‘অবাঙালি’ শিল্পীরা আমায় বুঝিয়েছিলেন, রবীন্দ্রসংগীতের প্রকৃত মহিমা

চোখ বুজে ছবিটা ভাবার চেষ্টা করুন। কলকাতার (Kolkata) এক রেকর্ডিং স্টুডিওতে মাইকের সামনে স্বর্গত ডঃ এম. বালমুরলীকৃষ্ণ (M. Balamuralikrishna), ভারতের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কর্ণাটকীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী, গাইছেন ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ এবং ‘আগুনের পরশমণি’। স্তব্ধ হয়ে শুনছে গোটা স্টুডিও, আবেগে চোখ ভিজে এসেছে পোড় খাওয়া মিউজিক অ্যারেঞ্জার এবং সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদেরও। এত নিখুঁত তাঁর গায়কি, প্রতিটি সুর নির্ভুলভাবে বিঁধছে ছুরির মতো, গানের প্রতিটি কথা পাচ্ছে তার যথার্থ মাত্রা। বলা বাহুল্য, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছি আমিও। সেই সময়ে সেই স্থানে আমি উপস্থিত, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হবে?

আমাদের কলকাতার স্টুডিওতে ডঃ এম. বালমুরলীকৃষ্ণ




ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণের গাওয়া ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’

সন ২০০৪, এক প্রখ্যাত কর্পোরেট সংস্থা আমাকে দায়িত্ব দেয়, ভারত ও বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিল্পীদের নিয়ে একটি রবীন্দ্রসংগীতের (Rabindra Sangeet) অ্যালবাম করার। উদ্দেশ্য, ‘শান্তিনিকেতন শিশুতীর্থ’ নামে একটি শিশুনিবাসের জন্য অর্থ সংগ্রহ। শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত মান্না দে, ইন্দ্রনীল সেন, অদিতি মহসিন, সনজিদা খাতুন, লাইসা আহমেদ লিসা, এবং ইফফাত আরা দেওয়ান।

আমার ইচ্ছে, প্রথিতযশা এই শিল্পীদের মাঝে এমন দু-একজনও থাকুন, যাঁরা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে একেবারেই পরিচিত নন। মান্নাবাবু অসম্ভব স্নেহ করতেন আমাকে, তিনিই ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। বাকি যে দুই শিল্পীকে চাইছিলাম, তাঁরা হলেন কে.জে. ইয়েসুদাস (K. J. Yesudas) এবং শুভা মুদগল (Shubha Mudgal)। বিস্তারিত পরিচয় আশা করি নিষ্প্রয়োজন। উল্লেখ্য, তিনজনেই সেই প্রথম রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করেন।

ইয়েসুদাসের জন্য ‘আজি যত তারা তব আকাশে’, ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণের জন্য ‘আনন্দলোকে’ এবং ‘আগুনের পরশমণি’, এবং শুভা মুদগলের জন্য ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ আমার নিজের কণ্ঠেই রেকর্ড করে ট্র্যাক পাঠিয়ে দিলাম তিন জায়গায়। ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণ এবং শুভা রেকর্ড করবেন কলকাতায়, ইয়সুদাস চেন্নাইয়ে।


ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণের ‘আগুনের পরশমণি’

এই অ্যালবামের সঙ্গে এত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে যে এই লেখার স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা অসম্ভব, তবে এটুকু না বললেই নয় যে আজও যখন রবীন্দ্রসংগীতে উচ্চারণের তথাকথিত বিশুদ্ধতা, বা সুরের তথাকথিত অপপ্রয়োগ, বা ‘অবাঙালি’ শিল্পীর আদৌ রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া উচিত কিনা, এসব নিয়ে কিছু তথাকথিত বিশুদ্ধবাদীকে তর্ক করতে দেখি, তখন হাসিও পায়, করুণাও হয়। ক্ষুদ্রতার গণ্ডিতেই আবদ্ধ রয়ে গেলেন এঁরা, বুঝলেনই না রবি ঠাকুরের বিশ্বজনীন প্রকৃতি, তাঁর দর্শনের অপার গভীরতা। গানের কথার উচ্চারণ সঠিক হচ্ছে কিনা, সেই নিয়েই আকচাআকচি করে কাটিয়ে গেলেন।

শুভা মুদগল


শুভা মুদগলের গাওয়া ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’

সারাজীবন মনে রাখব শুভার ‘প্রাণ ভরিয়ে’। চোখ খুলে গিয়েছিল আমার, মনে হয়েছিল, এভাবে তো গানটাকে কোনোদিন দেখিনি। মিষ্টি করে, নরম সুরে, নেতিয়ে পড়ে আকুতি জানানোর শিল্পী শুভা নন, তাঁর বলিষ্ঠ অথচ সুরেলা আওয়াজে প্রার্থনা রয়েছে বটে, কিন্তু তা প্রায় দাবির মতো, তাতে প্রকাশ পায় জোরদার, জেদি এক আবেদন। অথচ রেকর্ডিং শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই যখন তাঁকে হোটেল থেকে আনতে যাই, তখন এই শুভা-ই একটি ছায়াছবির হোর্ডিংয়ে পরিচিত এক যন্ত্রশিল্পীর অর্ধনগ্ন ছবি দেখে চটুল রঙ্গতামাশা করেছেন আমার সঙ্গে। সেই মানুষটা চোখের নিমেষে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিলেন!

সারাজীবন মনে রাখব শুভার ‘প্রাণ ভরিয়ে’। চোখ খুলে গিয়েছিল আমার, মনে হয়েছিল, এভাবে তো গানটাকে কোনোদিন দেখিনি। মিষ্টি করে, নরম সুরে, নেতিয়ে পড়ে আকুতি জানানোর শিল্পী শুভা নন, তাঁর বলিষ্ঠ অথচ সুরেলা আওয়াজে প্রার্থনা রয়েছে বটে, কিন্তু তা প্রায় দাবির মতো, তাতে প্রকাশ পায় জোরদার, জেদি এক আবেদন।

ইয়েসুদাসের রেকর্ডিংয়ের জন্য এক বেলার সফর করার কথা ছিল চেন্নাইয়ের। সকালে যাওয়া, বিকেলে ফেরা। স্টুডিওতে বসে আছি, এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন ঘণ্টা কেটে গেল, তখনও আমাকে বলা হচ্ছে, উনি আসবেন ঠিকই। শেষ পর্যন্ত বোঝা গেল, বাড়িতে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সেদিন রেকর্ডিং করতে পারবেন না তিনি। তাঁর তরফে আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন তাঁর লোকজন, স্টুডিওর কাছেই আমার সেই রাতটা থাকার বন্দোবস্তও করে দিলেন। আশ্বাস দিলেন, পরদিন রেকর্ডিং হবেই।

কে.জে. ইয়েসুদাস


কে.জে. ইয়েসুদাসের গাওয়া ‘আজি যত তারা তব আকাশে’

হলোও তাই। সকাল সকাল স্বভাবসিদ্ধ ধবধবে সাদা পোশাকে স্টুডিওতে ঢুকে প্রথমেই ক্ষমা চাইলেন আমার কাছে, তারপর রিহার্সালে ঢুকলেন। বার তিন-চারেক গাইলেন, আরও একবার আমার কাছে গানের অর্থ বুঝে নিলেন, তারপরেই সোজা রেকর্ডিং। মনে আছে, ‘বাঁশরি’ শব্দটার প্রতি খুব আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কেন, সেটা পরে বুঝেছিলাম। স্রেফ দুই ‘টেক’-এই রেকর্ডিং শেষ – নিখুঁত, নির্ভুল গাওয়া। আজও যদি গানটা শোনেন, তবে দেখবেন কীভাবে ‘বাঁশরির সুরে’ কথা দুটি গেয়েছিলেন ইয়েসুদাস। মনে হয় যেন সত্যিই বাঁশি বেজে ওঠে কানে। রেকর্ডিংয়ের পরে যখন একসঙ্গে খেতে বসেছি, বলেছিলেন আরও রবীন্দ্রসংগীত গাইতে চান তিনি।

রইলেন ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণ, তাঁর কথা আর কী বলি। কলকাতার নামীদামী হোটেলে থাকার প্রস্তাব এক কথায় নাকচ করে দিয়েছিলেন। জীবন্ত কিংবদন্তির এই নিরহঙ্কার আচরণে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। শেষমেশ থাকলেন কোথায়? না, উত্তম মঞ্চের কাছে এক অতি সাধারণ হোটেলে, বারবার আমাকে বোঝালেন, “এনিহোয়্যার উইল ডু।”

ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণ, তাঁর কথা আর কী বলি। কলকাতার নামীদামী হোটেলে থাকার প্রস্তাব এক কথায় নাকচ করে দিয়েছিলেন। জীবন্ত কিংবদন্তির এই নিরহঙ্কার আচরণে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। শেষমেশ থাকলেন কোথায়? না, উত্তম মঞ্চের কাছে এক অতি সাধারণ হোটেলে, বারবার আমাকে বোঝালেন, “এনিহোয়্যার উইল ডু।”

রেকর্ডিংয়ের আগে এক অদ্ভুত চাহিদা প্রকাশ করলেন। একটা টুল লাগবে বসার জন্য। আনা হলো, উনি সটান তার উপরে বাবু হয়ে বসলেন, এবং সেভাবে বসেই গাইলেন। সেই গানের মায়াজালের কথা আগেই বলেছি। পরে মান্নাবাবুকে শুনিয়েছিলাম রেকর্ডিং। চোখ বুজে শুনছেন, দেখি চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। সে দৃশ্য লিখে বোঝানোর নয়। পরবর্তীকালে ডঃ বালমুরলীকৃষ্ণের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠতার সৌভাগ্য হয়েছিল। কলকাতায় আমার বাড়িতে এসে থেকেছিলেন, আমিও চেন্নাইয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম।

তিন শিল্পীর একজনও এই কাজের জন্য একটা টাকাও নেননি আমার কাছ থেকে। বরং আমার মাধ্যমে পাওয়া সুযোগ ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁদের গভীর অনুরাগ এবং আনুগত্য বোঝাতে। এত নম্রতা, এত নিষ্ঠা, এসবের কাছে কী মূল্য আছে উচ্চারণ, বা সুরের ঠিক-বেঠিকের?

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথকে যে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপনের সুযোগ পেয়েছিলাম, তার চেয়ে বড়ো শ্রদ্ধার্ঘ্য আজও আমার ঝুলিতে নেই। যে সব মহান শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে পেরেছিলাম, আমার কাছে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের সর্বব্যাপী, সর্বজনীন দর্শনের প্রতিভূ। সেই দর্শন চির প্রাসঙ্গিক।

Written by