
ভাগীরথী নদীর তীরে গড়ে ওঠা হুগলি জেলার সুপ্রাচীন একটি জনপদ গুপ্তিপাড়া। অতীতে ধর্মচর্চার পীঠস্থান গুপ্তিপাড়াকে বলা হত ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’। লোকশ্রুতি, কোনো এক সময়ে নদিয়া জেলার শান্তিপুর থেকে বৈষ্ণব সাধক সত্যানন্দ সরস্বতী স্বপ্নাদেশ পেয়ে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র জিউর মূর্তি এনে এখানে স্থাপন করেন। এখানে বৈষ্ণব ভক্তরা কিছুটা গোপনে বা গুপ্তভাবে তাঁদের ভক্তি ও সাধনা চর্চা করতেন। কৃষ্ণভক্তি ও বৃন্দাবনের মতো আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হওয়ায় কালক্রমে জনপদটি ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ বা ‘গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী’ নামে খ্যাত হয়। কালক্রমে এই ‘গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী’ লোকমুখে সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘গুপ্তপল্লী’ এবং পরবর্তীকালে ‘গুপ্তিপাড়া’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
মধ্যযুগে নবদ্বীপের মতো গুপ্তিপাড়াও একসময়ে সংস্কৃত বিদ্যাচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। এখানে বহু সংস্কৃত টোল ও চতুষ্পাঠীও ছিল, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্ডিত ও ছাত্রেরা শাস্ত্র ও বেদচর্চার জন্য এখানে আসতেন। সতেরো শতক থেকেই গুপ্তিপাড়া হয়ে উঠেছিল বৈষ্ণব সংস্কৃতির এক অন্যতম কেন্দ্র। অনেকেই বলেন বৈষ্ণবদের গুপ্ত সাধনা থেকেই জনপদটি গুপ্তপল্লী বা গুপ্তিপাড়া হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, সেই গুপ্তিপাড়া যেখানে প্রথম বারোয়ারী পুজো শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
১৭ শতকের শেষভাগে বা ১৮ শতকের শুরুর দিকে গুপ্তিপাড়ার প্রতিভাবান ময়রারা বা মিষ্টির কারিগরেরা ছানা ও চিনির রস জ্বাল দিয়ে এক অপূর্ব নরম পাকের সন্দেশ তৈরি করেন, যা মুখে দিলেই মিলিয়ে যেত। মিষ্টিটির তাঁরা নাম দিয়েছিলেন ‘মাখা সন্দেশ’। কলকাতা তখনও সন্দেশ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। আসলে, কলকাতায় তখনও পর্যাপ্ত মিষ্টির দোকান গড়েই ওঠেনি। তৈরি হয়নি রেলপথও। কলকাতার ধনী বাবুরা ভাগীরথী দিয়ে জলপথে বজরায় চেপে যখন গুপ্তিপাড়ার মন্দিরে আসতেন, তখন এই অপূর্ব “মাখা সন্দেশ” মুখে দিয়ে মোহিত হয়ে যেতেন। তাঁরা সেখানে বসে কাঁসার থালায় এই মিষ্টি খেতেন এবং মাটির হাঁড়ি বা শালপাতায় করে কলকাতায় নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। ক্রমে সেই সন্দেশ লোকমুখে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে কলকাতা ও সন্নিহিত জেলা থেকে বাবু ও জমিদারদের লোকজন এই সন্দেশ গুপ্তিপাড়া থেকে নৌকায় করে নিয়ে যেতে শুরু করেন।
উনিশ শতকের গোড়ায় গুপ্তিপাড়ার এই মিষ্টির কারিগরদের এক উত্তরসূরি কৃপারাম মোদকের পুত্র ভোলানাথ মোদক নরম পাকের এই মাখা সন্দেশকে অনেকটা থ্যাবড়া ঘুঁটের আকারে পাকিয়ে দুটো মণ্ড জুড়ে নতুন এক মিষ্টির রূপ দিলেন।

প্রায় একশো বছর পরে, উনিশ শতকের গোড়ায় গুপ্তিপাড়ার এই মিষ্টির কারিগরদের এক উত্তরসূরি কৃপারাম মোদকের পুত্র ভোলানাথ মোদক নরম পাকের এই মাখা সন্দেশকে অনেকটা থ্যাবড়া ঘুঁটের আকারে পাকিয়ে দুটো মণ্ড জুড়ে নতুন এক মিষ্টির রূপ দিলেন। তাঁর এই নতুন সন্দেশটির নাম হলো ‘গুপো সন্দেশ’। গুপো সন্দেশ দেখতে কেমন? মহেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়, ‘দেখতে ছিল দুখানা ফেনী বাতাসা একসঙ্গে জোড়া করার মত।’
এই ভোলানাথ মোদক আবার ছিলেন বাংলার লোকসংস্কৃতি ও কবিগানের জগতের এক প্রবাদপ্রতিম মানুষ, যিনি ‘ভোলা ময়রা’ নামেই সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। গুপ্তিপাড়ার মিষ্টির কারিগর বা মোদক বংশে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি কীভাবে মিষ্টির কড়াই ছেড়ে তৎকালীন কলকাতার বড়ো বড়ো বাবুদের আসর কাঁপানো ‘কবিয়াল’ হয়ে উঠেছিলেন, সে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। মিষ্টি তৈরি করতে করতে বা দোকানে বসে বসেই তিনি মুখে মুখে চমৎকার ছড়া ও কবিতা বাঁধতে পারতেন। ভোলা মোদকের এই তাৎক্ষণিক কবিপ্রতিভা তৎকালীন শোভাবাজার রাজবাড়ির সভাসদ তথা বিখ্যাত কবিয়াল হরু ঠাকুরেরও নজর কাড়ে। হরু ঠাকুরের দলেই ‘দোহার’ বা সহ-গায়ক হিসেবে কবিগানের জগতে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। কিন্ত তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক বাচনভঙ্গি এবং শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করার ক্ষমতার কারণে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান এবং নিজেই একটি কবিগানের দল তৈরি করেছিলেন। শোনা যায়, পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত জনপ্রিয় কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির সঙ্গেও কবির লড়াইয়ে নেমেছিলেন এই ভোলানাথ মোদক।
নিজে একজন বিখ্যাত কবিয়াল হয়ে উঠলেও পূর্বপুরুষদের মিষ্টির ব্যবসা ছেড়ে যাননি তিনি। তাঁর হাতেই গুপ্তিপাড়ার মাখা সন্দেশের নতুন রূপটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু কলকাতার সম্ভ্রান্ত মানুষেরাই নয়, স্থানীয় মানুষেরাও তাঁর তৈরি গুপো সন্দেশের প্রেমে পড়ে যান। কলকাতার বাবু- বিবিদের রসনা মেটাতে গুপ্তিপাড়া থেকে নৌকা করেই কলকাতায় এই সন্দেশ পাঠানো শুরু হয়।
গরুর দুধের ছানা এবং চিনির রস বা নলেন গুড় দিয়ে তৈরি হতো এই গুপো সন্দেশ। এতে কৃত্রিম কোনো রঙ, গন্ধ বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হতো না। ছানার নিজস্ব প্রাকৃতিক গন্ধ এবং নরম পাকেই লুকিয়ে থাকতো এই মিষ্টির আসল রহস্য। অন্য সব সন্দেশকে যখন কাঠের বা পাথরের ছাঁচে ফেলে নির্দিষ্ট আকার দিয়ে বিক্রি করা শুরু হয়, গুপো সন্দেশ তখনও নিজের সাবেকিয়ানা ধরে রাখে মাখা সন্দেশের পাকানো মণ্ডতে।
কিভাবে তৈরি হয় এই সন্দেশ? গুপ্তিপাড়ার এক প্রখ্যাত মিষ্টির ব্যবসায়ী জানালেন, প্রথমে দুধ ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হয়। দুধ ফুটে উঠলে আঁচ বন্ধ করে লেবুর রস বা ছানার জল অল্প অল্প করে মিশিয়ে দুধটি কাটিয়ে ছানা তৈরি করতে হয়। ছানা কেটে গেলে একটি পাতলা সুতির কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে পরিষ্কার ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে নিতে হয় যাতে লেবুর টক ভাব চলে যায়। কাপড়ের পুঁটলিটি আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ঝুলিয়ে রেখে ছানার অতিরিক্ত জল সম্পূর্ণ বের করে নিতে হয়। তবে খেয়াল রাখতে হয় ছানা যেন একদম শুকিয়ে ড্রাই না হয়ে যায়, ছানাতে কিছুটা ময়েশ্চার বা আর্দ্রতা থাকা জরুরি।
আজকের কর্পোরেট যুগে আমরা যেভাবে পণ্যের ‘ব্র্যান্ডিং’ বা বিপণন দেখি, আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে গুপ্তিপাড়ার ময়রারা অবলীলায় সেই কাজটি করে দেখিয়েছিলেন।

জল ঝরানো নরম ছানাটি এরপরে একটি বড়ো থালা বা কাঠের তৈরি পারাতে নিতে হবে। এবার হাতের তালু দিয়ে চেপে চেপে ছানাটিকে খুব ভালো করে মাখতে হবে যাতে কোনো দলা বা লাম্প না থাকে। ছানাটি যখন একদম মসৃণ এবং মাখনের মতো নরম হয়ে আসবে, তখন তার সঙ্গে চিনি বা নলেন গুড় মিশিয়ে আরও একবার ভালো করে মেখে নিতে হবে। এবার কড়াইতে এই চিনি বা গুড়-মেশানো ছানার মিশ্রণটি রেখে উনুনের আঁচ একদম হালকা বা মৃদু রেখে নাড়াচাড়া করতে হবে। জোর আঁচে পাক দিলে ছানা শক্ত হয়ে যাবে এবং গুপো সন্দেশের আসল স্বাদটিই নষ্ট হয়ে যাবে। ছানাটি অনবরত নেড়ে যেতে হবে যাতে নিচে ধরে না যায়। চিনি গলে যখন ছানার সঙ্গে মিশে যাবে এবং মিশ্রণটি কড়াইয়ের গা ছেড়ে একটু আঠালো ভাব আসবে, তখনই আঁচ বন্ধ করে দিতে হবে। একে ‘নরম পাক’ বলা হয়। কড়াইতে বেশিক্ষণ রাখলে এটি কড়াপাক হয়ে সন্দেশ শক্ত হয়ে যাবে। পাকানো ছানার মিশ্রণটি কড়াই থেকে নামিয়ে একটি বড়ো পাত্র বা গামলায় রেখে ঠান্ডা হতে দেওয়া হয়। ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর এটি একটি মণ্ড বা ‘মাখা সন্দেশ’ হিসেবেই পাত্রে রাখা থাকে। পরে এই মাখা সন্দেশ থেকে হাত দিয়ে পরিমাণ মতো অংশ তুলে মণ্ড বা গোল্লা পাকিয়ে থেবড়ে নিয়ে দুটোকে একসঙ্গে জুড়ে নিয়ে তৈরি হয় গুপো সন্দেশ। তবে, এই সন্দেশ বেশিদিন থাকে না। খেয়ে নিতে হয় এক-দু’দিনের মধ্যেই।
তথ্য বলছে, ভোলানাথ মোদকের তৈরি এই গুপো সন্দেশই ছিল বাংলার ইতিহাসের প্রথম ‘ব্র্যান্ডেড’ মিষ্টি বা প্রথম ‘সিগনেচার ডিশ’। আজকের কর্পোরেট যুগে আমরা যেভাবে পণ্যের ‘ব্র্যান্ডিং’ বা বিপণন দেখি, আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে গুপ্তিপাড়ার ময়রারা অবলীলায় সেই কাজটি করে দেখিয়েছিলেন। বর্তমানে অবশ্য এই মিষ্টিটি শুধু গুপ্তিপাড়ার চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার বিভিন্ন জায়গায়। পানিহাটির গুপো সন্দেশও বেশ জনপ্রিয়।
বর্তমানে রকমারি মিষ্টির সহজলভ্যতার কারনে এই সন্দেশের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গেলেও আজও মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে কেবল এই নামের টানেই মিষ্টি কিনতে গুপ্তিপাড়ায় আসেন।

