থিমের প্রতিযোগিতায়। এই প্রসঙ্গে তপতী গুহ ঠাকুরতা জানান, “এখন মানুষজন শুধু নিজের পাড়ায় নয়, সারা শহর জুড়ে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে। ফলে পুরো শহরটাই এই সময় বৃহত্তম প্রদর্শনশালায় রূপান্তরিত হয়। এই প্রবণতা অন্য শহরে, অন্য কোনো উৎসবকে ঘিরে দেখা যায় না।” এই শতাব্দীর গোড়া থেকে প্রায় দীর্ঘ দশ বছর গবেষণা করেছেন তপতী, তাঁরই ফলশ্রুতি তাঁর লিখিত ‘ইন দ্য নেম অফ দ্য গডেস’ (In the Name of the Goddess) গ্রন্থ। এই প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানালেন, দেবীর পুজোকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে। অনেক মানুষের জীবন জীবিকা জুড়ে রয়েছে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। পুজোর সময় বিভিন্ন ছোটো-বড়ো অনেক অস্থায়ী দোকান গড়ে ওঠে। ফলে কিছু মানুষ বছরে বাড়তি রোজগারের আশায় পুজোর দিকে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই সর্বজনীন পুজো বিভিন্ন দলের জনসংযোগের মঞ্চেও পরিণত হয়েছে।
দুর্গোৎসবের সামাজিক দিক সম্পর্কে আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক গৌতম বসুমল্লিক জানাচ্ছেন, “প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব থাকে। সাধারণ ভাবে সেই উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক হয়। দুর্গাপুজো এই ধর্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে বৃহত্তর সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও, দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী রূপ ছাড়াও এই পুজোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই পুজো মূলত কৃষিজীবী মানুষের পুজো। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নানের প্রথাই এই শস্য পূজার প্রতীক। তাই জাতপাতের ঊর্ধ্বে এই পুজো আদতে কৃষিজীবী মানুষের উৎসবও বটে। পরে সময়কালীন বিভিন্ন পরিবর্তন জুড়ে দুর্গাপুজো আজকের রূপ পেয়েছে, সেখানেও ধর্মকেন্দ্রিকতাকে ছাপিয়ে এই পুজোতে উৎসবই প্রধান।”
শিশুর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় মায়ের কোল। বাঙালিও যখন সামাজিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে তখনই সুরক্ষা পেতে আদিশক্তি মহামায়াকে ‘মা’ ডেকে তার কৃপাপ্রার্থী হয়েছে। একসময় আকাশবাণীর বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-তেও একজন অব্রাহ্মণ ব্যক্তির চণ্ডীপাঠ করাকে কেন্দ্র করে নাকি আপত্তি উঠেছিল তৎকালীন গোঁড়া হিন্দু সমাজের মধ্যে। তার ওপরে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন অহিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু সমস্ত গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে এই অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা আজ প্রশ্নাতীত। সময় যত এগিয়েছে, কলকাতা তথা সারা বাংলার পুজো ততই হয়ে উঠেছে মানবতার উৎসব। তাই বলা যায়, আনুষ্ঠানিক পুজোর মন্ত্র যাই হোক না কেন, বাংলার দুর্গোৎসবের আসল মন্ত্র, “সবার উপরে মানুষ সত্য”।

