
উস্তাদ জাকির হুসেন ও পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে সংগীত উৎসব
সংগীত অমৃতম-এর আয়োজনে, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলাভবনে উদযাপিত হয়েছিল পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকী। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও উস্তাদ জাকির হুসেন বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। পরিবেশন করেছিলেন তালবাদ্যের একটি অপরূপ একক অনুষ্ঠান। দুজনের সম্পর্ক ছিল এমনই। ১৯৬২ সালে পরিচয় হয়েছিল দুজনের। শঙ্খ চট্যোপাধ্যায় তখন উস্তাদ আল্লারাখা খাঁয়ের শিষ্য। তখন থেকেই গুরুর সুযোগ্য পুত্র এবং শিষ্য জাকিরের কাছে তিনি অত্যন্ত স্নেহের ‘শঙ্খদা’। এই বন্ধুত্বের বন্ধন শেষ পর্যন্ত অটুট ছিল। বিদুষী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সংগীত অমৃতমের পরিকল্পনা ছিল ২০২৬ সালে উস্তাদ জাকির হুসেনকে পুনরায় কলকাতায় এনে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার। এই বছরের ৯ মার্চ ছিল তাঁর পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকী। কিন্তু সময়ের পরিহাসে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমাদের সকলকে ছেড়ে চলে যান উস্তাদ জাকির হুসেন। ঠিক দুইমাস আগে, ১১ অক্টোবরে চলে যান তাঁর প্রিয় ‘শঙ্খদা’। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে চলে গিয়েছেন দুজনে। কিন্তু জনমানসে ও ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে তাঁদের উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আগামী ১১-১২ জুলাই কলকাতার জিডি বিড়লা সভাঘরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ‘ওয়াহ উস্তাদ’ (Wah Ustad)।

উৎসবটির অন্যতম আকর্ষণ পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায় স্মারক প্রদর্শনী। সংগীত অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুইদিন ব্যাপী এই প্রদর্শনী চলবে। ১১ জুলাই বিদুষী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীতের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হবে। তিনি হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যালের লখনউ, পাটিয়ালা ও ইন্দোর ঘরানার একজন অন্যতম শিল্পী।
এই উৎসবের মূল ভাবনা উস্তাদ জাকির হুসেন ও পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের উত্তরাধিকার এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক। কেমনভাবে তা উদযাপিত হতে চলেছে? উত্তর দিলেন ‘ওয়াহ উস্তাদ’-এর অন্যতম উদ্যোক্তা এবং শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা বিদুষী সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায়। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান, “জাকির ভাইয়ের জন্য কিছু করতে হলে, আমাদের বাবাকে স্মরণ করতেই হবে। দুজনকে একসঙ্গে স্মরণ না করলে উৎসবটি পূর্ণতা পাবে না।” সেইসূত্রেই জানা গেল দুজনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কিছু স্মৃতি। যে সময়ের কথা, তখন পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায় জার্মানিতে আছেন। আইসিসিআর-এর একটি প্রোগ্রামে বার্লিন গিয়েছেন খাঁ সাহেব ও জাকির হুসেন। একটি ট্যাক্সিতে উঠতেই ট্যাক্সি চালক ব্যক্তি তাঁদের চিনতে পারলেন। ব্যক্তির নাম রল্যান্ড। বিস্মিত হন জাকির। জানতে চাইলেন কীভাবে চিনলেন তাঁকে সেই ব্যক্তি। রল্যান্ড জানালো, সে পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের একজন ছাত্র। সংসারের তাড়নায় ট্যাক্সিও চালাতে হয়। রল্যান্ডের থেকে প্রিয় ‘শঙ্খদা’-র টেলিফোন নম্বর চেয়ে নিলেন উস্তাদ। এক মুহূর্ত দেরি না করে পৌঁছে গেলেন শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়ের আস্তানায়। তিনি ছাত্রদের কাছে জাকির হুসেনের প্রশংসা করতেন অহরহ। সেই সূত্রেই রল্যান্ড চিনে নিয়েছিলেন তাঁকে। সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, দুই শিল্পীর এই অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সূত্রেই তিনি ‘জাকির ভাই’-এর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০২২ সালের একটি আবেগঘন মুহূর্তের কথা বললেন। সুইডেনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি উস্তাদ জাকির হুসেনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে উস্তাদ বলেন, “সঙ্গীতা, এটা তোমার স্থান নয়। তোমাদের স্থান আমার বুকে।” দুই মহান শিল্পীকে স্মরণ করার এই উৎসব সম্পর্কে একটু হেসে তিনি বললেন, “আমাদের আয়োজন হচ্ছে “সুরজ কো চিরাগ দিখানা”।” বাংলায় বলতে গেলে “গঙ্গাজলে গঙ্গা পুজো”। কিন্তু বাস্তবে, অত্যন্ত কাছের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের শ্রদ্ধার্ঘ্যে তিনি এবং বাকি আয়োজকরা ত্রুটির অবকাশ রাখেননি। উৎসবের আয়োজনে আপাতত সকলে মনে প্রাণে নিয়োজিত। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক উৎসবের সূচি।
উৎসবটির অন্যতম আকর্ষণ পণ্ডিত শঙ্খ চট্টোপাধ্যায় স্মারক প্রদর্শনী। সংগীত অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুইদিন ব্যাপী এই প্রদর্শনী চলবে। ১১ জুলাই বিদুষী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীতের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হবে। তিনি হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যালের লখনউ, পাটিয়ালা ও ইন্দোর ঘরানার একজন অন্যতম শিল্পী। প্রথমদিনের আরেকটি বড়ো আকর্ষণ পণ্ডিত যোগেশ সামসি ও পণ্ডিত প্যাট্রি সতীশ কুমারের ‘রিদম যুগলবন্দি’। দিল্লির তবলা বাদক যোগেশ সামসি উস্তাদ আল্লারাখা খাঁয়ের অন্যতম কৃতী শিষ্য। ২০১৭ সালে পেয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। মৃদঙ্গমে দক্ষ অন্ধ্রপ্রদেশের প্যাট্রি সতীশ কুমার কার্নাটিক ক্লাসিক্যাল একজন বিশিষ্ঠ শিল্পী। সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেছেন ২০২০ সালে। দুজনের তালবাদ্য তৈরি করবে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের তালধারার এক অপরূপ সমন্বয়। হারমোনিয়ামে দুজনের সঙ্গতে থাকবেন শ্রী মিলিন্দ বাসুদেব কুলকার্নি। প্রথমদিনে সমাপ্তির বিশেষ নিবেদন ‘সমর্পণ’। একই সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট হবেন বিদুষী সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায়, পণ্ডিত যোগেশ সামসি, পণ্ডিত প্যাট্রি সতীশ কুমার ও শ্রী মিলিন্দ বাসুদেব কুলকার্নি।
উৎসবের সমাপন হবে পদ্মভূষণ বেগম পারভিন সুলতানার শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। তিনি পাটিয়ালা ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। সঙ্গতে তবলায় থাকবেন তালমণি পণ্ডিত মুকুন্দরাজ দেও এবং হারমোনিয়ামে পণ্ডিত জ্যোতি গুহ।

দ্বিতীয় দিনের সূচনা করবেন নবীন প্রজন্মের কত্থক শিল্পী সমিলা ভট্টাচার্য। বালশ্রী পুরস্কার পেয়েছিলেন ২০০৫ সালে। বর্তমানে দূরদর্শনের প্রথম সারির শিল্পী। তাঁর একক নৃত্য পরিবেশনার সঙ্গতে থাকছেন তবলা বাদক সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, সরোদে সুনন্দ মুখোপাধ্যায়, কণ্ঠ সঙ্গীতে আকাশ মুখোপাধ্যায় ও বাঁশিতে ঋক মুখোপাধ্যায়। বোল পাঠান্তে থাকছেন সোহিনী দেবনাথ। উৎসবের সমাপন হবে পদ্মভূষণ বেগম পারভিন সুলতানার শাস্ত্রীয় কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। তিনি পাটিয়ালা ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী। সঙ্গতে তবলায় থাকবেন তালমণি পণ্ডিত মুকুন্দরাজ দেও এবং হারমোনিয়ামে পণ্ডিত জ্যোতি গুহ। এই পরিবেশনার মাধ্যমেই দুইদিনব্যাপী সংগীত উৎসবের সমাপ্তি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কলকাতার বুকে উচ্চাঙ্গ সংগীত চর্চার ঐতিহ্যধারা বয়ে চলেছে আগের মতোই। সময়ের লয় ও ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন হয়ে ধরা দিচ্ছে ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীত। কলকাতার একাধিক সংস্থা ঐতিহ্যবাহী শিল্প আঙ্গিকগুলির সংরক্ষণ ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থাও। ‘ওয়াহ উস্তাদ’ উৎসবটির পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করেছে সংগীত অমৃতম ও বিচিত্রশালা আর্ট কনসালটেন্সি। সহযোগিতায় HSBC – Live the Legacy এবং সহ-আয়োজক সংস্কৃতি সাগর। আয়োজনের খুঁটিনাটি জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিল বিচিত্রশালা আর্ট কনসালটেন্সির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও লুব্ধক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানাচ্ছেন, তাঁদের আয়োজন দুজন মহৎ শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। “তাঁদের নিজস্ব একটা ইতিহাস আছে বহু দশকের। সেভাবে দেখে গেলে দুজনেই একে-অপরের গুরুভাই। বিশ্বব্যাপী নিজেদের শিল্পকলা পরিবেশন করেছেন। দুজনকে ট্রিবিউট দেওয়ার জন্য, এই মুহূর্তে যে ‘লিভিং লেজেন্ডস’রা আমাদের দেশে আছেন। এবং যাঁরা দুই শিল্পীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের নিয়ে আসতে পারাটা খুবই স্পেশ্যাল।” নতুন প্রজন্মকে এই উৎসবে কীভাবে তুলে ধরা হচ্ছে এবং বর্তমান সময়ে কলকাতার বুকে “গীতম, বাদ্যম ও নৃত্যম”-এর চর্চা কেমনভাবে হচ্ছে, সেই নিয়েও বললেন কিছু কথা। উৎসবের দ্বিতীয় দিনে সমিলা ভট্টাচার্যের একক নৃত্যপরিবেশনার প্রসঙ্গে বললেন, “জীবন্ত কিংবদন্তিদের সঙ্গে একজন অত্যন্ত ইয়ং এবং ট্যালেন্টেড আর্টিস্টকে একই মঞ্চে নিয়ে আসা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এইটা আমাদের খুবই উৎসাহের একটি জায়গা।” সঙ্গে আরও জানালেন, বর্তমান সমাজ ও নতুন প্রজন্ম কীভাবে গ্রহণ করছে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল ফর্মকে। তাঁর মতে, “এটা কলকাতার ঐতিহ্য। কেরিয়ার হিসেবে বেছে না নিলেও ইন্টারেস্ট রয়েছে যথেষ্ট। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের একটি বড়ো অংশ ক্লাসিক্যাল যথেষ্ট পছন্দ করে।” তিনি জানালেন, বিচিত্রশালা আর্ট কনসালটেন্সির বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের একাংশের বয়স তিন দশকের গণ্ডি অতিক্রম করেনি। প্রবল উৎসাহ ও ভালোবাসা দিয়ে তারা কাজটি করছে। বহু অল্পবয়সী শিল্পী নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছেন। তবে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে অনলাইন ও অফলাইনের দূরত্ব মেটাতে হবে। ‘ওয়াহ উস্তাদ’-এর মতো উৎসব আয়োজন করতে হবে একাধিক। উৎসবের পাশাপাশি কর্মশালাসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে হবে সারা বছর। তবেই তৈরি হবে নতুন শিল্পী এবং শিল্পরসিক।
