স্বাস্থ্য ভবনের স্বাস্থ্যসাথী বিল্ডিংয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম
সোশ্যাল মিডিয়াকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় কথা প্রচলিত আছে— আপনার অনুরাগীদের সক্রিয় করুন, কেবল বেসবল কার্ড সংগ্রহের মতো তাঁদের ব্যবহার করবেন না। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার বাড়াতে ফেসবুক বা ট্যুইটারবাসীরা টাকা পর্যন্ত ঢালেন একাধিক। গতবছর লকডাউনে যখন বিশ্বজুড়ে হাহাকার, ত্রাহিত্রাহি রব, তখন এই সোশ্যাল মিডিয়াই কিন্তু একদল মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। মাস্ক-স্যানিটাইজার পৌঁছে গিয়েছিল বাড়িতে বাড়িতে। পেটের ভাতও জুটেছিল। লকডাউন নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। এই লেখার বিষয়বস্তু তা নয়। গতবছর পর্যাপ্ত পরিমাণে মাস্ক বা স্যানিটাইজারের জোগান ছিল না। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ঘাটতির জায়গা অক্সিজেন।
করোনা অতিমারী ঘোষণার পর কেটে গেছে প্রায় একটা বছর। কিন্তু এই লড়াইয়ে অতি প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ভাণ্ডার নেই কেন? কিছুদিন আগেই আমরা শুনেছি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা পরামর্শ দিয়েছেন কম কম শ্বাস নিতে, যাতে অক্সিজেন কম ব্যবহার করা যায়। খাবার, পোশাক, কথা বলার স্বাধীনতার মতো অক্সিজেন নেওয়ার স্বাধীনতাও কি কেন্দ্রীয় শাসকদল কেড়ে নিতে চাইছে? সরকারি তথ্য বলছে, পিএম কেয়ার ফান্ডের তিনহাজার কোটি টাকা আর সরকার অনুমোদিত ২০০ কোটি টাকা অক্সিজেন প্ল্যান্ট প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। অন্যদিকে ২০২১ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর হিসেব কোথায়? কাজের বেলায় ফাঁকি! কোম্পানিগুলো দায় চাপাচ্ছে হাসপাতালের উপর আর সরকারি হাসপাতাল দায় চাপাচ্ছে কোম্পানির উপর। এমন অসহযোগিতা চলতে থাকলে আমার দেশের মানুষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা যাবে। দিল্লির কানে কি তখনও পৌঁছাবে না?

প্রতিদিন যেখানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা তিন লক্ষ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যেখানে পর্যাপ্ত বেড নেই, চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও রোগীকে বাঁচাতে পারছেন না; সেখানে রাজা যে ক্রমশ উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন একথা বুঝছেন না? অক্সিজেনের হাহাকার যেন দেশের আসল ছবিটার পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে এক নিমেষে। মন কি বাত-এ এসে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘টেস্ট ট্র্যাক ট্রিট’ (TTT)-এর কথা। কিন্তু এই ট্রিটের জায়গায় কেন অক্সিজেনের ঘাটতি? প্রতিটা পদে চিকিৎসক ও রোগীকে এহেন হোঁচট খাওয়া? প্রধানমন্ত্রী, শুনতে পাচ্ছেন?
এবার কেন্দ্রীয় সরকারেরই একটা তথ্য দিই। দেশের মোট ১৬২টি জেলায় আপদকালীন অবস্থার জন্য তৈরি হবার কথা ছিল অক্সিজেন উৎপাদন প্ল্যান্ট। কিন্তু বিগত এক বছরে মাত্র ১১টি প্ল্যান্ট নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে আবার মাত্র ৫টি প্ল্যান্ট থেকে অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে বর্তমান বাস্তব চিত্রটা হচ্ছে, প্রতি মিনিটে প্রায় একশো ত্রিশ লিটার অক্সিজেন দরকার। এমন শোচনীয় পরিস্থিতিতে পঞ্চাশ হাজার মেট্রিকটন অক্সিজেন বিদেশ থেকে আমদানি করার কথা ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। অথচ পূর্ব প্রস্তাবিত বরাত দেওয়া অক্সিজেন প্ল্যান্টগুলি যথাসময়ে তৈরি হয়ে গেলে এই শোচনীয় পরিস্থিতি তৈরি হত না। সরকারি রিপোর্ট বলছে, ভারতের অন্য দেশে অক্সিজেন রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৭০০ শতাংশ। কিন্তু এখন যখন দেশের ভাঁড়ারে টান, তখন ঘর না সামলে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়াটা কতটা যুক্তিপূর্ণ?

শুরু করেছিলাম সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আবার সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিকগুলো সামনে আসছে। কয়েকদিন ধরেই ট্যুইটারে একটা হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিংয়ে— #IndiaNeedsOxygen। হ্যাশট্যাগটা শুরু হয়েছিল প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের মাটি থেকে। করোনার জল যখন হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট অবধি গড়িয়েছে, তখন একদল পাকিস্তানি ভারতের জন্য প্রার্থনা করছেন। ভারতকে অক্সিজেনের জোগান দিতে ইচ্ছুক তাঁরা। অনেকেই ভারতকে অক্সিজেন সাপ্লাই করার অনুরোধ জানিয়ে পাকিস্তানের সরকারকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন। পাশাপাশি অন্যান্য জরুরি সরঞ্জাম পাঠানোর অনুরোধও করা হয়েছে। অনেকেই ট্যুইটারে সরাসরি লিখেছেন, এই সময় রাজনৈতিক বিরোধ সরিয়ে রেখে ভারতকে সাহায্য করা উচিত পাকিস্তানের। এ-ও লিখেছেন, “ভারত তুমি সেরে ওঠো। পাকিস্তান তোমার সঙ্গে আছে। একসঙ্গে আমরা করোনার মোকাবিলা করব।” ফেসবুকে ‘বিউটি অফ পাকিস্তান’ পেজের এই সংক্রান্ত একটি পোস্টের কমেন্ট সেকশন দেখলে গায়ে কাঁটা দেবে। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা নয়, একে অপরের মঙ্গল কামনায় তাঁরা লিখছেন, ‘Get well soon India. Best wishes from Pakistan.’ কমেন্টের রিপ্লাই-এ একজন ভারতীয় লিখছেন, ‘Thank you! Love from Lucknow, Delhi, Kolkata.’
এটাই সৌহার্দ্যের ছবি। ভূগোল বইয়ে শুধুমাত্র মুখস্থ করা প্রতিবেশী দেশের কাহিনি নয়, এ যেন বাস্তবে ঘটা কোনো সুন্দরের বিশ্ব। যেখানে যুদ্ধ নেই, শান্তি আছে। দেশের মতো বাংলার চিত্রটাও এক। কেন্দ্র থেকে সঠিক অক্সিজেন সরবরাহ হয়নি রাজ্যস্তরে। বাংলার সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও অক্সিজেনের সংকট। নেটাগরিকরা দায়িত্ব নিয়েছে মানুষের পাশে থাকার। জেলাভিত্তিক কয়েকটা ফোন নম্বর এখন পৌঁছে যাচ্ছে ফোন থেকে আরেক ফোনে। কেউ বলছেন জঙ্গিপুরে অক্সিজেন চাই, কেউ বলছেন ডায়মন্ড হারবারে — ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা মানুষজন আঞ্চলিক কোনো এক ব্যক্তির ফোন নম্বর জোগাড় করে দিচ্ছেন। হাসপাতালে বেড পাওয়া, দরকারে খাবার পৌঁছে দেওয়া, রক্তের জোগান এগুলো তো আছেই।

পাশাপাশি কলকাতায় স্বাস্থ্য ভবনের স্বাস্থ্যসাথী বিল্ডিংয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। রাজ্যের সমস্ত সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকছে কি না সেই দিকে ২৪ ঘণ্টা নজর থাকবে এই কন্ট্রোল রুমের। ইতিমধ্যেই কন্ট্রোল রুমের হেল্পলাইন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর প্রকাশ করে দেওয়া রয়েছে — ৭৫৯৬০৫৬৪৪৩ (ফোন)/ ৭৫৯৬০৫৬৪৪৩ (হোয়াটসঅ্যাপ)।
আরও পড়ুন: ভোটের রাজা দিল বর
লকডাউনে বিনোদনের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, এত নেতির ভিড়ে কিছু মানুষ যখন গান গাইছেন, আবৃত্তি করছেন, কমিকস বলছেন– তা কিছু মানুষের কাছে বেঁচে থাকার রসদ হয়ে উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়া দায়িত্ব নিয়ে তা আরও একবার প্রমাণ করল। প্রত্যেককে বলি, শ্বাস থাকতে মাস্ক পরুন। সচেতন হোন। সুস্থ থাকুন।
