ভোট জ্যোতিষীরা এখনও পর্যন্ত তৃণমূল-বিজেপির হাড্ডাহাড্ডিতেই বিশ্বাসী

ভোট পর্ব শেষ হয়েছে। বুথ ফেরত সমীক্ষায় ভোট জ্যোতিষীরা তৃণমূলকেই এগিয়ে রেখেছেন। একমাত্র প্রণয় রায়ের এনডিটিভি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ম্যাজিক সংখ্যা ১৪৮-এ দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আগাম অনুমান যে কথাই বলুক, ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে ২ মে দুপুরের মধ্যে।

স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পর্বের কতগুলি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে যা অন্যান্য রাজ্য থেকে অনেকটাই পৃথক। প্রথম কথা এই রাজ্যের ভোটদাতারা সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার পক্ষে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত এই রাজ্যে টানা বিশ বছর কংগ্রেসি শাসন ছিল। ওই বছরই প্রথম এখানে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়, যার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অজয় মুখার্জি এবং উপ মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু।

ওই বছর থেকেই রাজ্যে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক মত বদলের ইঙ্গিত দেখা যায়। সেই কাজটা শেষ হতে সময় লাগে দশ বছর। এক দশকের মধ্যে এই রাজ্যে পাঁচবার বিধানসভা নির্বাচন করতে হয়৷ তেমন কোনো নজির অন্য কোনো রাজ্যে নেই। তার ফলেই ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট পাকাপাকি ক্ষমতায় আসে। টিকে যায় টানা ৩৪ বছর।

২০১১-তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসেন। ইনিও দশ বছর ক্ষমতাসীন। এবারের ভোটে মমতা যদি পুনরায় নবান্নে ফিরে আসেন তাহলে ধরে নিতে হবে, রাজ্যের মানুষ সেই পুরোনো অভ্যেস এখনও ছাড়তে পারেননি৷ তৃণমূলের ভোট জ্যোতিষী প্রশান্ত কিশোর তেমনটাই মনে করেন। সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন বিজেপি কোনোভাবেই ৯৯ টপকাতে পারবে না। অপরপক্ষে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গোড়া থেকেই বলে আসছেন বিজেপি ২০০ আসনে জিতবে। ভোট জ্যোতিষীরা অবশ্য দুই পক্ষকেই তিন অঙ্কের আসন দিয়ে রেখেছেন।

একথা ঠিক, যে এই রাজ্যের মানুষ নির্বাচনে দ্বিপাক্ষিক লড়াইটাই বেশি পছন্দ করেন। সেই যুদ্ধটা দীর্ঘকাল ছিল কংগ্রেস এবং বামেদের মধ্যে। ক্ষমতার হাত বদল হয়ে বামেরা কুর্শি দখল করলেও অনেক বছর পর্যন্ত প্রতিপক্ষ বদলায়নি৷ সেই ধারার বদল শুরু হল মমতা কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল গঠন করার পর। শেষ পর্যন্ত তিনি বামেদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। তবে সেটা একদিনে হয়নি। ১৯৯৮ সালে নতুন দল নিয়ে আসরে নেমে উনি ক্ষমতায় আসেন ২০১১-তে। মাঝখানে সময়ের ব্যবধান ১৩ বছর। সিপিআই ভেঙে সিপিএম তৈরি হয়েছিল ১৯৬৪ সালে৷ এবং তারা পাকাপাকি ক্ষমতায় আসে ১৯৭৭-এ৷ মাঝের ব্যবধান ঠিক ১৩ বছর। বাংলার রাজনীতিতে "১৩" সংখ্যাটা বোধহয় নিতান্ত অপয়া নয়। 

মিডিয়ার প্রচারে ধরা পড়েছে এবারে রাজ্যে ভোটযুদ্ধ তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে। সাবেক জনসংঘকে বিবেচনায় আনলে বিজেপির বয়স এখন অন্তত ৭০ বছর। যদিও তার আনুষ্ঠানিক জন্ম ১৯৮০ সালে। তারপর থেকে এই রাজ্যে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ২০১৯-এ। সেই চকিত উত্থান এই দলকে লম্বা দৌড়ে সাহায্য করবে কিনা সেই জিজ্ঞাসা থেকেই যাচ্ছে।

তবে ত্রিপাক্ষিক লড়াই এই রাজ্যে যে হয়নি তা নয়। ১৯৬৭, ১৯৭১ এবং ১৯৭৭ সালে আমরা তেমন লড়াই দেখেছি। ১৯৬৭-তে কংগ্রেস বিরোধী দুটি বামজোট তৈরি হয়েছিল। ১৯৭১ সালেও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামেরা দ্বিধাবিভক্ত ছিল। কংগ্রেস এবং বামের পাশাপাশি ছিল জনতা পার্টি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল সেই তিনবারের ত্রিমুখী লড়াইয়ের মধ্যে প্রথম দুবার এই রাজ্যে বিধানসভা ত্রিশঙ্কু হয়ে যায়। তৃতীয়বার ১৯৭৭ সালেও বামেরা স্পষ্ট জনাদেশ পেয়েছিল।

এবারেও অন্তত খাতায় কলমে লড়াইটা কিন্তু ত্রিপাক্ষিক। তৃণমূল-বিজেপি তো আছেই, সেইসঙ্গে রয়েছে বাম-কংগ্রেস-আব্বাস সিদ্দিকির সংযুক্ত মোর্চা। মিডিয়ার প্রচারে একেবারে গোড়া থেকেই এই ফ্রন্ট তাৎপর্যহীন থেকে গেছে। ভোট জ্যোতিষীরাও তাদের টেনেটুনে সর্বাধিক ২৫টি আসন দিয়েছেন। তা থেকেই অনুমান করা যায় ১৯৬৭ বা ১৯৭১-এর মতো বিধানসভা হয়তো ত্রিশঙ্কু হবে না। আবার ১৯৭৭-এর মতো কোনো ঝোড়ো হাওয়াও বইবে না। মিডিয়া এবং ভোট জ্যোতিষীরা এখনও পর্যন্ত তৃণমূল-বিজেপির হাড্ডাহাড্ডিতেই বিশ্বাসী। 

কিন্তু দুই প্রতিপক্ষের হাড্ডাহাড্ডি যত তীব্র হয় ততই কিন্তু উপেক্ষিত তৃতীয় শক্তি নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।

 

Developed by DXDasia