
ধরে নিন বইয়ের প্রকাশক সম্বন্ধে আপনার খুব বিশেষ ধারণা নেই। কিংবা হাতে গোনা কিছু নামী লেখকদের ছাড়া আপনি কাউকে সেভাবে চেনেন না। কিন্তু বই পড়তে ভালোবাসেন। গেলেন একটা বই মেলায় কিংবা দোকানে। তাক ভর্তি সাজানো বই। আপনি প্রথমে চেষ্টা করবেন আপনার চেনা কোনো লেখকের বই খুঁজে বের করতে, যেটা অবশ্যই আপনি এখনও পড়েননি। এবার যদি না পান, তাহলে? সেক্ষেত্রে প্রথমেই সবথেকে সুন্দর দেখতে বইটাকেই তুলে নেবেন। কোন বইটার কভার বা প্রচ্ছদ আপনার পছন্দের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে, কিংবা কোন প্রচ্ছদটা একটা রহস্য সৃষ্টি করছে– এসব দেখেই একটা বই বাছবেন বা কিনবেন। অতএব “Don’t judge a book by its cover”- এই বাক্যের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণযোগ্য হলেও, একজন ক্রেতার সবার আগে বইয়ের প্রচ্ছদ দেখার ঘটনা এড়ানো মুশকিল। কভার বা প্রচ্ছদই একটা বইয়ের প্রথম ভাষা। সেই বইয়ের বিষয় কতটা ভালো/মন্দ, সেটা পাঠক পড়ার পর বোঝেন।
বর্তমানে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদের ক্ষেত্রে মূলত চারটি ভাষার ব্যবহার করা হয়— হরফনির্ভর শিল্প (টাইপোগ্রাফি, ক্যালিগ্রাফি এবং লেটারিং), ইলাস্ট্রেশন, ফটোগ্রাফি, এবং মিক্সড। টাইপোগ্রাফির ক্ষেত্রে প্রচলিত হরফ দিয়ে নানান কায়দায় প্রচ্ছদ সাজানো হয়। আবার শিল্পী যদি সৃজনশীলভাবে আলাদা করে কোনো হরফ তৈরি করেন, তাকে বলে ক্যালিগ্রাফি। এছাড়া, যদি আঁকার মাধ্যমে হরফ তৈরি করা হয় যার মধ্যে নানান কারুকাজ রয়েছে, সেটা হয়ে যায় লেটারিং। অন্যদিকে ইলাস্ট্রেশনে বইয়ের বিষয়ের উপর ভিত্তি করে নানান দৃশ্যমান উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মূলত শিল্পীর তৈরি আঁকা বা ডিজাইন হয়ে থাকে। এছাড়া ফটোগ্রাফিক প্রচ্ছদে থাকে বইভিত্তিক আলোকচিত্র এবং মিশ্র প্রচ্ছদে উল্লেখিত বাকি উপাদানগুলিকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। এই ভাষাগুলিই একটা বইয়ের প্রচ্ছদকে পড়ার পথ দেখায়। প্রচ্ছদ পড়ানোর মাধ্যমে প্রচ্ছদশিল্পী শুধু “এটা কি বই?” – তা বলে না, বরং পাঠককে ইঙ্গিত দেয় বইটি পাঠক “কিভাবে গ্রহণ করবে।” অর্থাৎ একটি সেরিফ টাইপফেস (Serif Typeface) বইটির ভাষা বা বিষয় সম্পর্কে এক ধরনের গাম্ভীর্য তৈরি করতে পারে। আবার কোনো হালকা রঙা ফুরফুরে মেজাজের ইলাস্ট্রেশন বইটির রসবোধ তুলে আনে। যদিও পাঠকের পূর্ব অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি এবং কল্পনা টেনে আনতেই পারে।
এখন বলা দরকার, একাধিক প্রচ্ছদ যদি ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন শিল্পীর হাতে তৈরি হয়, তাহলে পাঠকের কাছে বইটির প্রথম পরিচয়ও আর এক থাকে না। একটি প্রচ্ছদ হয়তো রহস্যকে প্রাধান্য দেবে, অন্যটি চরিত্রকে, আবার কোনওটি শুধুমাত্র আবহের মাধ্যমে পাঠককে বইটির প্রতি আকর্ষণ করবে।

একটা বইয়ের প্রচ্ছদ যখন কেউ দেখেন, প্রথম দেখায় তাঁর মনে বই সম্বন্ধে একটা কল্পনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বইটি পড়ার আগেই তার বিষয়, আবহ ও সম্ভাব্য জগৎ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি হতে শুরু করে। কিন্তু সেই ধারণা সবসময় স্থির নয়, ভিন্ন সময় ও সংস্করণের সঙ্গে প্রচ্ছদের ভাষাও বদলাতে পারে। যেমন, ১৯৩৭ সালে বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার পর বহু সংস্করণ পাঠকের কাছে পৌঁছায়। বইটির প্রচ্ছদেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৃশ্যমান উপাদান ব্যবহার করা হয়। একইভাবে ‘পথের পাঁচালী’-র ক্ষেত্রেও পুরনো সংস্করণের প্রচ্ছদ এবং পরবর্তী প্রকাশনার প্রচ্ছদের মধ্যে নকশা, চিত্রভাষা ও উপস্থাপনার পার্থক্য দেখা যায়। ফলে কাহিনি একই হলেও একজন পাঠকের কাছে বইটির প্রথম পরিচয় হতে পারে তার পুরনো প্রচ্ছদ। আবার অন্য প্রজন্মের পাঠকের কাছে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃশ্যরূপ নিয়ে হাজির হতে পারে। আর এই কল্পনার সক্রিয় বাহক প্রচ্ছদে থাকা ছবি এবং হরফভিত্তিক শিল্প। যদিও গবেষণা বলছে একটা প্রচ্ছদে থাকা ছবির আগে হরফশিল্পই মূলত পাঠককে আকর্ষণ করে। আই-ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণায় পরীক্ষা করা হয় একটি প্রচ্ছদের কোন অংশ পাঠকের দৃষ্টি ধরে রাখে, কতক্ষণ ধরে রাখে; এবং কোন নির্দিষ্ট দৃশ্যমান উপাদান বা ভিস্যুয়াল এলিমেন্ট মনযোগ ধরে রাখছে বা মনযোগ প্রভাবিত করছে। ২০১৬ সালের একটি আই-ট্র্যাকিং গবেষণায় ২৩ জন অংশগ্রহণকারীকে ৯৬টি বইয়ের একটি তাক দেখানো হয়। দেখা যায়, প্রচ্ছদে ব্যবহৃত রঙের পার্থক্য পাঠকের দৃষ্টি স্থির রাখতে বা কোনো বই বেছে নিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি, বরং বই এবং লেখকের নামের হরফশিল্পের পার্থক্য পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে এবং বই নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে। আবার গবেষণা এটাও বলছে যে, চোখ কোনও কিছুর দিকে তাকালেই যে তার অর্থ আকর্ষণ, এমন নয়। পাঠকের পূর্বজ্ঞান, উদ্দেশ্য, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং কোনও দৃশ্যমান উপাদানের সঙ্গে তার পূর্বপরিচিতি ভিন্ন অর্থও বহন করে থাকে।
এখন বলা দরকার, একাধিক প্রচ্ছদ যদি ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন শিল্পীর হাতে তৈরি হয়, তাহলে পাঠকের কাছে বইটির প্রথম পরিচয়ও আর এক থাকে না। একটি প্রচ্ছদ হয়তো রহস্যকে প্রাধান্য দেবে, অন্যটি চরিত্রকে, আবার কোনওটি শুধুমাত্র আবহের মাধ্যমে পাঠককে বইটির প্রতি আকর্ষণ করবে। অতএব ভিন্ন প্রজন্মের কাছে একটি বইয়ের বিষয়ের প্রাধান্যতায় পার্থক্য উঠে আসে। অর্থাৎ একজন কিশোর যদি প্রথমবারের জন্য ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়ে এবং বইটিতে যদি সত্যজিৎ রায়ের তৈরি প্রচ্ছদ থাকে, তাহলে শঙ্করের অভিযান, আফ্রিকার পাহাড়, এবং জঙ্গলের হাতছানি পাঠকের কাছে প্রাধান্য পাবে। আবার, এই বইগুলোতেই যদি অন্য কোনো শিল্পীর প্রচ্ছদ থাকে যেখানে হয়তো দু’জন অভিযাত্রীর অবয়ব রয়েছে তাহলে শঙ্করের পাশাপাশি পথপ্রদর্শক দিয়েগো আলভারেজের চরিত্রও তাকে টানবে।

আজ আমরা যেমন প্রচ্ছদ দেখছি বরাবর এমনটাই ছিল, তা নয়। ঊনবিংশ শতকে বইয়ের প্রচ্ছদ বলতে ছিল মূলত নামপত্র। প্রচ্ছদে থাকত শুধু বইয়ের নাম, লেখকের নাম, এবং প্রকাশকের নাম। সেসময় এই নামপত্রধর্মী প্রচ্ছদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাঠককে বোঝানো “এটা কোন বই?” পরে বিশ শতকের প্রচ্ছদে নানান কারুকাজ আসতে শুরু করে। এসময় প্রচ্ছদ আর শুধু বইয়ের পরিচয় বাহক নয়, বরং “এটা কেমন বই?” এই প্রশ্নের উত্তরও দিতে শুরু করে।
বিশ শতকের প্রথম দিকে নন্দলাল বসুর হাত ধরে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদশিল্প একটা নতুন ধারা পেল। প্রচ্ছদ আর শুধু পুস্তক সজ্জা হিসাবে সীমিত থাকল না, হয়ে উঠল বইয়ের ভাবনা ও মেজাজের দৃশ্য-শিল্পগত ব্যাখ্যা। রবীন্দ্রনাথের ‘সহজ পাঠ’-এর অলংকরণে তিনি কখনও লিনোকাটের কালো-সাদার তীক্ষ্ণতা ব্যবহার করেছেন, আবার কখনও আলতো রেখায় এঁকেছেন সরল এবং স্বচ্ছ ছবি। তিনি তাঁর কাজের মধ্যে ছবিকে শুধু গল্পের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে দিতেন না, বইয়ের ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব শিল্প বানাতেন। ‘সহজ পাঠ’-এর আগে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’-র প্রচ্ছদে নন্দলাল বসুর শিল্পভাবনার যে গভীরতা প্রকাশ পেয়েছিল, তা বাংলা প্রচ্ছদশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। ‘ছিন্নপত্র’-র খয়েরি রঙা চামড়ার মলাটে সোনালী পদ্মের পাপড়ি ঝরে পড়া শুধু অঙ্কনশিল্পের সাবলীলতা দেখায় না, পাশাপাশি বইয়ের মূল ভাবনাও উন্মোচিত করে। পদ্মের ঝরে পড়া লেখকের নতুন করে জীবনকে দেখার প্রসঙ্গ তুলে আনে। একইভাবে, বইটিতে থাকা চিঠিগুলির ঠিকানা পদ্মার নিকটবর্তী বিভিন্ন অঞ্চল, কাজেই এই চিত্র খুবই প্রাসঙ্গিক। এছাড়া, আত্মান্বেষণের পাশাপাশি প্রকৃতি-প্রেমের ইঙ্গিতও বহন করে এই ছবি। পরবর্তীকালে ‘জীবনস্মৃতি’র প্রথম পাতাতেও এই একই চিত্রকে পুনর্ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
এ প্রসঙ্গে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রন্থচিত্রণের উল্লেখ আবশ্যিক। ‘জীবনস্মৃতি’র অলংকরণে গগনেন্দ্রনাথের শিল্প কেবল লেখার দৃশ্যকে ছবিতে রূপান্তর করেনি; জাপানি ব্রাশ টেকনিক্, প্রাচ্য শিল্পভাবনা এবং তাঁর নিজস্ব রেখাভাষার সমন্বয়ে লেখার বিষয় ও আবহকে একটি স্বাধীন দৃশ্যভাষা দিয়েছিল। ভারতে চল্লিশের দশকের আগে তিনিই প্রথমবার চিত্রশিল্পে কিউবিজমের ব্যবহার করেন, যেখানে জ্যামিতিক আকারের মাধ্যমে বস্তুকে আঁকার দৃষ্টিকোণ বা পার্সপেক্টিভ তুলে ধরা হয়।

আজকের দিনে অনেক ক্ষেত্রে শিল্প বলতে শিল্পীর ভাবনাটাই যথেষ্ট, বাকিটা এআই-এর দায়িত্ব। ইচ্ছে মতো ভিন্ন রং, অবয়ব, ক্যালিগ্রাফি দিয়ে মিনিট খানিকের মধ্যে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে একটা প্রচ্ছদ। কিন্তু এখানে বিতর্ক এটাই যে, বইয়ের প্রচ্ছদ তো শুধু একটা ছবি বা বিভিন্ন রং আর হরফের ব্যবহার নয়, যে দুম করে বানিয়ে ফেলা যায়!
প্রসঙ্গত, বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ বিবর্তনের ইতিহাসে সিগনেট প্রেসের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চল্লিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত সিগনেট প্রেস বইয়ের প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠাসজ্জা, হরফ এবং অলংকরণকে প্রকাশনার নান্দনিকতার একটা বড়ো অংশ করে তুলেছিল। এসময়েই সত্যজিৎ রায়ের হাতে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ একটি স্বতন্ত্র গ্রাফিক্যাল ভাষা পেতে শুরু করে। সত্যজিতের কাজের ক্ষেত্রে ছবির পাশাপাশি হরফও হয়ে উঠেছিল নকশার উপাদান। তিনি মূলত লেটারিংয়ে জোর দিতেন, যা তাঁর সম্পূর্ণ নিজের সৃজনশীলতায় তৈরি। তিনি নিজেই ব্রাশ দিয়ে অক্ষর আঁকতেন এবং কারুকাজ করতেন, ফলে বইয়ের নাম আর ছবির মধ্যে আলাদা কোনও সীমারেখা থাকত না। ছবির বদলে অক্ষরের সেই শৈলীই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠত। ‘পথের পাঁচালী’র কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’র প্রচ্ছদ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সিগনেট প্রেসের হয়ে এই কিশোর সংস্করণের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ কেবল গল্পের কোনও দৃশ্য আঁকেননি, তাঁর শিল্পগুলো বইটিতে উল্লেখিত গ্রামীণ জগৎ ও অন্তর্নিহিত আবহকে একটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্যভাষায় তুলে এনেছিল। পরবর্তী সময়ে সোনার কেল্লা, বাদশাহী আংটি, প্রফেসর শঙ্কু ও ফেলুদা’র বইগুলিতে তিনি প্রচ্ছদের মাধ্যমে বইয়ে থাকা চরিত্র, গল্পের মেজাজ এবং রহস্য-অভিযানের আবহ ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
এই শিল্পভাবনাগুলিই প্রচ্ছদকে আর নিছক অলংকরণে সীমিত রাখল না। শিল্পী যখন বইটির আক্ষরিক বিষয় আঁকার বদলে তার অন্তর্নিহিত মেজাজ, চরিত্র বা ভাবনাকে ধরতে শুরু করল, তখন প্রচ্ছদ হয়ে উঠল এক ধরনের দৃশ্যগত ব্যাখ্যা। এপ্রসঙ্গে বলা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে খালেদ চৌধুরির প্রচ্ছদশিল্পে প্রতীকবাদ বা সিম্বলিজ্ম অনেক বেশি স্পষ্ট। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ (‘৮৪-র সংস্করণ) হোক কিংবা, শঙ্কু মহারাজের ‘যদি গৌর না হ’ত’, অথবা মহাশ্বেতা দেবীর ‘গ্রাম বাংলা’ — এর মধ্যে প্রতিটি প্রচ্ছদেই খালেদ চৌধুরির শৈল্পিক প্রতীকিবাদ প্রচ্ছদ শিল্পে একটা নতুন অধ্যায় যোগ করেছিল। বইয়ের গল্পকে প্রচ্ছদে হুবহু তুলে না এনে সৃজনশীল ভাবনাকে পাঠকের চোখে ছুঁড়ে দিয়ে পাঠকের নিজস্ব চিন্তশীলতাকে স্বাতন্ত্র করতে এই ধারা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক।
খালেদ চৌধুরীরই সমসাময়িক শিল্পী ছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। পুর্ণেন্দু বাংলা প্রচ্ছদশিল্পকে আরও কাব্যিক করে তুললেন। পঞ্চাশের দশকে লেটারিংয়ের সৃজনশীল ব্যবহারে বাংলা প্রচ্ছদশিল্পে যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল, পুর্ণেন্দু পত্রী ছিলেন তার অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি প্রচ্ছদকে শুধু বইয়ের সজ্জা কিংবা পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখলেন না, বরং তাঁর কবিসত্তাকে অঙ্কনশিল্পে তুলে আনলেন। কখনও লেটারিংকে মর্ফ করে প্রাসঙ্গিক ছবিতে পরিবর্তন করতেন, আবার কখনও ছবির মধ্যে লেটারিং খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন। চাণক্য সেনের বই ‘রেপ’ হোক কিংবা তাঁর নিজের বই ‘সিনেমা সিনেমা’, অথবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অঙ্গুরী তোর হিরণ্য জল’ — তাঁর প্রতিটি শিল্পেই ফিগারেটিভ লেটারিংয়ের সৃজনশীলতা বাংলা প্রচ্ছদ শিল্পের একটা অন্যতম অধ্যায়।

প্রচ্ছদের ইতিহাস মুদ্রণপ্রযুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে সমান্তরাল। উনিশ শতকে বাংলা বইয়ে ছবি মুদ্রণের জন্য কাঠের খোদাই করা ব্লক ব্যবহৃত হত। পরে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী উন্নত ব্লক-মুদ্রণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবি ছাপার মানকে আরও উন্নত করার কথা ভাবেন। জানা যায়, উপেন্দ্রকিশোর ষাট-ডিগ্রি স্ক্রিন, ডায়াফ্রাম পদ্ধতি, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার, ডায়োটাইপ ও রিপ্রিন্টের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে তিনি ব্লক তৈরির কারখানাও প্রতিষ্ঠা করেন, ১৮৯৫ সালে যার নাম দেওয়া হয় ‘ইউ রে অ্যান্ড সন্স’।
বলাইবাহুল্য, প্রযুক্তির বিবর্তন শিল্পভাবনায় বরাবরই প্রভাব ফেলে এসেছে। কারণ শিল্পীর কল্পনার সঙ্গে মুদ্রণক্ষমতারও একটা সম্পর্ক থাকে। কোন রেখা স্পষ্টভাবে ছাপা যাবে, কত রং ব্যবহার করা সম্ভব, ছবির সূক্ষ্মতা কতটা ধরে রাখা যাবে, এসমস্ত সীমাবদ্ধতা শিল্পের চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রভাবিত করে। ফলে প্রচ্ছদের বিবর্তন কেবল শিল্পভাবনার আধুনিকতার উপর আর টিকে নেই, একই সঙ্গে এতে জড়িয়ে আছে মুদ্রণপ্রযুক্তির সম্ভাবনা বিস্তৃতির গল্পও। একসময় প্রশ্ন ছিল, ‘এটা কীভাবে ছাপা সম্ভব?’, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র যুগে প্রশ্নটি হয়ে গেছে—‘এটা কীভাবে কল্পনা করা সম্ভব?’
বর্তমানে এআই নিমেষে বানিয়ে দিচ্ছে একাধিক পোস্টার। শুধু নির্দেশ বা প্রম্টের অপেক্ষা। আজকের দিনে অনেক ক্ষেত্রে শিল্প বলতে শিল্পীর ভাবনাটাই যথেষ্ট, বাকিটা এআই-এর দায়িত্ব। ইচ্ছে মতো ভিন্ন রং, অবয়ব, ক্যালিগ্রাফি দিয়ে মিনিট খানিকের মধ্যে বানিয়ে ফেলা হচ্ছে একটা প্রচ্ছদ। কিন্তু এখানে বিতর্ক এটাই যে, বইয়ের প্রচ্ছদ তো শুধু একটা ছবি বা বিভিন্ন রং আর হরফের ব্যবহার নয়, যে দুম করে বানিয়ে ফেলা যায়! একটা সফল প্রচ্ছদের নেপথ্যে রয়েছে গভীর মনস্তত্ত্ব এবং শিল্পভাবনা। এখানে শিল্পীকে বুঝে নিতে হয় বইয়ের কোন অংশের বিষয়ভিত্তিক উপাদানকে প্রচ্ছদের সঙ্গী বানানো যাবে, কতটুকু খোলস ছাড়াতে হবে এবং কতটার গা ঢাকা রাখতে হবে। আধুনিক প্রচ্ছদশিল্পে এই গভীর চিন্তনের অভাব প্রকৃত শিল্পসত্তার কাছে নিন্দার বিষয় হয়ে উঠছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছবি তৈরির দক্ষতাই হয়ে উঠছে প্রচ্ছদ শিল্পী হয়ে ওঠার মাপকাঠি; ফিকে থেকে যাচ্ছে শিল্পবোধ এবং ভাবনার গভীরতা। একটি সফল প্রচ্ছদ বরাবরই পাঠকের মনে কৌতূহল জাগায় যে, বইটির মধ্যে কি আছে এবং ফলস্বরূপ পাঠক বইটি হাতে তুলে নেয়; সঙ্গে বইয়ের বিষয়ের সঙ্গে একটা নিগুঢ় সম্পর্ক থাকাও বাঞ্ছনীয়।
প্রচ্ছদ তৈরিকে সময়-সাশ্রয়ী করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়াটাও বোকামি। কিন্তু সৃজনশীলতা এবং চিন্তনশীলতাকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ডেটাবেসের সমন্বয়ে তৈরি ছবিকে শিল্প বললে শিল্পীর অস্তিত্বে টান পড়ে।

আজকের দিনে বহু প্রচ্ছদ নির্মাতা ভুলে যাচ্ছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটা টুল বা সহায়কমাত্র। এখানে নিজস্ব ভাবনাকে ঘষামাজা করতে বা আরও কিছু ধারণা পেতে সাহায্য নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট উপাদান বা এলিমেন্ট তৈরির জন্যও এআই আজকাল অনেকটাই গ্রহণযোগ্য। আবার প্রচ্ছদ তৈরিকে সময়-সাশ্রয়ী করে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়াটাও বোকামি। কিন্তু সৃজনশীলতা এবং চিন্তনশীলতাকে সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে একটা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ডেটাবেসের সমন্বয়ে তৈরি ছবিকে শিল্প বললে শিল্পীর অস্তিত্বে টান পড়ে। কারণ যন্ত্র ছবি তৈরি করতে পারে, কিন্তু একটা ছবির নেপথ্যে যদি মনুষ্য ছোঁয়া, অভিজ্ঞতা ও ভাবনা না থাকে তাহলে শিল্প আর শিল্প থাকে না, পণ্য হয়ে যায়।

