
উত্তরবঙ্গ। নাম শুনলেই ‘হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে’। শহুরে ক্লান্তি ঘুমিয়ে পড়ে জনান্তিকে। আর মেঘের ভিতর দিয়ে দূরে যেন দেখা যায় চা-বাগান, পিকচার পারফেক্ট ছোটো ছোটো শহর, শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোটো ছোটো নদী, দূরে চকিতে দেখা দিয়ে কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘা আর ডুয়ার্স। নিবিড় বন, ফার্ন, বার্চ বিভিন্ন মহীরূহ, জংলা ঝোপে ফুটে থাকা রংবেরঙের ফুল, প্রজাপতি, পাখি আর বন্য পশুর দল। বনের বুক চিরে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া রাস্তায় উঠে আসে বুনো হাতি, গাউর, হরিণ। সেসব পশুপাখির মধ্যো উৎসাহী পর্যটকের চোখে মাঝেমধ্যেই ধরা দেয় মুন্টজ্যাক হরিণ (Muntjac Deer)। এই ভারতীয় মুন্টজ্যাক হরিণ (Indian Muntjac Deer) দেখা যায় ডুয়ার্সের গরুমারা, চাপড়ামারি, সিঙ্গালিলা, জলদাপাড়া বিভিন্ন অভয়ারণ্যে। এছাড়াও ভারতের অন্যান্য অভয়ারণ্যেও। ভারতবর্ষ ছাড়াও এর দেখা মেলে দক্ষিণ চিন আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

এটি পৃথিবীর অ্ন্যতম প্রাচীন প্রজাতির হরিণ। এর চলতি নাম বার্কিং ডিয়ার (Barking Deer)। এদের ডাক শুনতে অনেকটা কুকুরের ডাকের মতন। তাই এই নামকরণ। ঘন বনানীর মধ্যে ভারতীয় বার্কিং ডিয়ারের (Indian Barking Deer) হঠাৎ এমন তীক্ষ্ণ ও কর্কশ আওয়াজে সত্যিই চমকে উঠতে হয়। এমন ডাকের মাধ্যমে তারা দলের অন্যদের সতর্ক করে দেয় শিকারির থেকে আবার যোগাযোগও রাখে দলের অন্যদের সঙ্গে। এদের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হল, পুরুষ বার্কিং হরিণের শ্বদন্ত থাকে, যা তারা ব্যবহার করে দলের অন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়। এই শ্বদন্তই বার্কিং ডিয়ারকে অন্যান্য প্রজাতির হরিণের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
এটি পৃথিবীর অ্ন্যতম প্রাচীন প্রজাতির হরিণ। এর চলতি নাম বার্কিং ডিয়ার (Barking Deer)। এদের ডাক শুনতে অনেকটা কুকুরের ডাকের মতন। তাই এই নামকরণ। ঘন বনানীর মধ্যে ভারতীয় বার্কিং ডিয়ারের (Indian Barking Deer) হঠাৎ এমন তীক্ষ্ণ ও কর্কশ আওয়াজে সত্যিই চমকে উঠতে হয়। এমন ডাকের মাধ্যমে তারা দলের অন্যদের সতর্ক করে দেয় শিকারির থেকে আবার যোগাযোগও রাখে দলের অন্যদের সঙ্গে। এদের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হল, পুরুষ বার্কিং হরিণের শ্বদন্ত থাকে, যা তারা ব্যবহার করে দলের অন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময়।
হরিণগুলির পিঠের দিকে মেটে হলদে রং আর পেটের কাছে সাদা রং। চপল এই প্রাণীটির শিং হয় খুব ছোটো আকারের। তবে আকারে ছোটো হলেও কিছু কিছু হরিণের শিঙে দেখা যায় শাখা-প্রশাখার বাহার। এই হরিণেরা সাধারণত দলের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে। নিশাচর এই প্রাণীটি সাধারণত জানুয়ারির শেষদিক থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রজনন করে, তবে বছরের অন্য সময়েও এদের বংশবিস্তার করতে দেখা যায়। ঘন জঙ্গলে যেখানে গাছের পাতার ইন্দ্রজালের কাছে হার মানে সূর্যালোক, সেখানে গেলে দেখা যাবে, ধুলোওঠা হলদেটে-লাল বনের রাস্তায় এই হরিণগুলি দলবদ্ধভাবে চরে বেড়াচ্ছে আর গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা আর ফল খাচ্ছে। রাত বাড়লে বনের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর জল খেতে ভিড় জমায় হরিণের দল। কবি বিষ্ণু দে-র ভাষায়, “দুই দিকে বন, মাঝে ঝিকিমিকি পথ/ এঁকে-বেঁকে চলে প্রকৃতির তালে-তালে/ …চুপি চুপি আসে নদীর কিনারে, জল খায়/ শুনেছি সিন্ধুমুনির হরিণ-আহ্বান”।
এদের শরীরে অনেকগুলি ঘ্রাণগ্রন্থি আছে। এদের মুখের সামনে থাকা ঘ্রাণগ্রন্থিগুলি থেকে নিঃসৃত রাসায়নিকের মাধ্যামে এরা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে থাকে। অনেকসময় নিজের সঙ্গীর গায়ে এঁকে দেয় চিহ্ন। বাংলা সাহিত্যে, গানে, কবিতায় বহুবার প্রেমের চিত্তচাঞ্চল্যকে তুলনা করা হয়েছে হরিণের চপলতার সঙ্গে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘শিকার’ কবিতায় লিখেছেন, “সারারাত চিতাবাঘিনীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে/ নক্ষত্রহীন, মেহগনির মতো অন্ধকারে সুন্দরীর বন থেকে অর্জুনের বনে ঘুরে ঘুরে/ সুন্দর বাদামী হরিণ এই ভোরের জন্য অপেক্ষা করছিল।/ এসেছে সে ভোরের আলোয় নেমে;/ কচি বাতাবিলেবুর মতো সবুজ সুগন্ধী ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে”। ডুয়ার্সের নিবিড় বনানীর ভিতরে উৎসাহী পর্যটকেরা আর ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফাররা অপেক্ষা করেন এমনই এক প্রায়-অপার্থিব দৃশ্যপট একঝলক দেখার জন্যে ।

“আগুন জ্বলল আবার-উষ্ণ লাল হরিণের মাংস তৈরি হয়ে এল।/ নক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরনো শিশিরভেজা গল্প;/ সিগারেটের ধোঁয়া;/ টেরিকাটা কয়েকটা মানুষের মাথা।” ইদানীংকালে ডুয়ার্সের বনে বেড়ে গিয়েছে এমন সব ‘টেরিকাটা মানুষের মাথা’। তাদের চোরাশিকারের দৌরাত্ম্যে কমে আসছে এই হরিণের সংখ্যা। এখনও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকাভুক্ত না হলেও এই ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর। তাদের তরফে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। এলাকার মানুষদেরকেও এই সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।
