নিরীক্ষা হোক রবীন্দ্রসংগীতে, তবে গানকে ধূলিস্যাৎ করে নয় : রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা

শান্তিনিকেতনের আশ্রম কন্যা, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্যা শিষ্যা। বর্তমান সময়ে রবীন্দ্রসংগীতের অন্যতম ধারক ও বাহক। দুই বাংলার সেতুবন্ধনে যে সমস্ত মানুষের নাম উজ্জ্বল, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতমা। সম্প্রতি ভারত সরকার তাঁকে সম্মানিত করেছেন পদ্মশ্রী-তে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে দিয়েছে বঙ্গভূষণ, বাংলাদেশ সরকারের থেকে পেয়েছেন সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বাধীনতা পুরস্কারও। তাঁর গানের স্কুল ‘সুরের ধারা’ সারা বিশ্বে বিস্তৃত। সেখান থেকেই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কাজ করবার তাগিদে তৈরি করেছেন ‘মিউজিক ফর ডেভেলপমেন্ট’। মঞ্চে তিনি সর্বদা স্মিতহাস্য, আত্মমগ্ন, অতুলনীয়া। তিনি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা (Rezwana Choudhury Bannya)। দুই বাংলার ভালোবাসার ‘বন্যাদি’। ১৩ জানুয়ারি সংগীতশিল্পীর জন্মদিনে বঙ্গদর্শন.কম প্রকাশ করছে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার একান্ত সাক্ষাৎকার (Interview with Rezwana Choudhury Bannya)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র ও সংগীতশিল্পী অঙ্কন চট্টোপাধ্যায়।

________

সম্প্রতি পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত হয়েছেন। কেমন লাগছে?

বন্যা: অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। তবে তার সঙ্গে সঙ্গে এ-ও মনে হচ্ছে, নিবিড় ভাবে কাজ করার দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল।

বিভিন্ন ধরনের গান গেয়েছেন। তবু রবীন্দ্রনাথের গান আপনার পাথেয় হয়েছে সর্বদা। পদ্মশ্রী প্রাপ্তিতে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয় অনেকখানি থাকলেন?

বন্যা: প্রায় পুরোটাই। আমি তো নিমিত্ত মাত্র। প্রাপ্ত এই সম্মান আসলে তো রবীন্দ্রনাথের গানেরই। আর আমার গুরু কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, যিনি হাত ধরে আমায় এই অবধি নিয়ে এসেছেন। কাকতালীয় ভাবে ২০২৪-এ ছিল মোহরদির (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) জন্মশতবর্ষ। ওঁর শিষ্যা হিসেবে এই সময়ে আমার এ প্রাপ্তি আরও বেশি অভিভূত করেছে।

পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছেন বন্যা

রবীন্দ্রসংগীত নিছক গান নয়। জীবনের মন্ত্রও বলা যায় তাকে অথবা একটা বোধ। এ বিষয়ে কী বলবেন?

বন্যা: সহমত। রবীন্দ্রনাথের গান বহুমাত্রিক। তাঁর শুধু পূজা পর্যায়ের গানেই ঈশ্বরের সঙ্গে ভক্তের কতরকম ছবি। কোথাও ঈশ্বরকে তিনি বন্ধু বলেছেন, কোথাও পিতা, কখনও আঘাত চেয়ে নিচ্ছেন, কখনও আবার ‘আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে’ এ কথাও বলছেন। এছাড়া গানের ভিতর দিয়ে প্রকৃতিকে কত গভীর ভাবে দেখতে শিখিয়েছেন উনি। প্রকৃতি মানবজীবনের অনুভূতিগুলিতে যে কতখানি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে তা রবীন্দ্রনাথের গান পড়লে সবচাইতে ভালো বোঝা সম্ভব।

রবীন্দ্রনাথের গানের খুব বেশি প্রসাধনের প্রয়োজন নেই। আমি গান অনুযায়ী সেটি বজায় রাখার চেষ্টা করি। তাই কথাগুলি হয়তো অধিক যন্ত্রানুসঙ্গের ভিড়ে হারিয়ে যায় না।

গুরুর হাত ধরে প্রথম পেশাদার সংগীত জীবনে প্রবেশ। কেমন ছিল প্রারম্ভিক অভিজ্ঞতা?

বন্যা: ভীষণ রঙিন সেসব দিন। মোহরদির হাত এর পেছনে সবচেয়ে বেশি। একদম শেষের দিকে যখন উনি তেমন বেরোতেন না, তখন যদি কেউ এসে রেকর্ড করবার জন্য জোরাজুরি করতেন, মোহরদি শর্ত দিতেন, বন্যারও দুটি গান রাখতে হবে ক্যাসেটে। এইভাবে শুরু হয়েছিল। তারপর তো পশ্চিমবঙ্গের শ্রোতারা আমার গান পছন্দ করলেন, এত ভালোবাসা দিলেন, আজও এ ভালোবাসার কোনো ঘাটতি নেই।

রবীন্দ্রসংগীতে আপনার প্রধান গুরু কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও তো অন্যান্য গুরু ছিলেন। সেক্ষেত্রে আপনি সবচাইতে বেশি প্রভাবিত কার দ্বারা?

বন্যা: বিশ্বভারতীতে পড়বার সময় আমাদের গুরু হিসেবে মোহরদি, নীলিমা সেন, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়, শান্তিদেব ঘোষ, অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, গোরা সর্বাধিকারী এঁদের সকলকেই পেয়েছি। সেখানে আমার শিক্ষাপর্ব শেষ হবার পর যখন মোহরদির কাছে পুনরায় আলাদা করে সংগীতের পাঠ নিতে গেলাম, তখন তাঁকে আমি যথার্থ অর্থে গুরু হিসেবে পেলাম। তা গান শেখবার ক্ষেত্রে যতখানি, জীবনচর্চা ও রবীন্দ্র মনন অনুধাবন করবার ক্ষেত্রেও ঠিক ততখানিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আপনার গায়কিতে তাঁর ছায়া কি এখনও রয়ে গেছে?

বন্যা: এ কথা শ্রোতারা বলবেন। যাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথের গানের অ আ ক খ হাতে ধরে শিখলাম, তাঁর ছায়া থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু গায়কিতে নিজস্বতারও প্রয়োজন আছে। মোহরদির কোনো একটি বিশেষ গানে মজতে চাইলে মানুষ অন্য শিল্পীর কণ্ঠে হুবহু কপি ভার্শনটি শুনবেন কেন? তার গাওয়া আসল রেকর্ডটিই শুনবেন। আর এই বিষয়টি কোনো গুরুও পছন্দ করবেন না। প্রত্যেক গুরুই চান তাঁর শিষ্যরা নিজস্ব পথ খুঁজে পাক। তাই প্রত্যেক শিল্পীকে একটা সময়ের পর নিজস্বতায় আসতে হয়। আমিও তেমনটা করার চেষ্টা করেছি।

নতুন প্রজন্মেরও দারুণ উল্লাস আপনাকে নিয়ে৷ অথচ রবীন্দ্রনাথের গান তো আপনি চিরাচরিত ভাবেই গাইছেন। তবু এ যুগের পপ কালচারের ভিড়ে আপনার গান হারালো না।

বন্যা: তাতে আমার যে খুব হাত আছে তা বোধহয় নয়। রবীন্দ্রনাথের গান এমনই। এখনকার প্রজন্ম নিশ্চয় গানের বাণী বা সুরের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছে। আমার গান হয়তো তার ধারক বা বাহক বলা যেতে পারে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের গানের খুব বেশি প্রসাধনের প্রয়োজন নেই। আমি গান অনুযায়ী সেটি বজায় রাখার চেষ্টা করি। তাই কথাগুলি হয়তো অধিক যন্ত্রানুসঙ্গের ভিড়ে হারিয়ে যায় না।

অর্থাৎ রবীন্দ্রসংগীতে আধুনিকীকরণ বা পরীক্ষানিরীক্ষার বিপক্ষে আপনি?

বন্যা: ঠিক তা নয়। মোহরদিদের সময়ে শুধু এস্রাজ, তানপুরা, তালবাদ্যেও গানের রেকর্ড হত। পরে আমাদের সময়ে সেটা বদলে গিয়েছিল অনেকটা। এখন তা আরও বদলাবে সেটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রসংগীতকে এতটা কুক্ষিগত করতে চাইলে এ প্রজন্ম শুনতে আগ্রহী হবে না। আর সেটা বাঙালির জন্য বিরাট ক্ষতি। তাই কিছু বদল বা পরীক্ষা নিশ্চয় প্রয়োজন। কিন্তু গানকে ধূলিস্যাৎ করে নয়। গানের বাণী, সুর বদলে ফেললাম, দু:খের একটি গানে এমন যন্ত্রানুসঙ্গ হল সে মানুষ মূল ভাবটিই ধরতে পারল না, সেগুলি সমর্থনযোগ্য নয়। আমার বহু রেকর্ডে অনেক আধুনিক সংগীতায়োজন হয়েছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে গানকে ছাপিয়ে গিয়ে মিউজিক প্রাধান্য কোথাওই পায়নি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বঙ্গবিভূষণ প্রাপ্তি

এ প্রজন্মের অনেকে তো বিশুদ্ধ মতেও রবীন্দ্রনাথের গান করছেন। তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?

বন্যা: তাঁদের আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আর বলব, পারলে সমস্ত রকমের সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। রবীন্দ্রনাথ নিজে ধ্রুপদ, ধামার, টপ্পা, দাদরা, বাউল, কীর্তন, প্রাশ্চাত্য সংগীত সমস্ত কিছু থেকে রসদ আহরণ করে নিজের এত বড়ো সাঙ্গীতিক জগৎ তৈরি করেছিলেন। সেখানে এতরকম স্বাদ আমরা পাই বলেই রবীন্দ্রসংগীত কখনও আমাদের একঘেয়ে লাগে না। সংগীত একমেবাদ্বিতীয়ম। তার মূল একটিই।

কাল যদি আমার রক্তের প্রয়োজন হয় হাসপাতালে কোন ধর্মের, জাতির বা বর্ণের মানুষের রক্ত আমায় দেওয়া হল তা নিয়ে কি আমরা ভাবব? কখনও কি ভেবেছি?

রবীন্দ্রগান, সাহিত্য বা অন্যান্য শিল্পকর্ম নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী বলে আপনি মনে করেন?

রবীন্দ্রনাথের মনন এবং দর্শনকে আরও বেশি করে বোঝা প্রয়োজন। তাঁর জীবনচর্চাকেও বুঝতে হবে। রবীন্দ্রনাথ বারবার নিজেকেই খণ্ডন করেছেন৷ প্রথম জীবনে তাঁর ভাবনা যেমন, পরবর্তীকালে তা হয়তো অনেকক্ষেত্রেই পরিবর্তিত। গবেষণার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলিও দৃষ্টিগোচরে আসা দরকার। কোন অভিঘাতের ফসল কোন রচনা, কবিতা বা গান জানা প্রয়োজন। যখন একটি গল্প বা উপন্যাস লিখছেন তখন তাঁর অবস্থান কোথায়, মানসিক পরিস্থিতি কেমন – এগুলি জানতে পারলে গবেষণা অনেক বেশি স্বচ্ছ হওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেকার উষ্ণতায় বর্তমানে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ধর্ম ও জাতির প্রসঙ্গ এই পরিস্থিতিতে বারবার চলে আসছে। অথচ দুই বাংলার সম্প্রীতি একসময় উদাহরণ স্বরূপ ছিল…

বন্যা: মানুষকে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে জীবন দুদিনের। কে কবে আসে আর কে কখন চলে যায় উপরওয়ালা ছাড়া কেউ জানে না। যতক্ষণ আছি সেটুকু সময়ে নিজের সাধ্যের মধ্যে থেকে মানুষের উপকার, একটু উষ্ণতা, একটু ভালো ব্যবহার, সম্প্রীতি বজায় রাখার কাজ যদি আমরা সকলে করতে পারি তাতে ক্ষতি তো কিছু নেই। কাল যদি আমার রক্তের প্রয়োজন হয় হাসপাতালে কোন ধর্মের, জাতির বা বর্ণের মানুষের রক্ত আমায় দেওয়া হল তা নিয়ে কি আমরা ভাবব? কখনও কি ভেবেছি? ভাবা তো উচিতও নয়।

দুই বাংলার ঘরের শিল্পী হিসেবে কী মনে হয়, এই পরিস্থিতির উন্নতি কি আদৌ হওয়া সম্ভব?

বন্যা: দুই বাংলার ভাষা এক। সংস্কৃতি এক৷ আমাদের ভালোমন্দের বোধ এক। কাজেই দুই দেশের যে ব্যবধান তা সম্পূর্ণই মানুষের সৃষ্টি। অন্তরের দিক থেকে বিচার করলে ভুপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গানের কথা বলতে হয়, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’। আমাদের শিকড় একই জায়গায় প্রোথিত। কাজেই আমার বিশ্বাস আমাদের এই দূরত্ব, ব্যবধান বেশিক্ষণ স্থায়ী হবার কথা নয়৷

Written by