হলং : ভস্মীভূত হয়েছে বনবাংলো, স্মৃতিরা পোড়েনি

হলং বনবাংলো

স্মীভূত হয়ে গিয়েছে হলং বনবাংলো, সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুরছে হলং বাংলোর ভস্মীভূত হওয়ার ভিডিও। ভ্রমণপ্রেমী থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষ, সকলের মন খারাপ সে দৃশ্য দেখে। জলদাপাড়ার জঙ্গল তথা ডুয়ার্সের অন্যতম আকর্ষণ এই কাঠের বনবাংলো আজ অতীত, কেবলই ইতিহাসের উপাদান। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ, সমরেশ মজুমদার ও অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তীরা নিয়মিত আসতেন এই বাংলোয়। সব্যসাচী চক্রবর্তী হলং বাংলোকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বলেই মনে করেন থুড়ি করতেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, বাংলার প্রাক্তন রাজ্যপাল বীরেন জে শাহ, গোপালকৃষ্ণ গান্ধি, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে থেকেছেন বারবার। পুজোর ছুটিতে জ্যোতি বসুর পা পড়ত এখানে। এছাড়া বহু বিদেশি পর্যটকেরাও আসতেন। সে’সবের সাক্ষী ছিল ভিজিটরস বুক, সেটিও চলে গিয়েছে অগ্নিগর্ভে।

নুড়ি পাথরের রাস্তা পেরিয়ে কাঠের বাংলো, সামনে বয়ে চলা হলংয়ের ধারা। তা পেরোলেই নাগালের মধ্যে হাতি, বাইসন, এক শৃঙ্গ গন্ডার। সবুজ, মায়াময় প্রকৃতি। কেমন ছিল হলং বনবাংলো? বাংলোয় থেকেছিলেন এমন মানুষদের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে বাংলোর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কথা।

জঙ্গলপ্রেমী অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী হলং বাংলোকে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বলেই মনে করেন থুড়ি, করতেন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে থেকেছেন বারবার। বহু বিদেশি পর্যটকেরাও আসতেন। সে’সবের সাক্ষী ছিল ভিজিটরস বুক, সেটিও চলে গিয়েছে অগ্নিগর্ভে।

অমিয়ভূষণ পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাহিত্যিক রমাপ্রসাদ নাগ জানালেন বাংলোর ইতিহাস। হলং বনবাংলো তৈরি হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। তখন মাত্র দুটো ঘর ছিল। ফরেস্ট রেঞ্জাররা কাজের অবসরে বিশ্রাম নিতেন সেখানে, তখন পর্যটকদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ১৯৮০ নাগাদ বাংলো তৈরি হয় বৃহদাকারে অর্থাৎ (যা সদ্য পুড়ে গেল) আধুনিক রূপটি পায়। কাঠমিস্ত্রি দেবেন বিশ্বশর্মা ও তাঁর সহকর্মীরা আড়াই-তিন বছর ধরে দোতলা কাঠের বাংলোটি নির্মাণ করেন। কাজের বরাত পেয়েছিলেন মাদারিহাটের জনৈক রামানন্দা গুপ্তা। তিনিই দেবেন বিশ্বশর্মাকে নিয়োগ করেন। বাংলোর দরজা, জানলা তৈরি হয়েছিল শিশু কাঠে, চারপশের দেওয়াল ছিল শাল কাঠের মোটা তক্তার। পাটাতন ছিল চিকরাশি কাঠের। বাংলোর সামনে রয়েছে হলং ঝোরা। এই ঝোরা গিয়ে হলং নদীতে মিশেছে। 

সব শেষে

রমাপ্রসাদবাবু বললেন, “বাংলোর সামনেই একটা স্লট পিট আছে। বাংলোর ব্যালকনিতে বসলেই তা দেখা যায়। সেখানে লবন রেখে দেওয়া হয়। অধিকাংশ বনবাংলোর আশেপাশেই এমন স্লট পিট থাকে। যেখানে পশুরা এসে নুন চেটে চেটে খায়। ব্ল্যাক স্লট দেওয়া হয়। আমি অনেকবার গেছি, একটা বুড়ো গন্ডার প্রায়ই এসে দাঁড়িয়ে থাকত। তার সঙ্গে দেখা হত। তার বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা হত। হলং বনবাংলো সম্পূর্ন কাঠের ছিল, সিঁড়িও কাঠের। উঠতে ধুপধাপ শব্দ হত, সেটাও রোমাঞ্চকর। কবির হোসেন নামে একজন রাঁধুনি ছিলেন, অবসর নিয়েছেন হয়তো মারাও গিয়েছেন। তিনি দুর্দান্ত বোরোলি মাছ রাঁধতেন। জিরে, কাঁচালঙ্কা দিয়ে কাঁচা বোরোলি মাছের ঝোল, বোরোলি মাছের বড়া আর জঙ্গলের ঢেঁকি শাক খাওয়া হত। খাওয়াটা বড়ো কথা নয়, তবে সবটাই মনে আছে। পুড়ে গেছে, এতকাল গেছি। কাঠের গন্ধ নাকে লেগে আছে, বোরোলি মাছের ঝোলের গন্ধ, বৃদ্ধ গন্ডারের মুখ তুলে তাকিয়ে থাকা, আমাকে চেনে কিনা জানি না! আমি তো চিনি। হরিণের দৌড়ে যাওয়া, বাংলোর পিছনে হাতি ইত্যাদি…গার্ডদের বারেবারে সাবধানবাণী ‘স্যর ওদিকে যাবেন না।’ ওদিকটা কোর এরিয়া। ভিতরের সৌন্দর্য্য অনবদ্য।” 

রমাপ্রসাদবাবুর কথায়, “উত্তরবঙ্গের বনবাংলোর মধ্যে হলং বনবাংলো শ্রেষ্ঠ ছিল, বাংলোর নির্জনতা দারুণ। কিন্তু শেষের দিকে সেটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বছরখানেক আগে গিয়েছিলাম শেষবার, সামনে স্টল দিয়ে চিপস বিক্রি হচ্ছে, আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে, সব জায়গায় যেমন হয় আরকি! এখানেও যদি চিপস আর আইসক্রিম খেতে লোক আসে, তাহলে কেন হলং বনবাংলো? এ তো যেকোনও জায়গায় পাওয়া যায়! অমিয়ভূষণ মজুমদার, তাঁর প্রত্যেকটা উপন্যাসে প্রায় একই কথা লিখে গিয়েছেন, ‘সভ্যতার সড়ক, আধুনিকতা গ্রাস করছে অরণ্যকে।’ পিচের রাস্তা যেখানে যেখানে গেছে সেই জায়গাগুলো দূষিত হয়েছে।”

তিনি আরও বলছিলেন, তিনি সাতের দশক থেকে জঙ্গলে ঘোরেন, তখন উত্তরবঙ্গের জঙ্গল অনেক ঘন ছিল। কিন্তু ক্রমশ উত্তরবঙ্গের জঙ্গল পর্যটকদের বিনোদনের জায়গা হয়ে গিয়েছে। তার ফল ভোগ করছে উত্তরবঙ্গের বনবাংলোগুলো ও অরণ্য পরিবেশ। “যে পর্যটক অরণ্যের শোভা দেখতে গিয়ে রাত্তিরে চিকেন হবে কিনা তাই নিয়ে মারপিট করেন, তাঁর জঙ্গলে আসার কোনও মানেই নেই! তাঁর জঙ্গলপ্রেমও নেই। আমি আমার বইতেও লিখেছি, উত্তরবঙ্গের প্রাচীন বনবাংলোগুলো এক এক করে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কোনওটা আন্দোলনের কারণে, জয়ন্তী বাংলোও পুড়ে গেছে। আমার ধারণা, একটাই বনবাংলো এখনও পর্যন্ত আছে, সেটা রায়ডাক বনবাংলো।” 

হলং বাংলো নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক পিনাকী চক্রবর্তী। বললেন, “হলং বনবাংলো নিয়ে সেরা স্মৃতি হল ২০০৬ সালে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবাবু এসেছিলেন হলং বাংলোতে। আমরা সপরিবারে, আমার মা, দুই ছেলে, স্ত্রী; আমরা সবাই মিলে ওঁর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলাম। এটা একটা সেরা স্মৃতি। তা ছাড়া রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপালরা ছিলেন, যেমন অতনু রাহা, সম্পৎ সিং বিস্ত, সীতাংশু বিকাশ মন্ডল, এঁদের সঙ্গেও বাংলোতে বহু সময় কাটিয়েছি। পুরনো ইতিহাস, গল্প জানা, কোন প্রাণী কীভাবে কী করে, তাদের স্বভাব জানা।” পিনাকী চক্রবর্তীর লেখা থেকে জানলাম, অসম ও অরুণাচল প্রদেশের রাজ্য গাছ হলং-র নামেই বাংলোর নামকরণ করা হয়েছিল। এই হংল কাঠ দিয়েই বনবাংলো তৈরি করা হয়েছিল। পরে সংস্কারের সময় অন্য কাঠ ব্যবহার করা হয়। 

পিনাকী, ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের জন্য হলং বাংলোতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি ক্লাস নাইনের ছাত্র। সে সময় ফালাকাটার বিভিন্ন স্কুলে যাঁরা ভালো ফল করেছিল, মেধাতালিকার প্রথম চারজন পড়ুয়াদের এডুকেশনাল এক্সকারশনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পিনাকী তখনই প্রথম এই বনবাংলোতে গিয়েছিলেন। তারপর সাংবাদিকতা পেশার সুবাদে প্রতিনিয়ত হলং বনবাংলোতে গিয়েছেন। হলং নদীর বিশেষত্বের কথাও জানালেন পিনাকী। নদী সাধারণত উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে যায়, কিন্তু হলং নদী একেবারে উল্টো। এটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে গিয়েছে। 

স্মৃতির পাতা থেকে : হলং বনবাংলো-তে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু সঙ্গে সপরিবারে সাংবাদিক পিনাকী চক্রবর্তী (ডানদিকে দাঁড়িয়ে)

বাবার হাত ধরে ছোট্টবেলা থেকে হংল বনবাংলোতে যেতেন সায়ন চক্রবর্তী। সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মী সায়নের মতে, হলং বনবাংলো ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলো। গহীন অরণ্যে যখন দিনের আলো আস্তে আস্তে নিভে যায়, তখন একদিকে গন্ডার আর বাইসন, হরিণ, হাতির দল আর বিভিন্ন ধরনের পাখি এসে ভিড় করে বাংলোর আশপাশে; মানুষজন এই জিনিসগুলো উপভোগ করতেন। ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে গেল। বললেন, “বাবা মাদারিহাট বিডিও অফিসে চাকরি করতেন। আমার ছ’বছর বয়স পর্যন্ত আমি মাদারিহাটে ছিলাম। মাদারিহাটেই জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের মধ্যে হলং বাংলো অবস্থিত ছিল। বাবার হাত ধরে মাঝে মাঝেই সেখানে যেতাম, বিশেষ করে রবিবার, ছুটির দিনে। এমনও দিন গেছে কোনও মন্ত্রী এসেছেন, বাবার সঙ্গে আমিও গেছি। বাংলোর বাইরে বাগান আছে, সেখানে সময় কাটাতাম। বাংলোয় সব মিলিয়ে আটটা ঘর ছিল। অন্য রকম অভুভূতি। বারবার সেই স্মৃতি ফিরে ফিরে আসছে। হলং বাংলো গর্বের কারণ ছিল।” 

সায়ন বলছিলেন, উত্তরবঙ্গবাসীদের দাবি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। যদি দোষী কেউ থেকে থাকে, তাদের শাস্তি হোক। নতুন করে বাংলো তৈরি হোক ওই জায়গায়, তবে কংক্রিটের নয়। আগের মতো, কাঠের বাংলো। নাম যেন একই থাকে। 

বাংলো ভস্মীভূত হতে পারে স্মৃতিরা পোড়ে না। আজও ডুয়ার্স সবুজহীন হয়নি, হলং নদী শুকিয়ে যায়নি। আজও বাইসন, গন্ডার, হরিণের দল নুন খেতে আসছে। হয়তো তারাও আজ বাংলোটাকে খুঁজছে। ফিনিক্সের মতো ফের উঠে দাঁড়াবে না-কি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের প্যাঁচে অচিরেই হারিয়ে যাবে হলং বনবাংলো?

______

তথ্যঋণ: রমাপ্রসাদ নাগ এবং পিনাকী চক্রবর্তী
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: সায়ন চক্রবর্তী
ছবি: পিনাকী চক্রবর্তী

Written by